যুক্তরাষ্ট্রে ৩২ মিলিয়ন মশা ছাড়তে অনুমতি চাইল গুগল

ছবি : রয়টার্স

গুগল এবার রোগ ছড়ানো মশার সংখ্যা কমাতে নতুন একটি উদ্যোগ নিয়েছে। এ জন্য প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া ও ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে মোট ৩২ মিলিয়ন (৩ কোটি ২০ লাখ) পর্যন্ত জীবাণুমুক্ত পুরুষ মশা ছাড়ার অনুমতি চেয়েছে।

গুগলের লক্ষ্য হলো, এসব জীবাণুমুক্ত পুরুষ মশা স্ত্রী মশার সঙ্গে মিলিত হলেও বংশবিস্তার করতে পারবে না। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রোগ ছড়ানো মশার সংখ্যা কমে আসবে। মশাকে বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী প্রাণী হিসেবে ধরা হয়। কারণ ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, জিকা, চিকুনগুনিয়া এবং ওয়েস্ট নাইল ভাইরাসের মতো রোগ ছড়িয়ে প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষের জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলে।

মার্কিন পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা (ইপিএ) বর্তমানে গুগলের আবেদন পর্যালোচনা করছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, দুই বছর ধরে প্রতিবছর ক্যালিফোর্নিয়া ও ফ্লোরিডায় ১৬ মিলিয়ন পর্যন্ত মশা ছাড়া হতে পারে। এ বিষয়ে জনমত গ্রহণের সময়সীমা ৫ জুন পর্যন্ত। এরপর ইপিএ সিদ্ধান্ত নেবে গুগলকে পরীক্ষামূলকভাবে এই প্রকল্প চালানোর অনুমতি দেওয়া হবে কি না।

এই প্রকল্পে ব্যবহৃত পুরুষ মশাগুলো মানুষকে কামড়ায় না এবং কোনো রোগও ছড়ায় না। গুগলের পরীক্ষাধীন একটি প্রধান পদ্ধতিতে পুরুষ মশার শরীরে ওলবাকিয়া নামের একটি প্রাকৃতিক ব্যাকটেরিয়া প্রবেশ করানো হয়। এরপর এসব মশা বন্য পরিবেশের স্ত্রী মশার সঙ্গে মিলিত হলেও তাদের ডিম থেকে নতুন মশা জন্মায় না।

গুগলের ভাষায়, ‘প্রতিটি প্রজন্মের সঙ্গে সঙ্গে মশার সংখ্যা কমতে থাকে।’ এর ফলে সময়ের সঙ্গে রোগ ছড়ানো মশার জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেতে পারে।প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গুগলের এমন মশা ও ব্যাকটেরিয়া নিয়ে কাজ করা কিছুটা অস্বাভাবিক মনে হলেও, তাদের মূল প্রতিষ্ঠান অ্যালফাবেট দীর্ঘদিন ধরেই বিজ্ঞান ও স্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষণায় যুক্ত।

এই কর্মসূচির পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে ভেরেলি হেল্থ, যা গুগলের গবেষণা বিভাগ থেকে শুরু হওয়া একটি স্বাস্থ্য ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রতিষ্ঠান। রোগ প্রতিরোধ ও বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সমস্যা মোকাবিলায় প্রযুক্তি ও তথ্যবিজ্ঞান ব্যবহার করাই এর মূল লক্ষ্য। ‘ডিবাগ’ প্রকল্পটি দীর্ঘদিন ভেরিলির অধীনে পরিচালিত হলেও ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে গুগল প্রকল্পটির পূর্ণ মালিকানা গ্রহণ করে। ফলে এটি এখন সরাসরি গুগলের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে।

ডিবাগ প্রকল্পের ২০১৬ সালের একটি ব্লগ পোস্টে উল্লেখ করা হয়েছে, এই প্রোগ্রামটি প্রায় এক দশক আগে মারাত্মক মশা মোকাবেলার জন্য শুরু করেছিল। গুগল বলছে, মশা দমনের অন্যান্য উপায়গুলো কার্যকর হয়নি। কীটনাশক স্প্রে করা বিষাক্ত হতে পারে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর কার্যকারিতা কমে যায়। এ ছাড়া মশার প্রজনন ক্ষেত্র হয়ে ওঠা সমস্ত জলাশয় খুঁজে বের করা ও পরিষ্কার করা কঠিন।

গুগলের এই পদ্ধতিটি অনন্য নয়। সংস্থাটি ‘স্টেরাইল ইনসেক্ট টেকনিক’ নামক একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করছে, যা বিশেষজ্ঞরা কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন ক্ষতিকর পোকামাকড়ের ওপর প্রয়োগ করে আসছেন।

ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক এরিক কারাগাটা ইউএসএ টুডেকে বলেছেন, জীবাণুমুক্তকরণের জন্য ওলবাকিয়া ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার প্রায় ১৫ বছর ধরে করা হচ্ছে। তিনি মশা-অণুজীবের মিথস্ক্রিয়া বিষয়ে বিশেষজ্ঞ।

