সুরবিহার কখনো থেমে থাকেনি : অণিমা রায়

দুই দশকে পদার্পণ করেছে গুণী রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী ও শিক্ষক অণিমা রায়ের সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ‘সুরবিহার’। এ উপলক্ষে আজ বিকেলে বাংলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত হবে ‘বর্ষা বন্দনা’। অনুষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠানটির পথচলা নিয়ে শিল্পীর সঙ্গে কথা বলেছেন কামরুল ইসলাম।

নিজের গড়া প্রতিষ্ঠানটি সময়ের সীমানা পেরিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, কেমন লাগছে?
এটা নিঃসন্দেহে ভালো লাগার বিষয়।

আমি নিজেই বুঝতে পারিনি, কিভাবে বিশ বছর হয়ে গেল। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আছি, ব্যক্তিগত গান করি, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিই, আবার গোলাপ গ্রামে একটা প্রজেক্ট আছে। সব মিলিয়ে কাজের মধ্যে ডুবে থাকি। হঠাৎ করে খেয়াল হলো, সুরবিহারের বয়স ২০ বছর হয়ে গেছে।

২০০ ৪ সালে এটা শুরু করেছিলাম। এই লম্বা সময়ে নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরোতে হয়েছে। করোনার মতো কঠিন সময় গেছে। ওই সময় আমরাই সবার আগে অনলাইনে ক্লাস নেওয়া শুরু করেছিলাম।

বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এক-দুই মাস বন্ধ থাকলেও আমরা মাত্র এক সপ্তাহ পরই অনলাইনের মাধ্যমে ক্লাস শুরু করেছিলাম। অর্থাৎ সুরবিহার কখনো থেমে থাকেনি। আমাদের তাড়াহুড়া নেই। আনন্দ নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি।

‘বর্ষা বন্দনা’ আয়োজনটা সম্পর্কে জানতে চাই।কী কী থাকছে?
আজ বিকেল ৪টায় শুরু হয়ে রাত ৮টা পর্যন্ত চলবে। বর্ষার সময়টা অন্য রকম। আকাশ একেক সময় একেক রূপ ধারণ করে। আজ বৃষ্টির সম্ভাবনাও আছে। যার জন্য মনে মনে প্রার্থনাও করছি। বর্ষার আয়োজনে যদি একটু বৃষ্টি না থাকে, তাহলে আনন্দটা পূর্ণ হয় না। বাংলা একাডেমির বর্ধমান ভবন প্রাঙ্গণে খোলা আকাশের নিচে মানুষ পুকুরঘাটে, গাছতলায় বসে গান শুনবে। এখানে চিত্রপ্রদর্শনীও থাকছে। শিশুদের আঁকা প্রায় ১০০ ছবি থাকবে। সঙ্গে শিশুদের পরিবেশনা। অনুষ্ঠানে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সাদেকা হালিম, নাট্যজন মামুনুর রশীদের মতো গুণী মানুষ উপস্থিত থাকবেন। আর মূল পর্ব সাজানো হয়েছে গান, কবিতা ও নৃত্যে। শুধু তা-ই নয়, এই প্রজন্মের কথা বিবেচনা করে ইনস্ট্রুমেন্টাল পরিবেশনাও রেখেছি। যারা এখন মোবাইলে তাকিয়ে থাকতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে, তাদের আমরা সবুজ দেখাতে চাই, পুকুরের জলে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ার দৃশ্য দেখাতে চাই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেমন প্রকৃতির মধ্যে আনন্দ খোঁজার চেষ্টা করেছেন, আমরাও সেই চেষ্টা অব্যাহত রাখতে চাই।

বর্ষা নিয়ে কি এবারই প্রথম আয়োজন?
হ্যাঁ। বর্ষা, বসন্ত, বৈশাখ কিংবা বিভিন্ন দিবস নিয়ে জাতীয় পর্যায়ের সব আয়োজনে আমরা নিয়মিত অংশ নিই। সুরবিহারের ২০ বছর উপলক্ষে এই প্রথম নিজেদের আয়োজনে বর্ষা নিয়ে অনুষ্ঠান করছি। ভবিষ্যতে এটা নিয়মিত করব। আমরা চাই ছেলে-মেয়েরা সংস্কৃতিচর্চা করবে; কিন্তু সেই সুযোগ কোথায় দিচ্ছি! তাদের তো মঞ্চ দিতে হবে। যারা এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠিত, তাঁদের নিয়েই শুধু অনুষ্ঠান হয়। কিন্তু যাদের ঘিরে আমাদের ভবিষ্যৎ, তারা সামনে না এলে তো চর্চা থমকে যাবে।

