ছবি : রয়টার্স
স্পেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফার্নান্দো গ্রান্দে-মার্লাস্কা বলেছেন, দেশজুড়ে চলমান দাবানল নিয়ন্ত্রণে আগামী দুই দিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাপমাত্রা আরো বেড়ে যাওয়ার আগে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে বলে তিনি সতর্ক করেছেন।
সোমবার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আজ ও আগামীকাল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বুধবার থেকে আবহাওয়া এমন হবে, যা আগুন নেভানোর কাজকে আরো কঠিন করে তুলবে।’ দাবানলের কারণে ইতিমধ্যে হাজার হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে দমকলকর্মী ও জরুরি সেবা সংস্থাগুলো জোরালো অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে আগামী কয়েক দিনে দাবানল আরো ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সতর্কতা জোরদার করা হয়েছে।
ফ্রান্স ও স্পেনে ছড়িয়ে পড়া ভয়াবহ দাবানল নিয়ন্ত্রণে সোমবারও দমকলকর্মীরা প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এদিকে, নতুন তাপপ্রবাহের আশঙ্কায় পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারে বলে সতর্ক করেছে কর্তৃপক্ষ।
দাবানলের কারণে দুই দেশে এখন পর্যন্ত ৩ লাখ ২৫ হাজারের বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বেশিরভাগই ফ্রান্সের বোর্দো শহরের কাছের জিরোন্দ অঞ্চলের বাসিন্দা। স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদের কাছাকাছি এলাকাতেও আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে।
ফ্রান্সের ন্যাশনাল ফায়ারফাইটার্স ফেডারেশন জানিয়েছে, এই দাবানল থেকে বিরল ‘পাইরোকিউমুলোনিম্বাস’ অগ্নি-মেঘ তৈরি হয়েছে। এই ধরনের মেঘ নিজেই শক্তিশালী বাতাস ও বজ্রপাত সৃষ্টি করতে পারে, যা নতুন করে আগুন ছড়িয়ে দিতে পারে।
সংস্থাটির মুখপাত্র এরিক ব্রোকার্ডি বলেন, পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন। তবে দমকলকর্মীরা আগুনের দুর্বল অংশ খুঁজে নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছেন। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাখোঁ দাবানল পরিস্থিতি নিয়ে জরুরি মন্ত্রিসভার বৈঠক ডেকেছেন।
অন্যদিকে, স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ দাবানল-কবলিত ভ্যালেন্সিয়া অঞ্চল পরিদর্শন করছেন। সেখানে নতুন করে আগুন ছড়িয়ে পড়ায় আরো ১৫ হাজার মানুষকে বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ স্থানে যেতে হয়েছে।
স্পেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফার্নান্দো গ্রান্দে-মার্লাস্কা বলেছেন, আগুন ধীরে ধীরে এগোলেও সামনে পরিস্থিতি আরো কঠিন হতে পারে। আভিলা প্রদেশে আগুনের বিস্তারকে দেশটির বেসামরিক সুরক্ষা বিভাগের প্রধান ভার্জিনিয়া বারকোনেস ‘একটি দানবের বিরুদ্ধে লড়াই’ বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি জানান, সেখানে প্রায় ৭৭ হাজার হেক্টর এলাকাজুড়ে আগুন ছড়িয়ে পড়েছে।
বিজ্ঞানীদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এমন তীব্র দাবানল ও চরম আবহাওয়ার ঘটনা আগের তুলনায় বেশি ঘটছে। দীর্ঘ তাপপ্রবাহ, বৃষ্টির অভাব এবং শুকিয়ে যাওয়া বনভূমি আগুনকে আরো ভয়াবহ করে তুলেছে। ফ্রান্সের জিরোন্দ অঞ্চলে পর্যটকদের ওই এলাকা এড়িয়ে অন্যত্র যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সেখানে প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং ৪৫টি ক্যাম্পসাইট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, যার ফলে প্রায় ৪০ হাজার মানুষের ছুটির পরিকল্পনা বাতিল হয়েছে।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষ স্কাউটদের রাত্রিযাপন কর্মসূচি ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য আয়োজিত ছুটির ক্যাম্পও বন্ধ ঘোষণা করেছে। জিরোন্দের বাসিন্দা জর্জেস ক্লিভাজ জানান, আগুন থেকে বাড়ি রক্ষার জন্য তিনি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বাগানের পাইপ দিয়ে বাড়ির চারপাশে পানি ছিটাচ্ছেন।
তবে দমকলকর্মীরা সতর্ক করেছেন, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আগুন তাদের এলাকায় পৌঁছে যেতে পারে। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেস বলেছেন, সারা দেশে পরিস্থিতি এখনও অত্যন্ত প্রতিকূল। তবে জিরোন্দের স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সোমবার ভোর পর্যন্ত আগুন মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল।
