যে শর্তে পদত্যাগ করতে চান ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্টারমার

যুক্তরাজ্যে লেবার সরকারের অভ্যন্তরে চলমান অস্থিরতা এবং দলীয় শীর্ষ নেতাদের চাপের মুখে এবার প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার পদত্যাগের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তার ঘনিষ্ঠ মিত্রদের সূত্রে জানা গেছে, ক্ষমতা হস্তান্তরের একটি ‘সুশৃঙ্খল’ সময়সূচি ঘোষণা করে তিনি সম্মানের সঙ্গে সরে দাঁড়াতে চান।

ব্রিটিশ মন্ত্রিসভার বিভিন্ন সূত্রের বরাতে এক প্রতিবেদনে ডেইলি মেইল বলছে, স্টারমার স্বীকার করেছেন যে, বর্তমান বিশৃঙ্খলা টেকসই নয় এবং তিনি নিজের ‘পছন্দমতো ও মর্যাদার সঙ্গে’ বিদায় নিতে চান।

প্রতিবেদনে এক মন্ত্রী বলেন, ‘তিনি (স্টারমার) একটি সময়সূচি নির্ধারণ করবেন।’ তবে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা কবে আসতে পারে, তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে।

এর মধ্যেও স্টারমারের কিছু ঘনিষ্ঠ সহযোগী তাকে উপনির্বাচনের জনমত জরিপ ও পরিস্থিতি কেমন হয়, সে পর্যন্ত অপেক্ষা করার পরামর্শ দিয়েছেন।

মন্ত্রিসভার এক সূত্রের দাবি, চিফ অব স্টাফ মরগ্যান ম্যাকসুইনি প্রধানমন্ত্রীকে আরো কিছুদিন টিকে থাকতে বলেছেন। এতে, প্রতিদ্বন্দ্বিতা কাছাকাছি হলে বা গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র অ্যান্ডি বার্নহামের সম্ভাব্য পরাজয় রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে দিতেও পারে।

তবে স্টারমারের আরেক জ্যেষ্ঠ সমর্থক উপনির্বাচনের ফলের জন্য অপেক্ষা না করার পক্ষে মত দিয়েছেন। তিনি বলেন, স্টারমার উপনির্বাচনের ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করার ঝুঁকি নেবেন না।সেটা ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত অপমানজনক হবে।

এ পরিস্থিতিতে অ্যান্ডি বার্নহামের ওয়েস্টমিনস্টারে ফেরার পরিকল্পনা আরো জটিল হয়ে উঠেছে। তার ঘনিষ্ঠদের মতে, মেকারফিল্ড অঞ্চলে নির্বাচনী প্রচারের সময় স্টারমারের প্রধানমন্ত্রীর পদে থাকা রাজনৈতিকভাবে বেশি সুবিধাজনক হবে।

বার্নহাম শিবিরের এক মুখপাত্র বলেন, স্টারমার কবে বিদায়ের সময়সূচি ঘোষণা করবেন, তা নিয়ে তারা ‘স্বস্তিতে’ আছেন। তবে এটি প্রধানমন্ত্রীর বিষয়।আমরা এখন মেকারফিল্ডের প্রার্থী হিসেবে অ্যান্ডির পক্ষে সমর্থন আদায়ে মনোযোগ দিচ্ছি।

আরেক সহযোগী বলেন, প্রচারের বার্তা ‘জটিল’ হয়ে যাক তারা তা চান না। তার ভাষায়, ‘মানুষ যদি যুক্তরাজ্যের পরিবর্তনের ধীরগতিতে হতাশ হয়, তাহলে আমরা বলতে চাই—অ্যান্ডিকে ভোট দিন। সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন দেখতে পাবেন।’

স্টারমার প্রথমে মন্ত্রিসভার সহকর্মীদের সঙ্গে ‘সুশৃঙ্খল’ সমাধানের পথ নিয়ে আলোচনা শুরু করেছিলেন। কিন্তু পরে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন মহল থেকে ব্রিফিং শুরু হলে তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। বিশেষ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদের ঘনিষ্ঠদের ভূমিকা তাকে অসন্তুষ্ট করে।

এক সূত্রের ভাষ্য, স্টারমার মনে করেছিলেন তিনি ‘ভদ্র ও দায়িত্বশীল আচরণের’ চেষ্টা করছেন। অথচ অন্যরা রাজনৈতিকভাবে তাকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে।

এদিকে দলীয় শীর্ষ নেতৃবৃন্দ ও উপদেষ্টারা এমপিদের নেতৃত্ব পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান নিতে ব্যক্তিগতভাবে তদবির করছেন—এমন খবর প্রকাশের পর ব্রিটিশ রাজনীতিতে চাপ আরও বেড়ে যায়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্টারমারের ঘনিষ্ঠরা মনে করছেন, যারা প্রকাশ্যে তাকে সমর্থন দিচ্ছিলেন, তারাই গোপনে প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীর সঙ্গে ভবিষ্যৎ মন্ত্রিসভা নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক মন্ত্রী বলেন, স্টারমারের সবচেয়ে খারাপ লেগেছে এ কারণে যে, অনেকে তাকে বলছিলেন— ‘আমি এখনো আপনার সঙ্গেই আছি।’ অথচ তারাই ষড়যন্ত্রকারীদের সঙ্গে সমন্বয় চালিয়ে যাচ্ছিলেন।

অর্থমন্ত্রী র‍্যাচেল রিভস এক সাক্ষাৎকারে স্বাস্থ্য খাতে অর্থায়নের প্রসঙ্গ তুলে মন্তব্য করার পর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে যায়। ওই সাক্ষাৎকারে তিনি প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের যৌথ অবস্থানের বদলে নিজেকে আলাদা করে তুলে ধরেছেন বলে মনে করা হচ্ছে ব্রিটিশ রাজনীতিতে।

এক মন্ত্রীর মতে, এই মন্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে তিনি নিজেকে স্টারমার থেকে আলাদা করছেন।

একই দিনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। পরে খবর আসে, লেবার এমপি জশ সাইমনস মেকারফিল্ড আসন ছেড়ে দেবেন, যাতে বার্নহাম পার্লামেন্টে ফিরতে পারেন।

এই ঘটনাকে ডাউনিং স্ট্রিটের জন্য ‘বড় ধাক্কা’ হিসেবে বর্ণনা করেন এক মন্ত্রী।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, পরে স্টারমারের টিম লেবারের ন্যাশনাল এক্সিকিউটিভ কমিটিকে (এনইসি) বার্নহামের প্রার্থিতা ঠেকাতে রাজি করানোর চেষ্টা করে। কিন্তু উপনেতা লুসি পাওয়েল দ্রুত পরামর্শ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করায় সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।

স্টারমারের দীর্ঘদিনের এক সহযোগী বলেন, প্রধানমন্ত্রী আগে বিশ্বাস করতেন তিনি বারবার রাজনৈতিক সংকট কাটিয়ে উঠতে পারবেন। একই সঙ্গে তাকে ‘বিড়ালের প্রাণ’ বলা হলেও তিনি এখন বুঝতে শুরু করেছেন যে তার ‘শেষ জীবনটিও’ শেষ হয়ে গেছে।

LEAVE A REPLY