বিশ্বকাপের বল ট্রাইওন্ডা হাতে নেইমার। ছবি : ফিফা
শিশু থেকে বৃদ্ধ সবার প্রিয়! নেইমার জুনিয়রের ক্যারিয়ারের উত্থানের গল্পটা এমনই ছিল। তার ড্রিবলিং আর গতি দর্শক-সমর্থকদের চোখের প্রশান্তি।ক্যারিয়ারের গোধূলিলগ্নে পৌঁছালেও সেই গল্পে নেই তেমন কোনো পরিবর্তন। তবে যোগ হয়েছে দীর্ঘ আক্ষেপ।
ব্রাজিলের হয়ে নামের পাশে সোনালি ট্রফি তো দূরে থাক নেই কোনো বড় শিরোপাও। আধুনিক ফুটবলের ইতিহাসের অন্যতম প্রতিভার ক্যারিয়ার তাই আক্ষেপ নিয়েই শেষ হওয়ার শঙ্কায়।তবে শেষ সুযোগ পাচ্ছেন ৩৪ বছর বয়সী ফুটবল জাদুকর।
আগের তিন বিশ্বকাপের গল্প ছিল শুধুই হতাশার। ঘরের মাঠের ২০১৪ বিশ্বকাপ দিয়ে শুরুটা হয়েছিল তার। সবকিছু সুন্দর মতোই চলছিল।তবে কোয়ার্টার ফাইনালে পাওয়া চোট সবকিছু বদলে দিল। কলম্বিয়ার ডিফেন্ডার জুনিগার হাঁটুর আঘাত মেরুদণ্ডে চিড় ধরেছিল। আঘাতটা মেরুদণ্ডের আর কয়েক ইঞ্চি নিচে লাগলে চিরতরে পঙ্গু হয়ে যেতে পারতেন তিনি।
বড় দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেলেও কাঙ্ক্ষিত ফল জুটেনি নেইমারের কপালে। তার ছিটকে যাওয়ার পর ঘরের মাঠের সেমিফাইনালে ব্রাজিলও হয় বিধ্বস্ত।জার্মানির কাছে বেলো হরিজন্তে ৭-১ ব্যবধানের হারটি বিশ্বকাপ ইতিহাসে তাদের সবচেয়ে বড় হার। পরের দুই বিশ্বকাপের গল্প কোয়ার্টারেই শেষ। কাতার বিশ্বকাপের সেই কান্না যেন এখন তরতাজা। সে সময়কার সতীর্থ দানি আলভেজ চেষ্টা করেও নেইমারের চোখ বেয়ে নামা অশ্রু থামাতে পারছিলেন না।
অশ্রু অবশ্য নেইমারের পুরো ক্যারিয়ারের সঙ্গী ছিল। চোট আর কান্না একাকার হয়েছে। ট্রান্সফার মার্কেটের হিসাবে, চোটের কারণে ক্যারিয়ারের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৬১২ দিন মাঠের বাইরে তিনি। সবমিলিয়ে চোট পেয়েছেন ৪৮ বার। সঙ্গে মাঠের বাইরের কর্মকাণ্ডের কারণেও শিরোনাম হচ্ছিলেন। আড্ডা-মাস্তির সঙ্গে নারী আসক্তিতে যে মজেছিলেন তিনি।
তাই সব ধরনের সম্ভাবনা থাকার পরেও লিওনেল মেসি-ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর যোগ্য উত্তরসূরি হতে পারেননি নেইমার। গোল ডটকমের উপস্থাপক চার্লি তাই বলেছেন, ‘আধুনিক ফুটবল ইতিহাসে প্রতিভার সবচেয়ে বড় অপচয় নেইমার।’
তবে এত কিছুর পরেও নেইমারই এখন ব্রাজিলের পোস্টার বয়। বিশ্বাস না হলে ১৯৯৪ বিশ্বকাপজয়ী ব্রাজিলয়ান কিংবদন্তি রোমারিওর মুখেই শুনুন, ‘শুধু নেইমারকে নিয়েই ২০২৬ বিশ্বকাপ জয়ের সুযোগ আছে ব্রাজিলের। তাকে ছাড়া দলটি বিশ্বকাপ জিততে পারবে না। ১৯৬২ সালে ব্রাজিল গারিঞ্চা, ১৯৭০ সালে পেলে, ১৯৯৪ সালে রোমারিওকে এবং ২০০২ সালে রোনালদোকে নিয়ে জিতেছে। ২০২৬ সালে যদি তারা নেইমারকে ছাড়া খেলে, তবে তারা জিততে পারবে না।’
