রাজধানীর পল্লবীতে ছোট্ট শিশু রামিসা আক্তারকে পাশবিক নির্যাতন ও হত্যার ঘটনায় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ সমাবেশ হয়েছে। রামিসার নির্মম হত্যার ঘটনায় দেশের মানুষ ক্ষোভে ফুঁসছে। শুক্রবার রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধ করে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে। সবার দাবি একটাই-দ্রুততম সময়ে ধর্ষক ও খুনির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। যাতে ভবিষ্যতে যেন কেউ এমন অপরাধ করার সাহস না পায়। এদিকে আসামিপক্ষকে আইনি সেবা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঢাকা আইনজীবী সমিতির সদস্যদের।
পল্লবীতে রামিসাদের বাসার সামনে চতুর্থ দিনের মতো শুক্রবার দিনভর জনতার ঢল দেখা গেছে। এ সময় বিক্ষুব্ধ জনতা ক্ষোভে ফেটে পড়েন। রামিসার কুলখানিতে অংশ নিতে তার পরিবারের সদস্যরা গ্রামে গেছেন। শুক্রবার দুপুর ১২টার দিকে রামিসার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে একটি প্রাইভেটকার গ্রামের উদ্দেশে রওয়ানা হতে দেখা যায়। মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার ইছাপুরা ইউনিয়নের মধ্যম শিয়ালদী গ্রামে রামিসার কুলখানি অনুষ্ঠিত হবে। বুধবার এশার নামাজের পর শিয়ালদী গ্রামের মোল্লাবাড়ির বায়তুল আমান জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে দাদা-দাদির কবরের পাশে রামিসার লাশ দাফন করা হয়।
শুক্রবার বিকালে রামিসা হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার উপপুলিশ পরিদর্শক (এসআই) অহিদুজ্জামান যুগান্তরকে জানান, সব প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরি করার চেষ্টা করছি। শুক্র-শনিবার ছুটির দিন হওয়ায় একটু দেরি হচ্ছে। তবে আমরা চেষ্টা করছি-চার্জশিট (অভিযোগপত্র) রোববারের মধ্যে দিতে। তিনি আরও বলেন, সিআইডির ফরেনসিক ল্যাব থেকে ডিএনএ টেস্টের রিপোর্ট আমরা রোববার সকালের দিকে পাব। এরপরই প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে। মূল আসামি সোহেল রানার বিরুদ্ধে আগে কোনো মামলা ছিল কিনা জানতে চাইলে এসআই অহিদুজ্জামান বলেন, পাবনার চাটমোহরে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে তার নামে একটি মামলা ছিল।
রামিসার খুনির বিচারের দাবিতে পল্লবীজুড়ে শুক্রবার দিনভর বিক্ষোভ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের একটাই দাবি-দোষীদের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। রামিসার বাসার সামনের সড়কটি যেন শোক আর ক্ষোভের এক প্রতিবাদমঞ্চে পরিণত হয়। সকাল থেকে বাসার সামনে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ জড়ো হতে থাকে। নারী-পুরুষ, তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে বয়স্করাও বিক্ষোভে অংশ নেন। বিভিন্ন সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের ব্যানারে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করতে দেখা যায়। সাধারণ মানুষের দাবি-ধর্ষণ ও শিশুহত্যার মতো অপরাধে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। এ ধরনের অপরাধীদের প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দাবি জানান অনেকে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সংরক্ষিত আসনের সংসদ-সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, রামিসার হত্যাকারীর বিচারের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। তিনি বলেন, বিচারের দায়িত্ব রাষ্ট্র নেওয়ায় আশা করি খুব দ্রুতই বিচার হবে। এর মাধ্যমে আইনের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরে আসবে। শুক্রবার দুপুরে নারী ও শিশু অধিকার ফোরামের সদস্যদের নিয়ে তিনি রামিসার বাসায় গিয়ে এ আশা প্রকাশ করেন। ফোরামের পক্ষ থেকে রামিসার পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। ভবিষ্যতেও পাশে থাকার আশ্বাস দেওয়া হয়। এ সময় সংরক্ষিত আসনের সংসদ-সদস্য নিপুন রায় চৌধুরী বলেন, রামিসা হয়তো আর ফিরে আসবে না। কিন্তু এ হত্যাকাণ্ডের বিচার হলে ভবিষ্যতে অনেক শিশুর জীবন রক্ষা পাবে। দেশে ন্যায়বিচার, মানবাধিকার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সরকার কাজ করছে।
মিরপুরে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ : রামিসাকে ধর্ষণ, নির্যাতন ও হত্যার প্রতিবাদে রাজধানীর মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর এলাকা অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন স্থানীয়রা। এতে এলাকায় যানজটের সৃষ্টি হয়। দুপুর ১২টার দিকে বিক্ষোভ শুরু করে সড়কে অবস্থান নেন বিক্ষুব্ধ জনতা। সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে তারা সড়ক ছাড়েন। মিরপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাফিজুর রহমান যুগান্তরকে জানান, সড়কের একপাশে অবস্থান নিয়ে বিক্ষুব্ধরা প্রতিবাদ জানায়। আমরা এক লেনে যানবাহন পার করেছি। এ এলাকায় সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটের দিকে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
এদিকে, বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধে পর প্রায় চার ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর কালশী সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে। শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে রাজধানীর কালশী রোডের ফুলকলি ও আধুনিক মোড়ে সড়ক অবরোধ করেন স্থানীয় বিক্ষুব্ধ জনতা। পরে রাত সাড়ে ১০টার দিকে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাসান বাসির। তিনি বলেন, কালশী সড়কের যান চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে।