ফ্রান্সের দাবানলে আহত ৮৪ দমকলকর্মী, নতুন তাপপ্রবাহের সতর্কতা
ফ্রান্সের জিরোন্দ অঞ্চলের ভয়াবহ দাবানলে এখন পর্যন্ত ৮৪ জন দমকলকর্মী আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১০ জনকে চিকিৎসার জন্য নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ফ্রান্সের সিএফডিটি ইউনিয়নের ফেডারেল সেক্রেটারি সেবাস্তিয়েন বুভিয়ের অভিযোগ করেছেন, আগুনের বিষাক্ত ধোঁয়া থেকে সুরক্ষার জন্য দমকলকর্মীদের কাছে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জাম নেই।
আবহাওয়াবিদরা সতর্ক করেছেন, মঙ্গলবার থেকে ফ্রান্সে নতুন তাপপ্রবাহ শুরু হতে পারে। এতে কিছু এলাকায় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠতে পারে, যা আগুন নিয়ন্ত্রণের কাজ আরো কঠিন করে তুলবে। জিরোন্দ অঞ্চলে দাবানলে অন্তত ২৪০টি বাড়ি পুড়ে গেছে। এর বেশিরভাগই লে পোর্জ গ্রামে।
তবে বোর্দোর মেয়র থমাস ক্যাজেনভ বলেছেন, ৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষের শহর বোর্দো খালি করার কোনো পরিকল্পনা নেই। যদিও শহরটিতে আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হাজার হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন, তবু পরিস্থিতির ওপর কর্তৃপক্ষ সতর্ক নজর রাখছে।
বুধবার থেকে শুরু হওয়া দাবানলে জিরোন্দ অঞ্চলের প্রায় ৪২ হাজার হেক্টর বন ও জমি পুড়ে গেছে। ফ্রান্সের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বোর্দোর কাছে দেশের গুরুত্বপূর্ণ মহাকাশ শিল্প এলাকা রক্ষায় বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এদিকে, বোর্দোর দক্ষিণের প্রধান মহাসড়ক ও রেল যোগাযোগ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। দাবানল নিয়ন্ত্রণে জিরোন্দ অঞ্চলে প্রায় দুই হাজার ৫০০ দমকলকর্মী, এক হাজার ৫০০ সেনাসদস্য এবং এক হাজার ২০০ পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
স্পেনে দাবানলে ‘অকল্পনীয়’ ক্ষতি, হাজারো মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে
স্পেনের রাজা ষষ্ঠ ফিলিপ বলেছেন, দেশের ভয়াবহ দাবানলে প্রাকৃতিক পরিবেশের অকল্পনীয় ক্ষতি হয়েছে। মাদ্রিদের পশ্চিমে ভিলামান্তা এলাকার একটি আশ্রয়কেন্দ্র পরিদর্শনের সময় তিনি এ মন্তব্য করেন। দাবানলের কারণে মাদ্রিদ অঞ্চল, আভিলা, টোলেডো এবং পূর্বাঞ্চলের কাস্তেলোন থেকে প্রায় ৭৫ হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
ভিলামান্তার একটি জিমনেসিয়ামকে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত করা হয়েছে। সেখানে আশ্রয় নেওয়া আজুসেনা পাগুয়াদা বলেন, ‘আমরা খুব ভয় পেয়েছিলাম। গার্ডিয়া সিভিল আমাদের বাড়িতে এসে দ্রুত এলাকা ছেড়ে যেতে বলে।’
৭০ বছর বয়সী আরেক আশ্রয়প্রার্থী মার্গারিটা জানান, তিনি চার দিন ধরে একই পোশাক পরে আছেন। তিনি বলেন, ‘রানি আমাদের দেখতে এসেছিলেন, আর আমি এই নোংরা পোশাকই পরে ছিলাম।’
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বাতাসের কারণে মাদ্রিদের কাছের আগুন আপাতত রাজধানী থেকে দক্ষিণ দিকে সরে যাচ্ছে। তবে আগুনের পথের গ্রামগুলো থেকে আরো মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে ভ্যালেন্সিয়া অঞ্চলে নতুন দাবানল খুবই তীব্র আকার ধারণ করেছে বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধি পিলার বার্নাবে। ভ্যালেন্সিয়ার কাছে আরেকটি ছোট দাবানলে শনিবার একজন বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে। এটি স্পেনে চলমান দাবানলে প্রথম বেসামরিক মৃত্যুর ঘটনা। অন্যদিকে, ফ্রান্সের বোর্দোর কাছে আগুন নেভানোর সময় মঙ্গলবার দুই দমকলকর্মী নিহত হন।
রবিবারের প্রার্থনায় পোপ লিও চতুর্থ স্পেন ও ফ্রান্সের দাবানলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ ও উদ্ধারকর্মীদের জন্য প্রার্থনা করার আহ্বান জানান। এদিকে ইতালিও দাবানলের সঙ্গে লড়াই করছে।
দেশটির উপকূলরক্ষী বাহিনী জানিয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলের পুগলিয়া অঞ্চলের পেশিচি শহরের কাছে সমুদ্রপথে ৪০০ জনের বেশি পর্যটক ও সৈকত ভ্রমণকারীকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। আরো প্রায় ৩০০ জনকে উদ্ধার করার প্রস্তুতি চলছে।










































