ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র ১২ দিন বাকি। শিডিউল অনুযায়ী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে বহুল প্রতীক্ষিত সেই নির্বাচন। এর মধ্য দিয়ে একটি নির্বাচিত সংসদ পাবে দেশ। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গা হলো জাতীয় সংসদ। কিন্তু সংসদের তোয়াক্কা না করে চট্টগ্রাম বন্দরের স্বয়ংসম্পূর্ণ ও সর্বোচ্চ রাজস্ব আহরণকারী নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) দুবাইভিত্তিক অপারেটর কোম্পানির ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে অন্তর্বর্তী সরকার। তড়িঘড়ি করে এনসিটি পরিচালনায় বিদেশিদের সঙ্গে চুক্তির সব প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে। আগামীকাল ১ ফেব্রুয়ারি চুক্তি সম্পাদন করার লক্ষ্যে নানা তৎপরতা চলছে। সরকারের এমন তৎপরতাকে ‘রহস্যজনক’ এবং ‘দেশের স্বার্থবিরোধী’ বলে অভিযোগ করেছেন চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারকারী ব্যবসায়ী এবং এখানে কর্মরত শ্রমিকরা।
তাই কোনো ধরনের ‘গোপন’ চুক্তি না করার দাবিতে আজ থেকে বন্দরে দুই দিনের ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল ও স্কপ। প্রথম দিন ৮ ঘণ্টা অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধ এবং দ্বিতীয় দিন রোববার প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে তারা। বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলন করে এই ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়েছে। একই দিন তারা বন্দর ভবনে প্রবেশ করে বন্দর চেয়ারম্যানের কাছেও তাদের কর্মসূচির বিষয়ে জানিয়ে এসেছেন। সর্বাত্মক ধর্মঘট সফল করতে শুক্রবার শ্রমিক সংগঠনগুলো নিজেদের মধ্যে অভ্যন্তরণী আলোচনা করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ যুগান্তরকে বলেন, ‘বন্দরে বিদেশি বিনিয়োগ এলে সেটা সুখের খবর। কিন্তু যখন কোনো কিছু নিয়ে তড়িঘড়ি করা হয় তখন তা নিয়ে রহস্যের সৃষ্টি হয়। আওয়ামী লীগ সরকার এনসিটি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছিল। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারও সেই একই প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়েছে। চুক্তির শর্ত নিয়ে যদি লুকোচুরি করা হয়, সেটা যদি জাতির সামনে পরিষ্কার করা না হয়-তাহলে এ নিয়ে সন্দেহ থাকবেই। সরকারের উচিত চুক্তির শর্তগুলো কী, এতে দেশের স্বার্থহানি হবে কিনা-তা পরিষ্কার করা। যেহেতু কদিন পরই জাতীয় নির্বাচন-তাই স্পর্শকাতর এই চুক্তির বিষয়টি পরবর্তী নির্বাচিত সংসদের হাতে ছেড়ে দেওয়া উচিত।’
সূত্র জানায়, এনসিটি বিদেশিদের না দেওয়ার জন্য দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছেন বন্দর শ্রমিকরা। বিএনপি-বামপন্থি, জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলও এর বিরোধিতা করে মশাল মিছিল থেকে শুরু করে নানা সভা-সমাবেশ করেছে। এতকিছুর পরও সরকার চুক্তির প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার কারণে শ্রমিকদের পক্ষ থেকে উচ্চ আদালতে মামলা করা হয়। মামলা বিচারাধীন থাকা অবস্থায়ই চুক্তির সব প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হয়। দেখা গেছে, গত ২০ জানুয়ারি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (সিপিএ) পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ কর্তৃপক্ষের (পিপিপিএ) সঙ্গে সমন্বয় করে মূল দরপত্রে পরিবর্তন এনে সংশোধিত শর্তে পুরো প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। চুক্তির জন্য যতগুলো ধাপ রয়েছে সবগুলো ৩১ জানুয়ারির মধ্যে শেষ করে ১ ফেব্রুয়ারি ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে এনসিটি নিয়ে কনসেশন চুক্তির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। উচ্চ আদালতে শ্রমিকদের পক্ষ থেকে করা রিট বুধবার খারিজ হওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকার চুক্তির লক্ষ্যে আরও এক ধাপ এগিয়ে যায়।
২০০১ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকারের আমলে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণকাজ শুরু হয়। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজস্ব তহবিল থেকে ২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে এই টার্মিনাল নির্মাণ করে। বন্দরের মূল আয়ের ৬০ ভাগ আসে এই টার্মিনাল থেকে। টার্মিনালের জন্য ২ হাজার কোটি টাকার অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ক্রয় করা হয়। আধুনিক যন্ত্রপাতিসমৃদ্ধ হওয়ায় এই টার্মিনালের উৎপাদনশীলতা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। ২০০৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এই একটি টার্মিনালেই ১ কোটি ১৮ লাখ ৬৩ হাজার টিইইউএস (২০ ফুট সমমানের) কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে। এই টার্মিনালে বর্তমানে যে পরিমাণ ইকুইপমেন্ট আছে তা দিয়ে আগামী ১৫ বছর চালানো যাবে। স্বয়ংসম্পূর্ণ টার্মিনালটি ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে তুলে দিতে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারই প্রক্রিয়া শুরু করে। সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবে অন্তর্বর্তী সরকার এনসিটি পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে এনসিটি পরিচালনা করেছে বেসরকারি টার্মিনাল অপারেটর সাইফপাওয়ার টেক লিমিটেড। বর্তমানে সরকারি প্রতিষ্ঠান ড্রাইডক এনসিটি পরিচালনা করছে। ড্রাইডকও এনসিটিতে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে রেকর্ড গড়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক ইব্রাহিম খোকন জানান, ‘সারা দেশ যখন নির্বাচনি ডামাডোলে, সবাই যখন গণতন্ত্রে উত্তরণের পথে ব্যস্ত ঠিক সেই মুহূর্তে সরকার বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ ও লাভজনক স্থাপনা এনসিটি ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে তুলে দিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। অথচ দেশের সবচেয়ে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ এই স্থাপনা দুবাইয়ের ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে দেওয়ার প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে দেড় বছর ধরে বন্দরের শ্রমিকরা আন্দোলন করে আসছেন। কিন্তু সরকার বিদেশি এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিচ্ছে। এই সিদ্ধান্ত দেশের জন্য চরম আত্মঘাতী বলে আমরা মনে করি।’ তিনি বলেন, ‘এনসিটি বিদেশিদের দিলে দেশের সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হবে।’ ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, আজ শনিবার সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরের সব অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধ রেখে সর্বাত্মক ধর্মঘট পালনের করা হবে। আর আগামীকাল রোববার সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত বন্দরে সব ধরনের প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ রাখা হবে। ওইদিন বিকাল ৫টায় আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। বন্দর শ্রমিক দল নেতা আবদুল্লা আল মামুন যুগান্তরকে বলেন, ‘ধর্মঘট সফল করতে আমরা বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে বৈঠক করেছি।’










































