পলিন হ্যানসন
বহুসংস্কৃতিবাদ নাকি একক সাংস্কৃতিক পরিচয়—এই প্রশ্নে নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতি। ওয়ান নেশন নেতা পলিন হ্যানসনের সাম্প্রতিক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সরকার, ধর্মীয় সংগঠন ও অভিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক।বিশ্বের অন্যতম বহুসংস্কৃতির দেশ হিসেবে পরিচিত অস্ট্রেলিয়ায় আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে জাতীয় পরিচয়, অভিবাসন ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের প্রশ্ন। সরকার, বিরোধী দল, ধর্মীয় সংগঠন এবং অভিবাসী সম্প্রদায়ের নেতারা বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে অবস্থান নিতে শুরু করেছেন।
জানা গেছে, গত ১৭ জুন ক্যানবেরার ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবে দেওয়া ভাষণে পলিন হ্যানসন বলেন, অস্ট্রেলিয়া বহু জাতিগোষ্ঠীর দেশ হলেও সাংস্কৃতিকভাবে ‘এক ছাতার নিচে’ থাকা উচিত। তার এ বক্তব্য ঘিরেই দেশটির রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে।
বক্তব্যে তিনি বহুসংস্কৃতিবাদকে ‘ব্যর্থ নীতি’ হিসেবে উল্লেখ করে অস্ট্রেলিয়ার জন্য একক সাংস্কৃতিক পরিচয়ের পক্ষে মত দেন। একই সঙ্গে অভিবাসন কমানো, ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অবস্থানকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া, রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম এসবিএস বিলুপ্ত করা এবং সম্প্রচার ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব তুলে ধরেন তিনি।
হ্যানসনের দাবি, অস্ট্রেলিয়া বহু জাতিগোষ্ঠীর মানুষের আবাসভূমি হলেও সাংস্কৃতিকভাবে একটি অভিন্ন পরিচয় থাকা প্রয়োজন। তার মতে, দীর্ঘদিন ধরে অনুসৃত বহুসংস্কৃতিবাদ নীতি সামাজিক সংহতি দুর্বল করেছে এবং জাতীয় মূল্যবোধকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।ফলে বিভিন্ন সংস্কৃতিকে সমানভাবে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার ফলে জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
ভাষণে তিনি অভিবাসন নীতির কঠোর সমালোচনা করে বলেন, কোভিড-পরবর্তী সময়ে উচ্চ অভিবাসন প্রবাহ আবাসন সংকট, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে। তাই অভিবাসন উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা এবং ভিসার মেয়াদোত্তীর্ণ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
তবে হ্যানসনের বক্তব্যের পরপরই এর বিরোধিতা শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবেনিজ বলেন, অস্ট্রেলিয়ার শক্তি তার বৈচিত্র্য ও সামাজিক সম্প্রীতির মধ্যে নিহিত।
তিনি বলেন, বিভাজনের রাজনীতি দেশের মানুষের প্রকৃত সমস্যার সমাধান দিতে পারে না। বরং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতাই অস্ট্রেলিয়ার অগ্রগতির ভিত্তি।
বিরোধী দলের পক্ষ থেকেও ওয়ান নেশনের প্রস্তাবগুলোর বাস্তবতা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে অভিবাসন ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মতো বিষয়গুলো আবারও রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসছে।
এদিকে, অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইমামস কাউন্সিল এক বিবৃতিতে হ্যানসনের বক্তব্যের সমালোচনা করেছে। সংগঠনটি বলেছে, আবাসন সংকট, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি কিংবা অন্যান্য অর্থনৈতিক সমস্যার জন্য অভিবাসী বা মুসলিম সম্প্রদায়কে দায়ী করা বাস্তবসম্মত নয়। তাদের মতে, মুসলমানরা দীর্ঘদিন ধরে অস্ট্রেলিয়ার সমাজ, অর্থনীতি ও ইতিহাসের অংশ এবং কোনো ব্যক্তি বা ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডের দায় পুরো সম্প্রদায়ের ওপর চাপানো সামাজিক সম্প্রীতির জন্য ক্ষতিকর।
সংগঠনটি আরো বলেছে, ধর্মীয় স্বাধীনতা, সমঅধিকার, পারস্পরিক সম্মান এবং বহুসংস্কৃতিবাদ আধুনিক অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম ভিত্তি। এসব মূল্যবোধ দুর্বল করার যেকোনো প্রচেষ্টা সমাজে বিভাজন বাড়াতে পারে।
হ্যানসনের ভাষণ চলাকালে ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবের ভেতরেও প্রতিবাদ দেখা যায়। একদল কর্মী ব্যানার প্রদর্শন করে তার নীতির বিরোধিতা করেন। পরে কর্তৃপক্ষ ব্যানারটি সরিয়ে দেয় এবং ঘটনাটি তদন্তের জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার কাছে পাঠানোর কথা জানায়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পলিন হ্যানসনের বক্তব্য শুধু অভিবাসন নীতিকে ঘিরে বিতর্ক সৃষ্টি করেনি বরং অস্ট্রেলিয়ার ভবিষ্যৎ পরিচয়, সামাজিক কাঠামো এবং বহুসংস্কৃতিবাদ নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ককে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। নির্বাচন সামনে রেখে এই বিতর্ক আগামী মাসগুলোতে দেশটির রাজনৈতিক আলোচনায় আরও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠতে পারে।











































