অর্থসংকট সত্ত্বেও সরকার একনেকে বড় বড় প্রকল্পের অনুমোদন দিচ্ছে। সরকার কৃচ্ছ্রসাধনের ঘোষণা দিলেও এরই মধ্যে নতুন মন্ত্রীদের জন্য গাড়ি কেনার প্রস্তাব এনেছে। বিভিন্ন বাহিনীর জন্যও গাড়ি কেনার আয়োজন চলছে। এদিকে নতুন পে-কমিশনও তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।
সবমিলিয়ে এসব কর্মকাণ্ডকে বিশেষজ্ঞরা অর্থসংকটের মধ্যেও বিলাসী কর্মকাণ্ড হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। মেয়াদের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত চরম অর্থসংকটের মধ্যেই রয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। এর ফলে বাজেটের আকার ছোট করে আনা হয়। এরপর গত মাসে ছোট আকারকে আরো ছোট করে সংশোধিত বাজেট (২০২৫-২৬) চূড়ান্ত করা হয়েছে, যা আসছে ফেব্রুয়ারির শুরুতে কার্যকর হবে।
এদিকে অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪৬ হাজার কোটি টাকা।
শুধু তাই নয়, সরকারের বাজেট বাস্তবায়নও গতিহারা হয়ে পড়েছে। তবুও বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন করেই যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার। গত সপ্তাহেও ৪৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের ২৫টি প্রকল্পে অনুমোদন দিয়েছে একনেক।আবার সংকটের মধ্যেই সরকারি চাকরিজীবীদের খুশি করতে নতুন পে-স্কেল গঠন করা হয়। সেই কমিশন চূড়ান্ত প্রতিবেদনও জমা দিয়েছে। যদিও পরবর্তী সময় এই পে-স্কেল বাস্ততায়ন থেকে পিছিয়ে গেছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের শুরু থেকেই চরম অর্থসংকটে পড়ে ড. ইউনূসের সরকার। প্রায় দেড় বছর চেষ্টার পরও সেই সংকট কাটানো সম্ভব হয়নি।
বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে সংকট আরো বেড়েছে। তবে আর্থিক খাতের অস্থিরতা অনেকটা কমেছে। মেয়াদের শেষপ্রান্তে এসে জমে উঠেছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এরই মধ্যে নির্বাচনী ব্যয়ও বেড়েছে। নিরাপত্তা ইস্যুতে এই ব্যয় ৩ হাজার কোটি টাকাও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের মধ্যে সংস্কারসুলভ মনোভাব এবং কমিটমেন্ট ছিল। কিন্তু সেই কমিটমেন্ট শেষ পর্যন্ত অনেকাংশেই বাস্তবায়ন করতে পারেনি। ফলে শেষ মুহূর্তে এসে নানা রকম বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি ব্যাংক খাত সংস্কার, অযাচিত সরকারি ব্যয় কমিয়ে আনা, এনবিআরকে বিভক্ত করা, ব্যাংক মার্জারসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও কোনোটাই শতভাগ বাস্তবায়ন করতে পারেনি। যা দেশের চলমান অর্থসংকটকে আরো ঘনীভূত করেছে। অথচ একদিকে ব্যয় সংকোচনের কথা বলা হয়েছে এবং এর জন্য আগের সরকারের নেওয়া অনেক মেগা প্রকল্প বাতিল করা হয়েছে। কিন্তু ড. ইউনূস সরকার মেয়াদের পুরো সময়ে বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পে অনুমোদন দিয়েছে। গত সপ্তাহে তো সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য ৯ হাজার স্কয়ার ফিট বিশাল আকারের ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে একনেক সভা। যা অতীতের তুলনায় নজিরবিহীন। সরকারি আমলাদের জন্য এত বড় বড় ফ্ল্যাট শেখ হাসিনাও তার শাসনামলের ১৬ বছরে কখনো দেননি। এ নিয়ে অনেকেই সমালোচনা ও তির্যক মন্তব্য করছেন।
শুধু তাই নয়, টানা চার বছরের বেশি সময় ধরে মূল্যস্ফীতির চাপ ৯ শতাংশের ওপরে বিরাজ করছে। এই চাপকে কোনোভাবেই কমাতে পারছে না সরকার। অবশ্য আগের সরকারও সেটা পারেনি। এই চাপের মধ্যেই এমন বৈরী সময়ে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে-স্কেল ঘোষণা করে সরকার মোটেই দূরদর্শিতার পরিচয় দেয়নি বলে মনে করেন বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন।
তিনি বলেন, ‘এটা এসময় না করলেও চলত। বরং নির্বাচিত সরকার এসে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারত।’ এখন একদিকে এই পে-স্কেল বাস্তবায়নের চাপ, অন্যদিকে আর্থিক সংকট। ফলে সরকার উভয় সংকটে পড়েছে বলে তিনি মনে করেন। বিশ্লেষকদের মধ্যে চরম রাজস্ব সংকট, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ এবং উন্নয়ন ব্যয়ের কাটছাঁট সত্ত্বেও অন্তর্বর্তী সরকার এমন বেশ কয়েকটি উদ্যোগ গ্রহণ করেছে যেগুলো অর্থনীতিবিদদের ভাষায় ‘বিলাসী উদ্যোগ এবং অগ্রাধিকারের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।’ সরকারের সাম্প্রতিক ঘোষণাপত্র ও ব্যয়ের ধারাবাহিকতা বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, প্রয়োজনীয় খাতে বরাদ্দ কমিয়েও অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প, নতুন দপ্তর গঠন এবং উচ্চমূল্যের নতুন নতুন প্রকল্প অনুমোদনের উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন হয়েছে ১৭ দশমিক ৫৪ শতাংশ; যা আগের অর্থবছরের তুলনায় কম। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।
এতে বলা হয়, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এডিপিতে বরাদ্দ ছিল ২ লাখ ৩৮ হাজার ৬৯৫ কোটি টাকা। তবে সম্প্রতি ৩০ হাজার কোটি টাকা কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে জুলাই-ডিসেম্বর মাসে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো ব্যয় করতে পেরেছে মাত্র ৪১ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা। যা মোট এডিপি বরাদ্দের ১৭ দশমিক ৫৪ শতাংশ।
আইএমইডির ওয়েবসাইট বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত অর্থবছরের (২০২৪-২৫) একই সময়ে ব্যয় হয়েছিল ৫০ হাজার ২ কোটি টাকা। যা মোট এডিপি বরাদ্দের ১৭ দশমিক ৯৭ শতাংশ। তবুও সাম্প্রতিক সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার রাজধানীতে নতুন প্রশাসনিক কমপ্লেক্স, উচ্চমূল্যের যানবাহন ক্রয়, ভিআইপি আবাসন সংস্কার এবং বিদেশ ভ্রমণ কোটা পুনঃ খোলার উদ্যোগ নিয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রাজনৈতিক ট্রানজিশনের সময়ে সরকারের ব্যয় সংকোচনই হওয়া উচিত ছিল অগ্রাধিকার। কিন্তু বাস্তবচিত্র হলো যেখানে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি ও স্থানীয় অবকাঠামো বরাদ্দ সংকুচিত; সেখানে অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের চাপ বাড়ানো অর্থনীতিকে আরও দুর্বল অবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন









































