গেল ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধ মাঝে কিছুদিন বন্ধ ছিল, তবে বৃহস্পতিবার থেকে সে যুদ্ধ আবার শুরু হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র, দুই পক্ষই পাল্টাপাল্টি হামলা করেছে। ইরান যুদ্ধ যখন তুঙ্গে, তখন পারমাণবিক হামলাও চোখরাঙানি দিচ্ছিল ভালোভাবেই। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তো পুরো সভ্যতা উড়িয়ে দেওয়ারও হুমকি দিয়েছিলেন একবার! সেই যুদ্ধ যখন আবার শুরু হওয়ার আভাস দিচ্ছে, পারমাণবিক সংঘাতেরও শঙ্কাও পাল্লা দিয়ে আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার কথা।
তবে লন্ডনভিত্তিক প্রতিরক্ষা গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (আইআইএসএস) জানাচ্ছে, অন্য এক সম্ভাব্য যুদ্ধ শঙ্কা জাগাচ্ছে পারমাণবিক সংঘাতের। তাদের গবেষণায় উঠে এসেছে, তাইওয়ান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে যুদ্ধ বাধলে তা পারমাণবিক সংঘাতে পরিণত হতে পারে।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক মূল্যায়নে প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, বিশ্ব এখন একটি নতুন পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। সিঙ্গাপুরে এশিয়ার সবচেয়ে বড় বার্ষিক প্রতিরক্ষা সম্মেলনের আগে এই মূল্যায়ন প্রকাশিত হয়েছে।
আইআইএসএস বলেছে, ‘এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলকে কেন্দ্র করে’ এই পারমাণবিক প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি আরও জানিয়েছে, ‘আঞ্চলিক দেশগুলো ও কৌশলগত স্বার্থ থাকা দেশগুলো তাদের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার বাড়াচ্ছে। পাশাপাশি পারমাণবিক অস্ত্রহীন দেশগুলো দূরপাল্লার সাধারণ আক্রমণের সক্ষমতা তৈরি করছে। এই দুটো বিষয়ই কৌশলগত স্থিতিশীলতাকে চ্যালেঞ্জ করছে।’
যদিও চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জিয়াং বিন বলেছেন, আইআইএসএসের এই প্রতিবেদন ‘আসল পরিস্থিতির সঙ্গে বেশ অসংগতিপূর্ণ মনে হচ্ছে।’ তিনি আরও বলেছেন, তাইওয়ান চীনের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এতে বাইরের কোনো হস্তক্ষেপ চীন মানবে না।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত তাইওয়ান বিষয়ে ‘অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে’ কাজ করা।
১৫৬ পাতার এই মূল্যায়নে বলা হয়েছে, তাইওয়ান নিয়ে সংঘাত হলে দুই দেশের সেনাবাহিনী একে অপরের কমান্ড, যোগাযোগ ও নজরদারি ব্যবস্থায় আক্রমণ চালাতে পারে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘চীনের কাছে তাইওয়ানের কৌশলগত গুরুত্বের কারণে চীনের সঙ্গে সংঘাত পারমাণবিক পর্যায়ে গড়াতে পারে।’
আইআইএসএস আরও বলেছে, ‘এই মুহূর্তে এমন কোনো প্রকাশ্য প্রমাণ নেই যে দুই দেশের সামরিক বাহিনী একে অপরের গুরুত্বপূর্ণ কমান্ড ও যোগাযোগ কেন্দ্রে হামলা ঠেকাতে বা সীমাবদ্ধ রাখতে কোনো নিয়ম মেনে চলছে।’ প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ‘যেকোনো বড় মার্কিন-চীন সংঘাতে পারমাণবিক উত্তেজনার আশঙ্কা তাই বরাবর ঝুলতে থাকবে।’
আইআইএসএসের জ্যেষ্ঠ গবেষক ড্যানিয়েল সলসবেরি জানিয়েছেন, সম্প্রতি ট্রাম্প-শি শীর্ষ সম্মেলনে পারমাণবিক বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। তিনি বলেছেন, পারমাণবিক প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্ক ‘বেশ কঠিন’ অবস্থায় আছে।
তিনি আরও বলেছেন, স্নায়ুযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও ঝুঁকি কমানো নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কথাবার্তা হয়েছিল। কিন্তু চীনের সঙ্গে এই আলোচনা আরও জটিল। কারণ চীনের অনেক পারমাণবিক অস্ত্র লুকানো অবস্থায় রাখা হয়েছে।
সলসবেরি বলেছেন, ‘এই মুহূর্তে আলোচনার কোনো সংস্কৃতিই নেই। তাই এই সম্পর্কে কাজ করার মতো ভিত্তি অনেক কম।’
যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার পারমাণবিক ভাণ্ডার এখনও চীনের চেয়ে অনেক বড়। তবে চীন যেকোনো পারমাণবিক শক্তির চেয়ে দ্রুতগতিতে তার পারমাণবিক অস্ত্র বাড়াচ্ছে ও উন্নত করছে বলে মার্কিন কর্মকর্তারা ও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন।
পেন্টাগনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীন ২০৩০ সালের মধ্যে ১,০০০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড মোতায়েন করতে পারবে। ফেডারেশন অব আমেরিকান সায়েন্টিস্টসের তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার কাছে এখন ৪,৪০০টি ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ৩,৭০০টি সক্রিয় ওয়ারহেড আছে। চীনের কাছে আছে ৬২০টি।
তাইওয়ান, ইরান সংঘাত এবং এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি নিয়ে অনিশ্চয়তা- এই বিষয়গুলো সিঙ্গাপুরের শাংগ্রি-লা ডায়ালগ সম্মেলনে প্রধান আলোচনার বিষয় হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সম্মেলনটি ২৯ থেকে ৩১ মে পর্যন্ত চলবে।











































