ফকল্যান্ড যুদ্ধ এবং ‘হ্যান্ড অব গড’

বিশ্বকাপ আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ডকে কোন মোড়ে এনে দাঁড় করিয়ে দিল? এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে যে ফুটবলীয় বৈরিতা চলে আসছে এ দুদেশের মধ্যে, সেই ঝাঁজালো প্রতিদ্বন্দ্বিতা আবার দেখবে ফুটবলবিশ্ব। লিওনেল মেসি সমাপ্তিরেখায় পৌঁছে যাওয়া তার ক্যারিয়ারে এই প্রথম খেলবেন ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। আর ইংল্যান্ড? দীর্ঘ ৬০ বছর ধরে যে ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে তারা, তার প্রতিষেধক খোঁজার আশায় আটলান্টায় ঝাঁপাবে।

১৯৬২ বিশ্বকাপে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার শুরু। এরপর ইউরোপ ও লাতিন ফুটবলের দুই পরাশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখেছে সুন্দর নিষ্ঠুর ফুটবল, নান্দনিক গোল, লাল কার্ড এবং অতিঅবশ্যই ‘হ্যান্ড অব গড’। এই দ্বৈরথ শুধু সবুজ গালিচায় আটকে থাকেনি। দুদেশের মধ্যে রাজনৈতিক বৈরিতা, বিশেষ করে আশির দশকে ফকল্যান্ড যুদ্ধ নিয়ে স্নায়ুক্ষয়ী উত্তেজনা আজও আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের মানুষ ভুলতে পারেনি। ফুটবলেও সেই ভূরাজনীতি উত্তেজনা ছায়া ফেলে। ২০০২ বিশ্বকাপের গ্রুপপর্বে শেষবার মুখোমুখি হয়েছিল এই দুদল। ওই ম্যাচে ইংল্যান্ড জিতেছিল ৩-১ গোলে। ২৪ বছর পর আবার বিশ্বকাপে দেখা হচ্ছে ববি চার্লটন ও দিয়েগো ম্যারাডোনার দেশের।

আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড দুই চিরবৈরী দেশের ফুটবল দ্বৈরথের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন ১৯৮৬ বিশ্বকাপের কখনো না-ভোলা সেই কোয়ার্টার ফাইনাল। যে ম্যাচটি ফুটবল ইতিহাসে চিরসবুজ হয়ে রয়েছে ‘হ্যান্ড অব গড’ এর সৌজন্যে। ফকল্যান্ড যুদ্ধে দুদেশ শক্তি ক্ষয় করার চার বছর পর ’৮৬ বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালে আরেক যুদ্ধে তাদের দেখা। ফুটবল মাঠেও বারুদের গন্ধ। রাজনৈতিক উত্তেজনা। যেন ১০ সপ্তাহের অঘোষিত ফকল্যান্ড যুদ্ধ ফিরে আসে ৯০ মিনিটের ফুটবলযুদ্ধে। মেক্সিকোর বিখ্যাত আজতেকা স্টেডিয়াম তখন রণক্ষেত্র! সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আক্ষরিক অর্থেই যুদ্ধের ছায়া পড়েছিল।

এরপর দুটি চিরস্মরণীয় মুহূর্ত। প্রথমটি, ম্যারাডোনার হাতে করা গোল। আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর লাফিয়ে উঠে হাত দিয়ে গোল করলেন। ইংল্যান্ডের গোলরক্ষক পিটার শিলটন বুঝতেই পারলেন না। রেফারিরও দৃষ্টি এড়িয়ে যায় অবিশ্বাস্যভাবে। পরে ম্যারাডোনার ক্লাসিক উক্তিও ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বময়, যখন তিনি বলেন, ‘ওটা আমার হাত ছিল না। ছিল ঈশ্বরের হাত।’

সেটা যদি হয় ম্যারাডোনার ‘পাপ’, তাহলে তার দ্বিতীয় গোল ‘প্রায়শ্চিত্ত’। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বকালের সম্ভবত সেরা গোল উপহার দেন তিনি অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতায় এবং নান্দনিক সৌকর্যে। যে গোল ইতিহাসে ঠাঁই করে নিয়েছে তার অনুপম সৌন্দর্যের সৌজন্যে। প্রায় মাঝমাঠ থেকে ইংল্যান্ডের অর্ধেক দলকে ড্রিবল করে নাচিয়ে ছেড়ে ম্যারাডোনা শিলটনকে বোকা বানিয়ে বল জালে পাঠিয়ে তাক লাগিয়ে দেন ফুটবলবিশ্বকে। আর্জেন্টিনা লিড নেয় ২-০ গোলে। ওই ম্যাচ ২-১ গোলে হেরে ইংল্যান্ড বিদায় নেয় বিশ্বকাপ থেকে। সেজন্য তারা কোনোদিন ক্ষমা করতে পারেনি আর্জেন্টাইন ফুটবলের বরপুত্রকে। পরে ইংল্যান্ডের ক্ষতে লবণ দিয়ে আর্জেন্টিনা ’৮৬ বিশ্বকাপ জিতেছিল ফাইনালে পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে।

২০০৫ সালে ম্যারাডোনা হাত দিয়ে গোল করার জন্য ক্ষমা চেয়েছিলেন শিলটনের কাছে। ইংল্যান্ডের গোলরক্ষক ম্যারাডোনাকে ক্ষমা করেননি।

LEAVE A REPLY