তাই সবকিছু পুষিয়ে দেওয়ার শেষ সুযোগ পাচ্ছেন নেইমার। ২০২৬ বিশ্বকাপ খেলবেন এটা খুব করে চাচ্ছিলেন নিজেও। বিদায়ের ইঙ্গিত দিয়ে সাবেক বার্সেলোনা-পিএসজির সাবেক ফরোয়ার্ড বলেছেন, ‘২০২৬ বিশ্বকাপ খেলতে চাই। এটাই আমার ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ।’
বিশ্বকাপ স্কোয়াড ঘোষণার সময় কার্লো আনচেলত্তি তার নাম বলতেই তাই আরেকবার কাঁদলেন নেইমার। আনন্দাশ্রুর ষোলোকলাপূর্ণ করা এখন তার দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনে তাকে সহায়তা করবেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র-রাফিনিয়া-কাসেমিরোদের নিয়ে সাজানো ব্রাজিল দল।
আহত বাঘ যেমন বিপজ্জনক হয় নেইমারও সেই গর্জন দেখানোর সুযোগ পাচ্ছেন। শেষটায় জানপ্রাণ দিয়ে লড়ার। অনুপ্রেরণা হিসেবে মেসির অমরত্ব লাভের মুহূর্তটাকে ধারণ করতে পারেন কিংবা স্বদেশি রোনালদো ফেনোমেননকে। ১৯৯৯ সালে ভয়ংকর চোট পেয়েছিলেন রোনালদো। হাঁটুর লিগামেন্ট ছিঁড়ে যাওয়ায় ২০০২ বিশ্বকাপ খেলতে পারবেন কিনা সেই শঙ্কা দেখা দিয়েছিল। পরে ঠিকই দক্ষিণ কোরিয়া-জাপান বিশ্বকাপে ব্রাজিলকে চ্যাম্পিয়ন করেন রিয়াল মাদ্রিদের সাবেক স্ট্রাইকার।
ব্রাজিলের পঞ্চম ও শেষ বিশ্বকাপ জয়ও ছিল সেটাই। এরপর দীর্ঘ ২৪ বছর পেরিয়ে গেলেও সোনালি ট্রফিটা ছুঁয়ে দেখা হয়নি সেলেসাওদের। ‘হেক্সা’ পূরণের স্বপ্ন তাই অধরাই থেকে গেছে। তাই ‘এক ঢিলে দুই পাখি মারার সুযোগ’ ব্রাজিলের সর্বোচ্চ ৭৯ গোলের মালিকের সামনে।
নেথপ্যেও এমন একজন পাচ্ছেন নেইমার যিনি ট্রফি শিকার করতে দক্ষ। বিশেষ করে ক্লাব ফুটবলের শীর্ষ পর্যায়ে যিনি ‘সেরাদের সেরা’ হিসেবে পরিচত। চ্যাম্পিয়নস লিগে সর্বোচ্চ ৫টি ট্রফি আনচেলত্তির নামের পাশে। তাই শীর্ষদের কাজ থেকে কিভাবে সেরাটা বের করতে হয় তা ভালো করেই জানেন আনচেলত্তি। সঙ্গে ইতালিয়ান কোচের সামনেও একটা চ্যালেঞ্জ আছে। সেই চ্যালেঞ্জ উত্তরে গেলেই গড়বেন ইতিহাস। ফুটবলের ইতিহাসে প্রথম বিদেশি কোচ হিসেবে জিতবেন বিশ্বকাপ।
এখন সব সমীকরণ এক বিন্দুতেই মিলে যাওয়ার অপেক্ষা। ক্যারিয়ারের সায়াহ্নে তাই ‘রাজপুত্রের’ মাথায় মুকুটটা শোভা পাক এমনটাই চাওয়া ভক্ত-সমর্থকদেরও।টপিক:ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬বিশ্বকাপ খবর









































