হাওড়ে কৃষকের কান্না থামছে না

বুকসমান পানিতে দাঁড়িয়ে ছেলেদের ডুবে যাওয়া ধান তুলতে দেখছিলেন নেত্রকোনার মদনের বৃদ্ধা সাইকুলের মা। এক ছেলের বউয়ের সিজার হবে-টাকা নেই। মহাজনের ঋণ-শোধের পথ নেই। এটুকু বলতেই কণ্ঠ ধরে এলো তার। বললেন, ‘খাই কইত্ত ভাত নাই, এহন কন্টইলে চাল কিন্নে আইন্নে খাইতেছি।’

বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল আর বাঁধ ভাঙার তাণ্ডবে এবার হাওড়াঞ্চলজুড়ে নেমেছে ভয়াবহ বিপর্যয়। নেত্রকোনায় ১৫ হাজার হেক্টরেরও বেশি জমির ধান পানির নিচে, কংস নদ বিপদসীমার ১.১০ মিটার ওপরে। সুনামগঞ্জে একের পর এক ভাঙছে বাঁধ। সবশেষ শনিবার ভোরে বোয়ালা হাওড়ের বাঁধ ভেঙেছে। কৃষকরা বলছেন, রোদ না থাকায় যে ধান কাটা হয়েছে তাও শুকানো যাচ্ছে না। ফলে চারা গজিয়ে যাচ্ছে, দামও নেই। আর যে ধান মাঠে আছে, তা কেটে নিচ্ছে ‘নয়নভাগা’।

এদিকে আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, আগামী পাঁচ দিন দেশের বড় অংশে বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। আজ খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় এবং রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ ও ঢাকা বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়া বইতে পারে। বিদ্যুৎ চমকানোসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি অথবা বজ সহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারি থেকে অতি ভারি বর্ষণ হতে পারে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া: ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে টানা বৃষ্টিপাতে জমির ধান তলিয়ে যেতে দেখে আহাদ মিয়া নামের এক কৃষক হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। শনিবার সকালে উপজেলার গোয়ালনগর ইউনিয়নের রামপুরে এ ঘটনা ঘটে। আহাদ ওই গ্রামের হরমুজ আলীর ছেলে। স্বজনরা জানান, সকাল সাড়ে ৮টায় আহাদ মিয়া শ্রমিক নিয়ে হাওড়ে জমির পাকা ধান কাটতে যান। গিয়ে দেখেন তার জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। এরপরই তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। দ্রুত তাকে নাসিরনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

সুনামগঞ্জ ও ধর্মপাশা : জেলার মধ্যনগরে ভেঙে গেছে আরও একটি ফসল রক্ষা বাঁধ। শনিবার সকালে বাঁধ ভেঙে মধ্যনগরের বোয়ালা হাওড়ের ফসল ডুবে যায়। এখন ডুবে যাওয়া ধান কাটবেন, নাকি বাঁধ রক্ষা করবেন-এই সংকটে পড়েছেন কৃষকরা। এর আগে শুক্রবার বাঁধ ভেঙে একই উপজেলার শালদিঘা হাওড়ে পানি ঢুকেছিল। দিনভর চেষ্টার পর ভাঙনের অংশ দিয়ে পানি প্রবেশ আটকানো সম্ভব হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শনিবার ভোর থেকে বৃষ্টি হয়েছে। এতে সোমেশ্বরী নদীর পানি বেড়ে মধ্যনগর জামে মসজিদের পাশের কালভার্টের সামনের পাউবোর দেওয়া বাঁধ ভেঙে পানি প্রবেশ করতে শুরু করে। সকালে ধান কাটতে গিয়ে এই পরিস্থিতি দেখে কান্নাকাটি শুরু করেন স্থানীয় কৃষকরা। তারা বলেন, বাঁধের কাজে অবহেলা ছিল। কালভার্টের মুখের এই বাঁধে ‘আর-প্যালাসেটিং’ (বিশেষ বেষ্টনী) ছিল না।

মধ্যনগর ইউনিয়ন কৃষি উপসহকারী কর্মকর্তা কবির হোসেন বলেন, হাওড়ে ২০ হেক্টরের মতো জমির ধান কাটা হয়নি। এগুলো ডুবে গেছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার জানান, হাওড়ের ধান কাটা শেষ হয়ে গেছে। এমন সময় বাঁধও ভেঙেছে। এজন্য বাঁধ ঠেকানোর চেষ্টা করা হয়নি।