সুরবিহারের শুরুর গল্পটা শুনতে চাই…
তখন আমি সবে স্নাতক শেষ করে একটি ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে চাকরি নিয়েছি। ওখানে দেখতাম, বাচ্চারা বাংলা গানের প্রতি উদাসীন। ইংরেজি গান শিখতে চায়। তার ওপর মাত্র ৪০ মিনিট বেঁধে দেওয়া সময়। এ জন্য নিজের একটা জায়গার প্রয়োজন অনুভব করি। এক বন্ধুর কোচিং সেন্টার ছিল। ভাড়া ছাড়াই সেখানে আমাকে গান শেখানোর সুযোগ করে দেয়। তখন আমার বেতন ছিল মোটে সাত হাজার টাকা। ওটা দিয়ে নিজের স্কুল চালানোর মতো সামর্থ্য ছিল না। ছোট পরিসরে শুরু করলেও প্রথম মাস থেকেই আমি অনেক শিক্ষার্থী পেয়েছি। ফলে দুই মাস পরই ওই কোচিং সেন্টার থেকে ধানমণ্ডি স্থায়ীভাবে সুরবিহার স্থানান্তর করি। এখন বনানীতেও শাখা আছে। ওই সময়টা কঠিনও ছিল বেশ। কারণ চাকরি থেকে আমাকে শর্ত দেওয়া হয়েছিল হয় স্কুল নতুবা চাকরি বেছে নিতে। আমি ঝুঁকি নিয়ে চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছিলাম। আমার ভাবনা ছিল, চাকরি একটা গেলে হয়তো আরেকটা পেয়ে যাব। কিন্তু যে স্বপ্ন নিয়ে সুরবিহার প্রতিষ্ঠা করেছি, সেটা থেকে পিছপা হব না। এই সময় এসে সেই সময়ের দিনগুলো মনে পড়ে। কারা পাশে ছিল, কারা ছিল না। তবে কষ্টটুকু আমার থাক, আনন্দটা সবার সঙ্গে ভাগ করে নিতে চাই।

শিল্পী ও সাংগঠনিক দুই ভূমিকায় আপনার লম্বা পথচলা। এই সময়ে রবীন্দ্র-নজরুল চর্চা কেমন হচ্ছে?
জনসংখ্যার সঙ্গে চর্চার পরিধি বাড়ার কথা। ছেলে-মেয়েরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে, তা নয়। কিন্তু পৃষ্ঠপোষকতা যদি না থাকে, তাহলে এগোবে না। একটা গাছে পানি না দিলে, পরিচর্যা না করলে সেটা যথার্থ ফল দেবে না। আমরা শুরুটা করি, কিন্তু শেষ নিয়ে কাজ করি না। বাচ্চাদের প্ল্যাটফরম দিতে হবে। রবীন্দ্র, নজরুল লালনের চর্চা করতে হবে। নিজস্ব সংস্কৃতি হারিয়ে গেলে তো ধার করা সংস্কৃতি নিয়ে চলতে হবে। সেটা ভিক্ষাবৃত্তির মতো। আমাদের সংস্কৃতি কত সমৃদ্ধ। সবাই মিলে চেষ্টা করলে একটা সুন্দর আগামী পাবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।

সবশেষে আপনার গানের খবর জানতে চাই। নতুন কী গান উপহার দেবেন?
এই বর্ষার প্রথম দিনেই আমার কণ্ঠে ‘পাগলা হাওয়ার বাদর দিনে’ গানটি প্রকাশিত হয়েছে। আজকের অনুষ্ঠানের পর ‘ওরে ঝড় নেমে আয়’ শিরোনামের একটি গান প্রকাশ করব। এর পাশাপাশি অনুষ্ঠানের ব্যস্ততা লেগেই আছে। গতকাল পুলিশের একটা অনুষ্ঠানে গান করেছি, আজ সকালে চ্যানেল আইতে লাইভ, বিকেলে সুরবিহারের অনুষ্ঠান।

LEAVE A REPLY