আপাতত, গুগল তাদের প্রাথমিক প্রচেষ্টা এডিস ইজিপ্টি নামক এক প্রজাতির মশা নিয়ে কাজ করবে। এটি ডেঙ্গু, জিকা, ইয়েলো ফিভার এবং চিকুনগুনিয়ার বেশির ভাগ সংক্রমণের জন্য দায়ী।

গুগল জানিয়েছে, তাদের প্রকৌশলী ও বিজ্ঞানীরা এই নাজুক প্রাণীগুলোর জন্য ‘স্বয়ংক্রিয় প্রতিপালন ব্যবস্থা’ তৈরি করতে ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং সেন্সর ব্যবহার করছেন। এই চ্যালেঞ্জের একটি অংশ হলো, এআই-চালিত কম্পিউটার ভিশন ব্যবহার করে পুরুষ ও স্ত্রীদের নির্ভুলভাবে আলাদা করা এবং পুরুষদের ‘সঠিক জায়গায় ও সঠিক সংখ্যায়’ ছেড়ে দেওয়া।

গুগলের ‘ডিবাগ’ প্রকল্প ২০১৬ সালে প্রকাশিত একটি ব্লগ পোস্টে জানায়, প্রায় এক দশক আগে থেকেই তারা রোগ ছড়ানো মশা নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান নিয়ে কাজ শুরু করেছিল। গুগলের মতে, মশা দমনের প্রচলিত অনেক পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কীটনাশক স্প্রে পরিবেশ ও মানুষের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে, আবার সময়ের সঙ্গে এর কার্যকারিতাও কমে যায়। অন্যদিকে, মশার বংশবিস্তারের সব জলাশয় খুঁজে বের করে পরিষ্কার করাও খুব কঠিন।

তবে গুগলের এই পদ্ধতি একেবারে নতুন নয়। তারা ‘স্টেরাইল ইনসেক্ট টেকনিক’ নামে পরিচিত একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করছে, যা কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন ক্ষতিকর পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত হচ্ছে। মশা ও অণুজীব নিয়ে গবেষণাকারী এরিক কারাগাটা বলেন, মশাকে জীবাণুমুক্ত করতে ওলবাকিয়া ব্যাকটেরিয়া ব্যবহারের পদ্ধতি প্রায় ১৫ বছর ধরে ব্যবহার করা হচ্ছে।

বর্তমানে গুগল বিশেষভাবে এডিস ইজিপ্টি প্রজাতির মশার ওপর কাজ করছে। এই মশাই ডেঙ্গু, জিকা, ইয়েলো ফিভার এবং চিকুনগুনিয়ার মতো রোগের বেশিরভাগ সংক্রমণের জন্য দায়ী। গুগল জানিয়েছে, তাদের বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীরা ডেটা বিশ্লেষণ, সেন্সর এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে মশা পালনের স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা তৈরি করছেন।

এই প্রযুক্তির মাধ্যমে পুরুষ ও স্ত্রী মশাকে আলাদা করা হয় এবং শুধু জীবাণুমুক্ত পুরুষ মশাগুলোকে নির্দিষ্ট এলাকায় সঠিক সংখ্যায় ছেড়ে দেওয়া হয়। এর লক্ষ্য হলো রোগ ছড়ানো মশার সংখ্যা ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা।

গুগলের ‘ডিবাগ’ প্রকল্প ইতোমধ্যে সিঙ্গাপুরে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে। দেশটিতে এই কর্মসূচির প্রথম আন্তর্জাতিক গবেষণা ও উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছিল।

গুগল জানিয়েছে, সিঙ্গাপুরের জাতীয় পরিবেশ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, লাখ লাখ ওলবাকিয়া-সংক্রমিত পুরুষ মশা ছাড়ার ফলে এডিস ইজিপ্টি মশার সংখ্যা ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। একই সঙ্গে মশা ছাড়ার ৬ থেকে ১২ মাসের মধ্যে ডেঙ্গুর প্রকোপ ৭০ শতাংশেরও বেশি হ্রাস পেয়েছে।

এই সাফল্যের ভিত্তিতে গুগল মে মাসে ঘোষণা দেয়, তারা সিঙ্গাপুরের কেন্দ্রটি আরো সম্প্রসারণ করবে। ডিবাগ প্রকল্পের প্রধান লিনাস আপসন বলেন, সিঙ্গাপুরে প্রকল্পটি চালুর সময় তাদের লক্ষ্য ছিল প্রযুক্তির সাহায্যে মশা উৎপাদন ও ছাড়ার প্রক্রিয়াকে আরো কার্যকর করা। এ ছাড়া এশিয়ার বেশি মানুষের কাছে এই কর্মসূচি পৌঁছে দেওয়া।

তিনি বলেন, বিশ্বের প্রায় ৭০ শতাংশ ডেঙ্গু সংক্রমণ এশিয়ায় ঘটে। সিঙ্গাপুরে পাওয়া ইতিবাচক ফলাফলই তাদেরকে এই প্রকল্প আরো বিস্তৃত করার আত্মবিশ্বাস দিয়েছে।

LEAVE A REPLY