ইসরায়েলি কারাগারে নিপীড়নের ভয়াবহ তথ্য জানালেন জার্মান অধিকারকর্মী

সংগৃহীত ছবি

ফিলিস্তিনের যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা উপত্যকায় মানবিক সহায়তা নিয়ে যাওয়া ত্রাণবাহী নৌবহরের (ফ্লোটিলা) সদস্য ও ফিলিস্তিনপন্থী জার্মান অধিকারকর্মী অ্যানা লিডকে। আন্তর্জাতিক জলসীমা থেকে আটকের পর ইসরায়েলি কারাগারে থাকার সময় তিনি ভয়াবহ যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণের শিকার হয়েছেন।বিষয়টি প্রকাশ্যে আশার পর তিনি এর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে একটি ফৌজদারি অভিযোগও দায়ের করেছেন।

লিডকের বিভিন্ন সাক্ষাৎকার ও ইসরায়েলে করা একটি ফৌজদারি অভিযোগ থেকে জানা গেছে, বন্দিশালায় তৃতীয়বারের মতো বেআইনিভাবে শরীর তল্লাশির সময় কারারক্ষীরা তাকে জোর করে হাঁটু গেড়ে বসতে বাধ্য করেন। চিৎকার বন্ধ করতে তারা লিডকের মুখ চেপে ধরেন এবং তাকে ধর্ষণ করেন।

ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে লিডকে বলেন, নির্যাতনের সময় তিনি পুরুষ রক্ষীদের হাসির শব্দ শুনেছিলেন।

তার ধারণা, পুরুষ রক্ষীরা তার ওপর চলা এ নির্যাতন দেখছিলেন এবং সম্ভবত ভিডিও ধারণ করছিলেন। কারাগারের বারান্দা থেকে আংশিক টানা একটি পর্দা দিয়ে জায়গাটি আলাদা করা ছিল। পর্দাটি খোলাই রেখেছিলেন ইসরায়েলি কারারক্ষীরা।

২৫ বছর বয়সী লিডকে গত বছরের শরতে ইউরোপ থেকে গাজাগামী মানবিক সহায়তাবাহী নৌবহরে (ফ্লোটিলা) যোগ দেন।৮ অক্টোবর আন্তর্জাতিক জলসীমা থেকে তাদের নৌকাটি আটক করে ইসরায়েলি বাহিনী। এরপর তাকে ইসরায়েলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাকে ৫ দিন আটক রাখা হয়।

ইসরায়েলি কারাগারে ফ্লোটিলার কর্মীদের ওপর ধর্ষণসহ বিভিন্ন নির্যাতন ও সহিংসতা চালানো হয়েছে। এর কারণ হিসেবে ভুক্তভোগী ওই নরী বলেন, ‘এটি স্পষ্ট যে তারা আমাদের মনোবল ভেঙে দিতে চায় এবং আমাদের চুপ করাতে চায়।তারা আমাদের এমন এক ট্রমার মধ্যে ফেলতে চায়, যাতে আমরা আর কখনো ফিলিস্তিন নিয়ে কথা না বলি।’

কিন্তু গত ডিসেম্বরে তিনি প্রথম ফ্লোটিলা কর্মী হিসেবে ইসরায়েলি হেফাজতে ধর্ষণের শিকার হওয়ার কথা প্রকাশ্যে বলেন। একই সঙ্গে আরও এক ডজনের বেশি কর্মী যৌন নিপীড়নের অভিযোগ করেছেন, যাদের বেশির ভাগই নাম প্রকাশ করেননি।

লিডকের অভিযোগগুলো তদন্ত করার জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে একটি মামলা দায়ের করেছেন তার আইনজীবীরা। ইসরায়েলি আইন অনুযায়ী, সম্মতি ছাড়া যেকোনো ধরনের যৌন নিপীড়নকে ধর্ষণ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। আইনি লড়াই শুরু করার পর দেয়া প্রথম সাক্ষাৎকারে লিডকে বলেন, ‘আমার লজ্জা পাওয়ার কোনো কারণ নেই। আমরা চুপ থাকলে তারা অন্য কারও সঙ্গেও একই কাজ করবে।’

অভিযোগপত্রটি ইসরায়েলের অ্যাটর্নি জেনারেল, ইসরায়েল কারা কর্তৃপক্ষের আইনি উপদেষ্টা, কারারক্ষী তদন্ত বিভাগ (ইয়াহাস) এবং গিভন কারাগারের কমান্ডারের কাছে পাঠানো হয়েছে। 

এ বিষয়ে লিডকের আইনজীবী মুনা হাদ্দাদ বলেন, এই পদক্ষেপের লক্ষ্য হলো ইসরায়েলে বন্দি নির্যাতনের ক্ষেত্রে যে ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি’ রয়েছে, সেটাকে চ্যালেঞ্জ করা।

ইসরায়েলে কর্মরত ফিলিস্তিনি মানবাধিকার সংস্থা ‘আদালাহ’-এর আইনজীবী হাদ্দাদ বলেন, ‘অ্যানা লিডকে ন্যায়বিচার চান। অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে তিনি সব পথ ব্যবহার করতে চান। আমরা জনসচেতনতা বাড়াতে এবং তদন্তের দাবিতে ইসরায়েলি ব্যবস্থা কীভাবে সাড়া দেয় তা পর্যবেক্ষণ করতে চাই।’

ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান নির্যাতনের কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘প্রায় তিন বছর ধরে ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর ক্রমাগতভাবে যৌন সহিংসতা ও ধর্ষণের মতো অপরাধ চালানো হচ্ছে। এখন আমরা এর মাত্রা আরও বাড়তে দেখছি। ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানানো বিদেশি নাগরিকদের ওপরও একই আচরণ করছে ইসরায়েল।’

লিডকে বলেন, ‘আমি মনে করি না, মুখ খুললেই কারাগারে ধর্ষণ বন্ধ হয়ে যাবে। তবে একজন রাজনৈতিক সচেতন নারী হিসেবে আমি এ বিষয়ে কথা বলা দায়িত্ব মনে করি।’

এর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে চাই উল্লেখ তিনি আরও বলেন, ‘আমি জোর দিয়ে বলতে পারি, ফিলিস্তিনি বন্দিরা যে ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হন, আমার ওপর হওয়া নির্যাতন তার চেয়ে অনেক কম।’

LEAVE A REPLY