প্রশান্ত মহাসাগরের এক গুরুত্বপূর্ণ বলয়ে অবস্থিত দক্ষিণ চীন সাগর। অর্থনীতি, কূটনীতি ও রাজনীতির দিক থেকে সাগরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই অঞ্চলের স্কারবোরো শোল এলাকায় রহস্যময় একটি কাঠামোর উপস্থিতি প্রকাশ্যে এসেছে।যদিও তা দৃশ্যমান হওয়ার পরপরই উধাও হয়ে গেছে। এ নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে বলছে, সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট ছবিতে প্রবালপ্রাচীরটির লেগুন প্রবেশমুখে একটি সন্দেহজনক কাঠামো দেখা গেলেও কয়েক দিনের মধ্যে সেটি অদৃশ্য হয়ে যায়, যা চীনের কর্মকাণ্ড নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের হাতে আসা ২৭, ২৯ ও ৩০ মে তারিখের স্যাটেলাইট ছবিতে স্কারবোরো শোলের লেগুনের প্রবেশপথের কাছে একটি ভাসমান ভেলা বা বয়াসদৃশ বস্তু দেখা যায়।
বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ভ্যানটরের বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, এটি কোনো স্থায়ী বা আধা-স্থায়ী কাঠামো হতে পারে।
এ ছাড়া ২৭ ও ২৯ মে তোলা ছবিতে লেগুনের মুখজুড়ে একটি বাধার মতো বস্তুও দেখা যায়, যা প্রবেশপথ আংশিকভাবে আটকে রেখেছিল বলে মনে হয়।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সামুদ্রিক পর্যবেক্ষণ সংস্থা সিলাইট গত ২৮ মে তোলা আরেকটি স্যাটেলাইট ছবি প্রকাশ করে। সেখানে একটি ছোট প্রতিফলকধর্মী বস্তু দেখা গেছে, যা সাময়িক আলোক প্রতিফলনের ফল নয়, বরং স্থায়ী কোনো কাঠামো হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
তবে ১ জুন তোলা পরবর্তী স্যাটেলাইট ছবিতে ওই কাঠামোর কোনো অস্তিত্ব দেখা যায়নি। ফলে ধারণা করা হচ্ছে, সেটি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে অথবা অন্যত্র স্থানান্তর করা হয়েছে। এ বিষয়ে চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও ম্যানিলায় অবস্থিত চীনা দূতাবাস তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
তদন্তে ফিলিপাইন
রহস্যময় বস্তুটির বিষয়ে তদন্ত শুরু করেছে ফিলিপাইন। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী গিলবার্তো তেওদোরো জানিয়েছেন, সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত শাংরি-লা ডায়ালগ নিরাপত্তা সম্মেলনে অংশ নেওয়ার সময় তিনি এ বিষয়ে প্রাথমিক তথ্য পেয়েছেন এবং বিষয়টি যাচাই করা হচ্ছে।
এর আগে গত এপ্রিল মাসেও স্যাটেলাইট ছবিতে স্কারবোরো শোলের প্রবেশমুখে চীনা জাহাজ এবং একটি ভাসমান বাধা দেখা গিয়েছিল। তখন ফিলিপাইন দাবি করেছিল, প্রায় ৩৫২ মিটার দীর্ঘ একটি ভাসমান প্রতিবন্ধক স্থাপন করা হয়েছে, যা লেগুনে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টার অংশ।
দীর্ঘ বিরোধ
চীনে ‘হুয়াংইয়ান দাও’ এবং ফিলিপাইনে ‘বাজো দে মাসিনলোক’ নামে পরিচিত দক্ষিণ চীন সাগরের অন্যতম বিতর্কিত অঞ্চল স্কারবোরো শোল। সমৃদ্ধ মৎস্যসম্পদ, সম্ভাব্য তেল-গ্যাস মজুত এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে এলাকাটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
২০১২ সালে চীন ও ফিলিপাইনের জাহাজের মধ্যে অচলাবস্থার পর থেকে প্রবালপ্রাচীরটি কার্যত চীনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এরপর থেকেই চীনা কোস্টগার্ড ও ফিলিপাইনের জেলেদের মধ্যে একাধিকবার উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক সালিশি আদালত রায় দিয়েছিল যে স্কারবোরো শোলে চীনের অবরোধ আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে। তবে আদালত সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি। চীন সেই রায় প্রত্যাখ্যান করে এবং এখনো দক্ষিণ চীন সাগরের অধিকাংশ অংশের ওপর নিজেদের দাবি বজায় রেখেছে।
আঞ্চলিক উত্তেজনা
বিশ্লেষকদের মতে, স্কারবোরো শোলে রহস্যময় কাঠামোর উপস্থিতি এবং দ্রুত অদৃশ্য হয়ে যাওয়া দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের কার্যক্রম নিয়ে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। সম্প্রতি ফিলিপাইন ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামুদ্রিক মহড়ার পর এলাকাটিতে চীনের টহল কার্যক্রমও জোরদার হয়েছে।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এ ধরনের ঘটনাকে ঘিরে ভুল হিসাব বা ভুল বোঝাবুঝি বড় ধরনের কূটনৈতিক কিংবা সামরিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে। ফলে দক্ষিণ চীন সাগরের এই বিরোধপূর্ণ অঞ্চল আবারও আন্তর্জাতিক নজরদারির কেন্দ্রে চলে এসেছে।











































