সেরা দশের গল্প বললেন ডলি জহুর

ডলি জহুর

দেশের খ্যাতিমান একজন অভিনেত্রী ডলি জহুর। মঞ্চ থেকে শুরু করে টেলিভিশন, চলচ্চিত্র সব জায়গায় সমান পদচারণা এবং জনপ্রিয়তা তার। বিশেষ করে নব্বইয়ের দশকের সিনেমায় নায়ক-নায়িকাদের মায়ের চরিত্রে ডলি জহুর ছিলেন অনেকটা অপ্রতিদ্বন্দ্বী। কাজ করেছেন দেড় শতাধিক চলচ্চিত্রে।

দুইবার জিতেছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। পেয়েছেন আজীবন সম্মাননা এবং একুশে পদকও।

কালের কণ্ঠের নিয়মিত আয়োজন রঙের মেলার এবারের প্রতিবেদন এই বর্ষীয়ান অভিনেত্রীকে নিয়ে। নিজের ক্যারিয়ারসেরা প্রিয় দশটি কাজের গল্প বলেছেন একুশে পদকজয়ী এই অভিনেত্রী।

শুনেছেন হৃদয় সাহা।

মঞ্চনাটক মানুষ [১৯৯১]

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সাল থেকে দেশে একের পর এক নাটকের দল গড়ে ওঠে। তখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। ম হামিদ ভাইয়ের নাট্যকেন্দ্রে যুক্ত হই, পরে সেখান থেকে বেরিয়ে এসে আমার স্বামী জহুরুল ইসলামের সঙ্গে যোগ দিই কত্থক নাট্যগোষ্ঠীতে।

সেখানে ‘প্রাগৈতিহাসিক’ করেছিলাম, মাঝপথে বন্ধ হয়ে যায় নাটকটি।

তখন মামুনুর রশীদ বাংলা থিয়েটারের জন্য নাটক ‘মানুষ’ লেখেন, মুখ্য নারী চরিত্রে অভিনয়ের জন্য প্রস্তাব দেন আমাকে। মামুন ভাই বলেছিলেন, সন্ধ্যা রানী চরিত্রটি আমাকে ভেবেই সৃষ্টি করেছেন তিনি। এরপর নিয়মিতভাবে ‘মানুষ’-এর শো করতে থাকি, প্রায় ২৫০টি প্রদর্শনী করেছিলাম। এ নাটকের সুবাদে প্রথমবার দেশের বাইরে যাই।একবার ‘মানুষ’ নাটক করতে গিয়েছিলাম বিদেশে, সেখানে আরণ্যক নাট্যদলের ‘ইবলিশ’-এর প্রদর্শনীও ছিল। নাজমা আনোয়ার ভাবির অবর্তমানে সেখানে ‘ইবলিশ’ নাটকে অভিনয় করেছিলাম। দেশে ফিরে এসে করি ‘ময়ূর সিংহাসন’। তার পর থেকে আরণ্যকের সদস্য হয়ে গেলাম৷ ‘ময়ূর সিংহাসন’ মঞ্চে আমার সবচেয়ে জনপ্রিয় নাটক হলেও ‘মানুষ’ই আমার বেশি প্রিয়, কারণ এটি মঞ্চে আমাকে পরিচিতি এনে দিয়েছিল।

টিভি নাটক অক্টোপাস [১৯৮৪]

আশির দশকের শুরুতেই টেলিভিশন নাটকে অভিনয় শুরু করি। আমি, হুমায়ুন ফরীদি, সুবর্ণা মুস্তাফা, তারিক আনাম মিলে এই নাটকটা করি। শামসুর রাহমানের ‘অক্টোপাস’ প্রকাশিত হওয়ার পর আতিকুল হক চৌধুরী সাহেব নিজেই উপন্যাসটির নাট্যরূপ দিয়ে একই নামে নাটক বানান। আমি লেখকের স্ত্রীর চরিত্রে অভিনয় করি। খুব প্রশংসিত হয় নাটকটি। ‘অক্টোপাস’ ছাড়াও ‘সুখের উপমা’, ‘আন্তরিক’ নাটকগুলোর সুবাদে পরিচিতি পেতে থাকি।

ধারাবাহিক এইসব দিনরাত্রি [১৯৮৫]

