শুধু থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম বা ভারতের কেরালা রাজ্যেই নয়, বাংলাদেশেও রয়েছে প্রায় এক কিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত ‘ভাসমান বাজার’। দুইশ বছরের পুরোনো দেশের বৃহত্তম এই ভাসমান বাজারটি পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার বৈঠাকাটায় বেলুয়া নদীর মোহনায় অবস্থিত। ছোট ছোট নৌকায় করে আসা প্রান্তিক চাষিরা তাদের পণ্য নিয়ে যান পাইকারদের ট্রলারের কাছে। দরদামে বনলেই হয় পণ্য হাতবদল। পণ্য ওঠে ছোট নৌকা থেকে পাইকারের বড় ট্রলারে। এখানে একেকটি নৌকা বা ট্রলারই একেকটি দোকান। এখানে মূলত কৃষিপণ্য বেচাকেনা হয়। সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশে গড়ে ওঠা পুরো বাজারটি বেলুয়া নদীর বুকে পানির ওপর ভাসছে।
সপ্তাহে দুদিন শুক্র ও সোমবার এই বাজার বসে। ভোরের আলো ফোটার আগেই সকাল ৫টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত চলে এ বাজারের মূল বেচাকেনা। কখনো কখনো চাল, ডাল, ধান, সুপারি, গাছের চারা, শাক-সবজিসহ অন্যান্য মালামাল পাইকারি বেচাকেনা চলে বিকাল ৪টা পর্যন্ত। প্রতিদিন কয়েক কোটি টাকার লেনদেন চলে এ বাজারে। ভোরেই পণ্য নিয়ে ছোট-বড় নানা ধরনের ডিঙি নৌকায় করে চলে আসেন ক্রেতা-বিক্রেতারা। কেউ আসেন উৎপাদিত পণ্য বিক্রির জন্য, আবার কেউ আসেন কেনার জন্য। এখানে ব্যবসায়ীদের সুবিধার্থে খাবারের জন্য নৌকায় ভ্রাম্যমাণ হোটেলও রয়েছে।
বেলুয়া নদী বা বৈঠাকাটার আশপাশের কলারদোয়ানীয়া, মুগারঝোর, পদ্মডুবি, মনোহরপুর, বিল ডুমুরিয়া, সোনাপুর, গাওখালী, কলাখালি, মধুভাংগা, পাকুরিয়া, দেউলবাড়ী, দোবরা ও চাঁদকাঠীসহ ২০ থেকে ২৫টি অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা কেনাবেচা করতে আসেন এখানে। নদীতে অবস্থান এবং খাজনা কম থাকায় পাইকাররা ভিড় করেন এ বাজারে। বড় বড় ট্রলারে করে পণ্য কিনে নিয়ে যান দেশের বিভিন্ন স্থানে। অন্যান্য বাজারের মতো দর কাষাকষি করে চলে কেনাবেচা। যেখানে কৃষকরা তাদের উৎপাদিত সবজি নিয়ে আসেন এবং পাইকাররা তা কিনে সারা দেশে ও বিদেশে (মধ্যপ্রাচ্য) পাঠান।
প্রাচীনকাল থেকে এ অঞ্চলে কোনো রাস্তাঘাট না থাকায় স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রয়োজনে অন্তত ২শ বছর আগে বৈঠাকাটা খালে ভাসমান বাজারের শুরু হয়। স্বাধীনতার পর বাজারের পরিধি বাড়তে থাকলে মূল বাজারটি বর্তমান স্থানে চলে আসে। নদী-খালবেষ্টিত নাজিরপুর উপজেলার কৃষিজ পণ্য বিক্রয় এবং এলাকার মানুষের দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতে নদীপথে যোগাযোগের সুবিধাকে পুঁজি করে এ বাজারের উদ্ভব বলে জানান কৃষি বিশ্লেষকরা।
এই এলাকায় কৃষিপণ্যের মধ্যে শাকসবজির চাষাবাদ বেশি হয়। এসব কৃষিপণ্য এই ভাসমান হাটের মাধ্যমে চলে যায় রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে। খেত থেকে তুলে নৌকায় সাজিয়ে সরাসরি এ বাজারে বিক্রির জন্য নিয়ে আসার কারণে পণ্য থাকে তরতাজা। ধান, চাল, শাক-সবজি, নারিকেল, সুপারি, বিভিন্ন ধরনের সবজির চারা পাওয়া যায় এখানে। এছাড়াও ফুল-ফলের চারা, ধানের চারা, গাছের চারা তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যায়। চা, পান, সিঙাড়া-পুরি, পেঁয়াজুসহ নানা মুখরোচক খাবারও মেলে এই হাটে। এখানে পানিতে জন্মানো কচুরিপানা এবং শেওলা বিক্রি হয়। চারা তৈরিতে ব্যবহৃত এই জলজ আগাছা কৃষকরা কিনে নেন পাইকারি দামে।
এ বাজারে সাধারণত পিরোজপুর, ঝালকাঠী, বরিশাল ও গোপালগঞ্জ জেলার মানুষ তাদের পণ্য কেনা-বেচা করেন। শীতকালে বাজারের ব্যপ্তি থাকে সবচেয়ে বেশি। তরমুজের মৌসুমেও বড় হাট বসে এখানে। এক সময় ঢাকা-বৈঠাকাটা রুটে বড় বড় লঞ্চ চলাচল করায় রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে লঞ্চে পণ্য পরিবহণ করা হতো। পদ্মা সেতু হওয়ার পর নৌ-রুটটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পাইকারদের খরচ বেড়ে গেছে। ভাসমান এ বাজারের কাছাকাছি ভালো কোনো সড়ক যোগাযোগ না থাকায় পণ্য পরিবহণে সময় ও খরচ দুটোই বেশি।
উপজেলা ও জেলা শহরের সঙ্গে সড়ক পথ তৈরি হওয়ায় বৈঠাকাটা বাজার সংলগ্ন খাল এবং বেলুয়া নদীর ওপর সেতু নির্মাণ এলাকাবাসীর প্রাণের দাবি। বাজারের ইজারাদার উত্তর কলারদোয়ানীয়ার বাসিন্দা মহিউদ্দিন বাহাদুর বলেন, বেলুয়া নদীর কয়েকটি স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। তাই এখানে জিও ব্যাগ ও পাইলিং দেওয়া জরুরি। একমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম রাস্তাটি দীর্ঘদিন ধরে চলাচলের অযোগ্য হওয়ায় রাস্তাটি প্রশস্ত করে দ্রুত সংস্কারের দাবি করেছেন কৃষক হালিম হোসেন। কৃষক ফারুক মোল্লা বলেন, নদীবেষ্টিত প্রত্যন্ত অঞ্চলে দেশের বৃহত্তম ভাসমান বাজারে দুর্ঘটনায় ঘটলে কোনো উদ্ধার ব্যবস্থা নেই। তাই এখানে একটি ফায়ার সার্ভিসের সাবস্টেশন করার দাবি এলাকাবাসীর।










