সোহেল অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ছিল : শুক্রবার ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, রামিসা হত্যাকাণ্ডের প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানা আগেও নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ছিল। তার অতীত কর্মকাণ্ড ভালো নয়। তার স্বভাব-চরিত্র খারাপ ছিল। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
রামিসার পরিবারকে আইনি সহায়তা দেবে সুপ্রিমকোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন : ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রামিসার পরিবারকে প্রয়োজনীয় যে কোনো আইনি সহায়তা দেওয়ার কথা বলেছেন সুপ্রিমকোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক (নির্বাচিত) অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আলী। শুক্রবার দেওয়া বিবৃতিতে তিনি বলেন, নিষ্পাপ শিশুর প্রতি এমন পাশবিকতা গোটা জাতির বিবেককে নাড়া দিয়েছে। এ ধরনের জঘন্য অপরাধ কোনো সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তিনি বলেন, শিশুদের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব।
আসামিপক্ষকে আইনি সেবা দেবে না ঢাকা আইনজীবী সমিতি : রামিসা হত্যা মামলায় আসামিপক্ষকে আইনি সেবা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ঢাকা আইনজীবী সমিতির সদস্যরা। শুক্রবার সকালে গণমাধ্যমকে ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক কালাম খান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। জুম মিটিংয়ে সমিতির কার্যনির্বাহী কমিটি এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
রামিসা হত্যায় অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি গুলশান সোসাইটির : রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় দ্রুত বিচার ও অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে গুলশান সোসাইটির উদ্যোগে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। শুক্রবার সকালে গুলশান-২ গোলচত্বরে এ কর্মসূচি পালন করা হয়। এতে সংগঠনের সদস্যসহ বিভিন্ন বয়স ও শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেয়। গুলশান সোসাইটির মহাসচিব মজিবুর রহমান মৃধার নেতৃত্বে আয়োজিত মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, এ ধরনের ঘটনায় সবাই গভীরভাবে শোকাহত ও উদ্বিগ্ন। শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। রামিসার হত্যাকাণ্ডকে মানবজাতির জন্য কলঙ্ক হিসাবে উল্লেখ করে তারা দোষীর কঠোর শাস্তি দাবি করেন। তারা বলেন, এ হত্যাকাণ্ডের বিচার বিলম্বিত হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা আরও ঘটবে। এজন্য যত দ্রুত সম্ভব অভিযুক্তের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা। সমাবেশে গুলশান সোসাইটির মহাসচিব মজিবুর রহমান মৃধা, যুগ্মসচিব জয়া কবীর, খাদেম মোহাম্মদ রাইয়ান সাদিদ, নারী ও শিশুবিষয়ক চেয়ারম্যান কামরুন্নাহার প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
রামিসার কবরের পাশে দাদার অপলক অপেক্ষা : সিরাজদিখান (মুন্সীগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, রামিসার (৮) লাশ দাফনের পরও থামেনি শোকের মাতম। পারিবারিক কবরস্থানে নাতনির কবরের পাশে ৯০ বছর বয়সি দাদা মজিবর রহমান মোল্লা কয়েক মিনিট অপলক দৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। শুক্রবার সকালে দেখা যায়, কবরের মাটি এখনো ভেজা। কবরের মাঝখানে লাগানো সূর্যমুখী ফুলগাছ মাথা নুইয়ে পড়েছে। নীরবে কবরের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন মজিবর রহমান। তার চোখে-মুখে ছিল স্পষ্ট অসহায়ত্ব আর শোকের ছাপ।
বরিশালে বিক্ষোভ : বরিশাল ব্যুরো জানায়, শিশু রামিসাসহ সারা দেশে চলমান খুন, ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে বরিশালে কর্মসূচি পালন করেছে সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট-সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম। সকাল ১০টার দিকে নগরীর অশ্বিনী কুমার হল চত্বরে সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট ও সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরামের বরিশাল জেলা শাখার উদ্যোগে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। কর্মসূচিতে শিশু রামিসা হত্যার বিচার এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট বরিশাল মহানগর শাখার আহ্বায়ক সুজন আহমেদ। উপস্থিত ছিলেন সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরামের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও বাসদ বরিশাল জেলা শাখার সমন্বয়ক ডা. মনীষা চক্রবর্ত্তীসহ সংগঠনের নেতাকর্মীরা।
এদিকে জুমার নামাজ শেষে বরিশালের সর্বস্তরের ছাত্র-জনতার ব্যানারে বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। নগরীর সরকারি বিএম কলেজের সামনে থেকে বের হওয়া মিছিলটি বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে নথুল্লাবাদ এলাকায় গিয়ে শেষ হয়। উল্লেখ্য, মঙ্গলবার পাশের ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়া সোহেল রানা (৩০) নিজের ফ্ল্যাটে রামিসাকে জোর করে নিয়ে যায়। এরপর সে পাশবিক নির্যাতন চালায়। এরপর রামিসার মাথা বিচ্ছিন্ন করা হয়। লাশ গুমের চেষ্টা করে সোহেল। এ সময় তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার তাকে সাহায্য করে। এ ঘটনায় বুধবার রাজধানীর পল্লবী থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা মামলা করেন।











































