পিৎজার কারিগর থেকে ইতালির বিশ্বকাপ স্কোয়াডে ক্রিশান

ক্রিশান কালুগামাগে

‘সবকিছুই আঙুলের ডগার কারসাজি’—হালকা হাসি আর চোখ টিপে এমনটাই বলেন ক্রিশান কালুগামাগে। প্রশ্ন ছিল, লেগ-স্পিন আর পিৎজা বানানোর মধ্যে মিল কোথায়?

মুচকি হাসিতে তার দেওয়া উত্তরটা যতটা সরল, গল্পটা ততটাই অসাধারণ।

শ্রীলঙ্কায় জন্ম নেওয়া কালুগামাগে ১৫ বছর বয়সে পরিবারসহ পাড়ি জমান ইতালির তুসকানির লুক্কা শহরে। নতুন দেশ, নতুন ভাষা—সবকিছুর সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর লড়াইয়ের মাঝেই খেলাধুলা হয়ে ওঠে তার আত্মপরিচয় ও বন্ধুত্ব গড়ার সেতুবন্ধন।

শুরুটা অ্যাথলেটিক্স দিয়ে, পরে স্থানীয় মাঠে অপেশাদার ক্রিকেটে।

তার সহজাত প্রতিভা দ্রুতই নজরে পড়ে। সুযোগ আসে ইতালির অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ক্লাব রোমা ক্রিকেট ক্লাবে। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে জাতীয় দলে জায়গা করে নেন তিনি।

৩৪ বছর বয়সী কালুগামাগে এখন ইতালির টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ দলে থাকা পাঁচজন ‘হোম-বেসড’ ক্রিকেটারের একজন। বিদেশি বংশোদ্ভূত হলেও ইতালির মাটিতেই গড়ে তুলেছেন নিজের ক্রিকেট স্বপ্ন।

ইডেন গার্ডেন্স কিংবা ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামের মতো ঐতিহাসিক ভেন্যুতে হাজারো দর্শকের সামনে খেলার অভিজ্ঞতা তার জীবনের সেরা মুহূর্তগুলোর একটি। ঘরে বসে লাখো মানুষ দেখছেন তার বোলিং—এ যেন এক স্বপ্নপূরণ।

তবে এই পথটা মোটেও সহজ ছিল না। ক্রিকেটের জন্য পিৎজা বানানোর চাকরি প্রায়ই দ্বিতীয় স্থানে চলে যেত। আফসোসের সুরে তিনি বলেন, ‘অনেক চাকরি হারিয়েছি। রবিবার খুব ব্যস্ত দিন, অনেক মালিকই চান না আপনি ক্রিকেট খেলার জন্য কাজ ফাঁকি দিন।’

একদিকে জীবিকা, অন্যদিকে স্বপ্ন।

প্রায়শই জীবিকার চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে ক্রিকেট। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন, আঙুলের স্পিন একদিন তাকে বড় মঞ্চে নিয়ে যাবে।

ইতালির প্রধান কোচ জন ডেভিসন এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘ক্রিশ আমাদের জন্য ভীষণ বিপজ্জনক অস্ত্র। সে দুই দিকেই তীক্ষ্ণভাবে বল ঘোরাতে পারে। টুর্নামেন্টে খুব কম ব্যাটারই আগে তাকে মোকাবিলা করেছে—এই চমকটাই হবে তার বড় শক্তি।’

ডেভিসন স্পিন বোলিংয়ের সূক্ষ্ম কৌশলে পারদর্শী। তাকে ‘দ্য স্পিন হুইসপারার’ বলেও ডাকা হয়। গত দেড় দশক ধরে তিনি বিশ্ব ক্রিকেটে চাহিদাসম্পন্ন স্পিন কোচ হিসেবে কাজ করছেন। অস্ট্রেলিয়ার স্পিনার নাথান লায়ন একসময় তাকে ‘বিশ্বের সেরা স্পিন কোচ’ বলেও উল্লেখ করেছিলেন এবং কিশোর বয়স থেকেই তার সঙ্গে কাজ করেছেন।

এখন আর পিৎজার ডো ঘোরানো নয়, বরং তার দ্রুতগতির গুগলিই হবে মূল অস্ত্র। গ্রুপ ‘সি’-তে ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, নেপাল ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাটারদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারেন এই ইতালিয়ান লেগ-স্পিনার।

কালুগামাগের গল্প শুধু একজন ক্রিকেটারের নয়; এটি অভিবাসী জীবনের সংগ্রাম, শ্রমজীবী বাস্তবতা আর স্বপ্নে অটল থাকার কাহিনি।

হয়তো বিশ্বকাপের বড় মঞ্চে যখন তার গুগলি ব্যাটারকে বিভ্রান্ত করবে, তখন লুক্কার কোনো পিৎজার দোকানে কেউ বলবে, ‘দেখো, আঙুলের জাদুটা কিন্তু ওর পুরোনো!’

LEAVE A REPLY