মজুরি থেকে কর : জুলাইয়ে বদলাচ্ছে অস্ট্রেলিয়া

নতুন অর্থবছরের শুরুতে ১ জুলাই থেকে অস্ট্রেলিয়াজুড়ে কার্যকর হচ্ছে একগুচ্ছ গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। মজুরি বৃদ্ধি, পিতা-মাতার বেতনসহ ছুটি সম্প্রসারণ, প্রতারণামূলক খুদে বার্তা নিয়ন্ত্রণ, ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য কর-সুবিধা, খাদ্যপণ্যের উৎস শনাক্তকরণ এবং ভোক্তা সুরক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নতুন নিয়ম চালু হচ্ছে।এসব পরিবর্তনের বেশির ভাগই ফেডারেল সরকার, ফেয়ার ওয়ার্ক কমিশন এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর ঘোষণার ধারাবাহিকতায় কার্যকর হচ্ছে বলে জানা গেছে।

সরকারি ঘোষণা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসছে কর্মক্ষেত্রে। গত ২ জুন ফেয়ার ওয়ার্ক কমিশন বার্ষিক মজুরি পর্যালোচনার রায় ঘোষণা করে। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ঘণ্টাপ্রতি ২৬ ডলার ৪৪ সেন্টে উন্নীত হচ্ছে।এর ফলে পূর্ণকালীন একজন কর্মীর সাপ্তাহিক আয় কর-পূর্ব ১ হাজার ৪ ডলার ৯০ সেন্টে পৌঁছাবে। একই সঙ্গে পুরস্কারভিত্তিক মজুরি কাঠামোর আওতাভুক্ত লাখো কর্মীর ন্যূনতম মজুরিও বাড়বে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা কর্মীদের জন্য এটি স্বস্তির খবর হলেও কিছু ক্ষুদ্র ব্যবসা বাড়তি শ্রম ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

পরিবারকেন্দ্রিক সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাতেও পরিবর্তন আসছে।সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত পিতা-মাতার বেতনসহ ছুটির সুবিধা ১২০ দিন থেকে বাড়িয়ে ১৩০ দিনে উন্নীত করা হচ্ছে। অর্থাৎ নতুন বাবা-মায়েরা সর্বোচ্চ ২৬ সপ্তাহ পর্যন্ত এই সুবিধা পাবেন। একই সঙ্গে সঙ্গীর জন্য সংরক্ষিত ছুটির পরিমাণও বৃদ্ধি পাচ্ছে। ১ জুলাই বা এর পর জন্ম নেওয়া কিংবা দত্তক নেওয়া শিশুদের ক্ষেত্রে নতুন নিয়ম কার্যকর হবে। সরকারের ভাষ্য, এটি পরিবারকে সন্তান জন্মের পর অধিক সময় একসঙ্গে থাকার সুযোগ করে দেবে এবং কর্মজীবী অভিভাবকদের আর্থিক চাপ কমাতে সহায়তা করবে।

মোবাইল ফোনে প্রতারণামূলক খুদে বার্তার বিস্তার ঠেকাতে চালু হচ্ছে প্রেরক পরিচয় নিবন্ধন ব্যবস্থা। এর আওতায় নিবন্ধিত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো অনুমোদিত নাম ব্যবহার করে গ্রাহকদের কাছে বার্তা পাঠাতে পারবে। নিবন্ধনবিহীন প্রেরকদের পাঠানো বার্তা ‘অযাচাইকৃত’ হিসেবে প্রদর্শিত হবে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকারি সংস্থা, ডাকসেবা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে প্রতারণার ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় এ ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে। এতে সাধারণ মোবাইল ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা আরো জোরদার হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ব্যবসা খাতেও কয়েকটি পরিবর্তন কার্যকর হচ্ছে। ব্যবসা নিবন্ধন, নবায়ন এবং কোম্পানির বার্ষিক পর্যালোচনাসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক ফি বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে নতুন কম্পানি নিবন্ধন এবং ব্যবসা পরিচালনার কিছু খরচ বাড়বে। তবে অন্যদিকে ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলোর জন্য তাৎক্ষণিক সম্পদ ব্যয় করছাড় সুবিধা অব্যাহত রাখা হয়েছে। নির্ধারিত সীমার মধ্যে যোগ্য সম্পদের খরচ তাৎক্ষণিকভাবে কর ছাড় হিসেবে দাবি করা যাবে, যা নতুন বিনিয়োগে উৎসাহ জোগাতে পারে।

কর ব্যবস্থায়ও পরিবর্তনের পরিকল্পনা রয়েছে। ফেডারেল সরকারের ঘোষিত আয়কর সংস্কার কর্মসূচির আওতায় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের করদাতাদের জন্য ধাপে ধাপে করহার কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে আগামী বছরগুলোতে বহু কর্মজীবী মানুষ অতিরিক্ত কর সাশ্রয়ের সুযোগ পেতে পারেন। পাশাপাশি কর্মসংক্রান্ত কিছু ব্যয়ের ক্ষেত্রে সহজ করছাড় সুবিধা চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।

খাদ্য নিরাপত্তা ও ভোক্তা অধিকার সুরক্ষার অংশ হিসেবে রেস্তোরাঁ, ক্যাফে, খাবার বিক্রয়কেন্দ্র ও বহনযোগ্য খাদ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সামুদ্রিক খাদ্যের উৎস স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। খাদ্যটি অস্ট্রেলিয়ান, আমদানিকৃত নাকি মিশ্র উৎসের সেই তথ্য গ্রাহকদের জানানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এতে ক্রেতারা আরো সচেতনভাবে খাদ্য নির্বাচন করতে পারবেন। এ ছাড়া ভোক্তা সুরক্ষা জোরদারে জ্বালানি খাতেও কিছু পরিবর্তন আনা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে বিদ্যুৎ গ্রাহকদের জন্য সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণ সংক্রান্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা আরো শক্তিশালী করা হচ্ছে, যাতে আর্থিক সংকটে থাকা পরিবারগুলো অতিরিক্ত সহায়তা পেতে পারে।

নতুন অর্থবছরের এসব পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় সুফল পাবেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের কর্মী, নতুন বাবা-মা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং সাধারণ ভোক্তারা। মজুরি বৃদ্ধির ফলে কর্মীদের আয় বাড়বে, পিতা-মাতার বেতনসহ ছুটি সম্প্রসারণ পরিবারকে বাড়তি সহায়তা দেবে এবং প্রতারণামূলক বার্তা নিয়ন্ত্রণে মোবাইল ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা আরো জোরদার হবে। ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলো কর-সুবিধার মাধ্যমে নতুন বিনিয়োগে উৎসাহ পেলেও ব্যবসা নিবন্ধন ও পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে কিছু প্রতিষ্ঠানের খরচ বাড়তে পারে। তবে সার্বিকভাবে জীবনযাত্রার ব্যয় ও অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে কর্মী, পরিবার ও ভোক্তাদের আর্থিক সুরক্ষা জোরদার করাই নতুন অর্থবছরের এসব পরিবর্তনের প্রধান লক্ষ্য বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

LEAVE A REPLY