আজকের ডলি জহুর হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বেশি অবদান এই ধারাবাহিক নাটকের। ধারাবাহিক নাটকের সুবিধা হলো, অনেক দিন একই চরিত্রে অভিনয় করতে হয়, দর্শক খুব আপন করে নেয়। ‘এইসব দিনরাত্রি’র নীলু ভাবির চরিত্রটিকেও দর্শক আপন করে নিয়েছিল। নীলু ভাবিকে দর্শক একটি আদর্শ চরিত্র ভাবা শুরু করে। হুমায়ূন আহমেদের গল্পে এটিই আমার প্রথম অভিনয়, প্রযোজক ছিলেন মুস্তাফিজুর রহমান। ধারাবাহিকটির গল্প যেমন একটি পরিবারকে ঘিরে, তেমনি আমরা অভিনয়কুশলীরাও একটা পরিবার হয়ে গিয়েছিলাম। বুলবুল আহমেদ, আসাদুজ্জামান নূর, দিলারা জামান, খালেদ খান, লতা, রাইসুল ইসলাম আসাদ, শিল্পী সরকার অপুসহ আরো অনেকেই ছিলেন। আমরা শুটিংয়ের ফাঁকে আড্ডা-গল্পে মেতে উঠতাম। হুমায়ূন সাহেবও আসতেন। এ নাটকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেকেই আজ বেঁচে নেই, তাঁদের কথা খুব মনে পড়ে। বুলবুল ভাইয়ের সঙ্গে বেশির ভাগ দৃশ্য ছিল আমার। আমাদের মেয়ে টুনির চরিত্র করা লোপা খুব অল্প বয়সেই মারা গেল।

স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র জননী [১৯৯১]

কৃষিজমিতে পানি সেচ প্রকল্পের উপকারিতা জানাতে মিশুক মুনির এই প্রজেক্ট হাতে নেন। হুমায়ূন আহমেদকে দায়িত্ব দেওয়া হয় গল্প লেখার, পরিচালক ছিলেন নওয়াজেশ আলী খান। নাটক হিসেবে প্রচারিত হলেও এটি মূলত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। গল্পে দেখা যায়, স্বামী বাউণ্ডুলে হওয়ায় সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে স্ত্রীর ওপর। অভাব, দুঃখ, সন্তান হারানোর শোক কাটিয়ে গ্রামের এক নারী কিভাবে স্বাবলম্বী হয়ে ওঠে, তাই খুব চমৎকারভাবে দেখানো হয়েছিল। ‘জননী’ খুব প্রশংসিত হয়েছিল।

চলচ্চিত্র শঙ্খনীল কারাগার [১৯৯২]

‘এইসব দিনরাত্রি’ জনপ্রিয় হওয়ার পরই মুস্তাফিজুর রহমান ভাই ভাবেন হুমায়ূন আহমেদের আরেকটি উপন্যাস নিয়ে কাজ করবেন, তবে এবার বানাবেন সিনেমা। হুমায়ূন আহমেদ নিজেই চিত্রনাট্য লেখেন। সুবর্ণা মুস্তাফা, চম্পাদের মতো তারকা নায়িকা থাকার পরও মুখ্য নারী চরিত্র রাবেয়ার জন্য আমাকে ভেবেছিলেন। রাবেয়া আমার খুব পছন্দের চরিত্র, দর্শকও খুব পছন্দ করেছিল। রাবেয়া হওয়ার জন্য আমি অনেক ওজন কমিয়েছিলাম, বেশ কষ্ট করেছিলাম। এ ছবির জন্য আমি প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাই। তাই এটা আমার কাছে আরো বিশেষ।

চলচ্চিত্র আগুনের পরশমণি [১৯৯৪]

হুমায়ূন আহমেদের লেখা গল্প-উপন্যাসে বেশ কিছু কাজ করলেও তাঁর পরিচালনায় এই একটি কাজই করেছিলাম। হুমায়ূন আহমেদ সিনেমা বানাচ্ছেন, আমাদের অভিনয়শিল্পীদের মধ্যেও ছিল বেশ উত্তেজনা, কারা কারা অভিনয় করবেন। তিনি আমায় ফোন দিয়ে ছবিটা করতে বলেন। তখন আমি সবে বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রে নিয়মিত হচ্ছি, খুব ব্যস্ত শিডিউল। আমি মূলত দেখা করতে যাই, তাঁকে ‘না’ করে দেব ভেবে। কিন্তু দেখা করার পর তিনি এমনভাবে আবদার করলেন, আর ‘না’ বলতে পারিনি। তারপর এদিক-সেদিক শিডিউল মিলিয়ে ছবিটার শুটিং করি। শুটিংয়ের সময়ই বুঝতে পারি ছবিটা বিখ্যাত হবে। হয়েছেও তাই, অনেক জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিল। ভেবেছিলাম আমিও পাব, কিন্তু পাইনি৷ আরেকটি কথা, এই ছবিতেই আমি আবুল হায়াত ভাইয়ের সঙ্গে জুটি বেঁধে প্রথম অভিনয় করি। এরপর নিয়মিতই বিভিন্ন নাটক-সিনেমায় জুটি বেঁধেছি আমরা।

চলচ্চিত্র বিক্ষোভ [১৯৯৪]