মদন (নেত্রকোনা) : ‘খাই কইত্ত ভাত নাই, এহন কন্টইলের চাল (কম মূল্যের সরকারি চাল) কিন্নে আইন্নে খাইতেছি। আমার দুইটা হুতে আজকে আসটে দিন ধরে হাতুরতেছে (সাঁতরে ধান কাটছে), এই ধানডি আনছে। আমার এক ছেলের বউয়ের সিজারে বাচ্চা ওইব, টেহা নাই, মাই¹ে-জাইত্তে (ধার করে) আইন্নে হাডাইছি (পাঠাইছি)।’ শনিবার গণেশের হাওড়ে বুকসমান পানিতে নেমে তলিয়ে যাওয়া ধান ছেলেরা তুলছে দেখিয়ে কথাগুলো বলছিলেন কাইটাইল ইউনিয়নের জয়পাশা মাঝপাড়া গ্রামের বৃদ্ধ সাইকুলের মা। এ হাওড়ে তলিয়ে গেছে প্রায় ৯০ হেক্টর বোরো জমি।

মদনে টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে নদ-নদীর পানি বেড়ে প্রায় ৪ হাজার হেক্টর বোরো জমি তলিয়ে গেছে। রোদ না থাকায় কেটে আনা ধান শুকানোও যাচ্ছে না। উপজেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ধারণা, শুধু মদনে অন্তত ৯ হাজার কৃষকের প্রায় ৩৪ কোটি টাকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

উপজেলার কাইটাইল ইউনিয়নের কেশজানি গ্রামের কৃষক মজু মিয়া জানান, আমি গণেশের হাওড়ে দুই একর জমি চাষ করেছিলাম। কাটার প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। হারভেস্টার মেশিন ঠিক করা ছিল। শুক্রবার রাতে ঢলে আমার পাকা জমি তলিয়ে গেছে। আমার সংসারে ১০ জন সদস্য আছে, কীভাবে সারা বছর চলব বুঝতে পারছি না। এই জমির ধানের আয় দিয়েই আমার সংসার সারা বছর চলত।

নেত্রকোনা : গ্রামের বড় গৃহস্থ মিলন ব্যাপারী। ৫০ একর জমিতে বোরোর আবাদ করেছিলেন এবার। রতির হাওড়, পাঙ্গাসিয়া, আনচুতলা, বাঞ্জাইল, আমগাছতলা ও তেল্লার হাওড়ে তার জমি। ফসল ঘরে উঠলে প্রায় ৫ হাজার মন ধান পেতেন। কিন্তু অর্ধেকের বেশি ধান তলিয়ে গেছে। মিলন ব্যাপারী বলেন, ‘আর কয়টা দিন পাইলেই অইত। কিন্তু উজান্নেয়া ঢলের পানি সবকিছু ডুবাইলিছে। পানির নিচের ধান আর কাটা সম্ভব না। সব পচ্চেয়া যাইতেছে। এখন সব ধানখেত কেটে নিয়া যাইতেছে নয়নভাগায়! (নয়নভাগা হাওড়ের একটি প্রচলিত শব্দ। যেখানে জমির মালিক নিরুপায় হয়ে ফসলের মালিকানা ছেড়ে দেন। তখন যে কেউ সেই ফসল কেটে নিতে পারে)।

একই গ্রামের মুসকো খাঁ, সুলেমান মিয়া, রাজিব মিয়াসহ বহু কৃষকের অবস্থাও একই। মুসকো খাঁর পরিবারে ৭ সদস্য। তিনি ৩ একর জমি করেছিলেন এবার। কিন্তু সব জমি নিয়ে গেছে উজানের ঢলে। মুসকো খাঁ বলেন, সব জমির ধান ভালোয় ভালোয় তুলতে পারলে প্রায় তিনশ মন ধান পেতেন। এখন এক মুঠো ধানও তুলতে পারেননি। শতবর্ষী মা, চার মেয়ে, স্ত্রীসহ ৭ জনের পরিবারের খরচ কেমনে চলব? এই চিন্তায় ঘুমাইতে পারেন না তিনি।

জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, হাওড়ে এখনো সবকটি বেড়িবাঁধ ঠিক আছে। বাঁধ যাতে না ভাঙে সে বিষয়ে সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, হাওড়ে এখনো বন্যার পানি আসেনি। যে পানিতে ধান ডুবেছে তা বৃষ্টির পানি। এ পানি বের হওয়ার কোনো পথ নেই।

কিশোরগঞ্জ ও পাকুন্দিয়া : মিঠামইনের ঘাগড়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান বনেদি কৃষক বোরহান উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী জানান, এরই মধ্যে হাওড়াঞ্চলে ১০ সহস্রাধিক হেক্টর বোরো জমির ফসল তলিয়ে গেছে। এছাড়া বেশি দামে ধান কেটেও রোদে শুকানো যাচ্ছে না। খলায় খলায় স্তূপ করে রাখা ধানও এখন পচে নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সাদিকুর রহমান জানান, বৃহস্পতিবার বিকাল পর্যন্ত ৬ হাজার ৭৬৮ হেক্টর জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। বেশি ক্ষতি হয়েছে ইটনা ও অষ্টগ্রাম উপজেলায়।

LEAVE A REPLY