সালমান শাহ যখন শিশুশিল্পী ছিল, তখন নাটকে আমার সন্তানের চরিত্রে অভিনয় করত। তখন থেকেই আমাদের মা-সন্তানের সম্পর্ক। আমি যখন সিনেমায় নিয়মিত হলাম, তখন সে খুব খুশি হয়ে বলল, এখন থেকে সিনেমায়ও আমরা মা-ছেলে হব। ওর সঙ্গে প্রথম ছবি ‘বিক্ষোভ’। ছাত্ররাজনীতির ভয়াবহতা নিয়ে ছবিটা। সালমানের মা হয়েছিলাম আমি, এর পর থেকে আমরা একের পর এক ছবিতে অভিনয় করতে থাকি। ছবিটা তখন তো জনপ্রিয় হয়েছিলই, এখন আরো বেশি জনপ্রিয়। এরপর সালমানের সঙ্গে প্রায় দশটি ছবি করেছি। ‘স্বপ্নের ঠিকানা’ তো খুব ব্যবসা করেছিল, ‘বিচার হবে’, ‘আনন্দ অশ্রু’ও আমার ক্যারিয়ারের উল্লেখযোগ্য ছবি।

চলচ্চিত্র বাবা কেন চাকর [১৯৯৭]

আমার প্রথম ছবি ‘অসাধারণ’ [১৯৮৫]-এ নায়ক ছিলেন রাজ্জাক ভাই। পরে তাঁর পরিচালনায় ‘প্রেম শক্তি’তে ছোট্ট একটি চরিত্র করেছিলাম। দীর্ঘ বিরতির পর রাজ্জাক ভাই আবার যখন ছবি নির্মাণ করতে এলেন, তখন আমাকে এমন গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে নির্বাচন করবেন ভাবতেও পারিনি। সিনেমায় রাজ্জাক ভাই ছিলেন বাবা, আর আমি মা। ছবির নাম প্রথমে ছিল ‘কী আশায় বাঁধি খেলাঘর’, পরে বিশেষ কারণে ‘বাবা কেন চাকর’ রাখা হয়। এ নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলেন, তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, এ নামের কারণেই ছবিটি বেশি হিট হয়েছিল৷ ‘বাবা কেন চাকর’ যখন মুক্তি পায়, তখন সিনেমার অবস্থা ধীরে ধীরে খারাপের দিকে যাচ্ছিল। ওই সময় এমন পারিবারিক গল্পের ছবি সুপারহিট হওয়াটা রীতিমতো বিস্ময়কর।

চলচ্চিত্র সন্তান যখন শত্রু [১৯৯৯]

রাজ্জাক ভাই পরিচালিত ‘সত্ভাই’-এর রিমেক। অভিনেত্রী মিনু রহমানের করা চরিত্রে অভিনয়ের জন্য আমাকে অফার করেন৷ দর্শক আমাকে যেমন মাতৃসুলভ চরিত্রে দেখতে চায়, এ ছবিটিও তেমন। তবে এখানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ছিল আমার। বাপ্পারাজের সঙ্গে আমার দৃশ্যগুলো খুব আবেগঘন, দর্শক পছন্দ করেছে। রাজ্জাক ভাইয়ের প্রত্যাশামাফিক ব্যবসা করতে না পারলেও টেলিভিশনে প্রচারের পর বেশ সমাদৃত হয়।

চলচ্চিত্র নিরন্তর [২০০৬]

এ ছবিটা যখন করি, তখন সিনেমায় অভিনয় কমিয়ে দিয়েছিলাম। পছন্দমতো পাণ্ডুলিপি পেলে করি। ইমপ্রেস টেলিফিল্ম থেকে ইবনে হাসান খান প্রথম আমাকে এ ছবিতে অভিনয়ের কথা বলেন। হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস ‘জনম জনম’ থেকে ছবিটি নির্মাণ করবেন আবু সাইয়ীদ, যে কারণে আগ্রহ বেড়ে যায়। ছবিতে শাবনূর আমার মেয়ে, সংসারের হাল ধরার জন্য বাধ্য হয়ে তাকে নিশিকন্যা হতে হয়। তার জীবনের অব্যক্ত কষ্ট, যন্ত্রণা মা হিসেবে আমার বুকেও বিঁধে যায়। বহু ছবিতে আমি আর শাবনূর মা-মেয়ে, তার মধ্যে ‘নিরন্তর’টা আলাদা। আন্তর্জাতিকভাবেও ছবিটা প্রশংসিত হয়। তবে ছবিটি জাতীয় পুরস্কার না পাওয়ায় হতবাক হই। অবশ্য একই বছর আমি ‘ঘানি’র জন্য পুরস্কার পেয়েছিলাম।

LEAVE A REPLY