চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং নিজ দেশ ইরানের সংকট নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আগের মতো নিয়মিত পোস্ট না করায় তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন ইরানি বংশোদ্ভূত বলিউড অভিনেত্রী মান্দানা কারিমি।
সম্প্রতি ভারত ছেড়ে দুবাইয়ে পাড়ি জমানো এই অভিনেত্রী তার নতুন জীবনযাত্রাকে ‘স্বাভাবিক’ বা ‘আমোদপ্রমোদ’ হিসেবে জাহির করছেন—নেটিজেনদের এমন অভিযোগের মুখে এবার সরাসরি ও কড়া জবাব দিয়েছেন তিনি।
ইনস্টাগ্রামে শেয়ার করা একটি নতুন দীর্ঘ ভিডিও বার্তায় মান্দানা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, জনসম্মুখে নিজের কষ্ট বা কান্না প্রদর্শন করার মাধ্যমেই কেবল দেশপ্রেম বা অ্যাক্টিভিজম (আন্দোলন) পরিমাপ করা যায় না।
ভিডিও বার্তায় সমালোচকদের উদ্দেশ্য করে মান্দানা কারিমি বলেন, ‘অনেকেই ইদানীং মেসেজ পাঠিয়ে জানতে চাচ্ছেন কেন আমি প্রতিদিন ইরান নিয়ে কথা বলছি না, কেন সবকিছু স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছি। আমি মনে করি না মানুষ এর পেছনের চড়া মূল্যটা বোঝে।
এই প্রতিবাদের কারণে আমি কত কাজ হারিয়েছি, কত সুযোগ হাতছাড়া করেছি, তা কেউ জানে না। নিজের দেশকে এভাবে ধ্বংস হতে দেখা এবং নিজের পরিবার সেখানে থাকা সত্ত্বেও পুরোপুরি অসহায় বোধ করার যে কষ্ট তা আমি বয়ে বেড়াচ্ছি।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘লড়াই মানে কখনো কথা বলা, কখনো স্রেফ টিকে থাকা, আবার কখনো নিজেকে নিরাময় করার সুযোগ দেওয়া। আপনারা যে আমার ওয়ার্কআউট কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো মুহূর্তের পোস্ট দেখছেন, তার মানে এই নয় যে আমি আমার দেশের মানুষকে বা ইরানকে ভুলে গেছি। এর মানে হলো আমি এখনো টিকে আছি, তারা আমাকে ভেঙে ফেলতে পারেনি। এত কিছুর পরও আমি হাসতে, বাঁচতে এবং সামনে এগিয়ে যেতে চাচ্ছি।’
পোস্টের ক্যাপশনে মান্দানা ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন, সবচেয়ে বড় প্রহসন হলো—কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসার মেসেজগুলো আসছে খোদ ইরানের ভেতরে থাকা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে। আর বিষাক্ত আক্রমণগুলো ছড়াচ্ছে ইরানের বাইরে নিরাপদে বসে থাকা কিছু ছদ্মনামী বা ভুয়া অ্যাকাউন্ট থেকে, যাদের আন্দোলন কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কয়েকটি পোস্টের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
সমালোচকদের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে ইরানি বংশোদ্ভূত এই অভিনেত্রী বলেন, ‘আমার সুস্থ হয়ে ওঠাকে নীরবতা ভাববেন না। আমার বেঁচে থাকাকে উদাসীনতা মনে করবেন না। আমি নিপীড়নকে স্বাভাবিক করছি না, আমি ট্রমা বা মানসিক আঘাতের পর জীবনকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছি।
নিজের অবস্থান ধরে রাখতে গিয়ে আমি জাতীয় টেলিভিশনে কথা বলেছি, প্রতিটি সাক্ষাৎকারে নিজের কণ্ঠ ব্যবহার করেছি, যার জন্য আমাকে বড় ধরণের মাশুল দিতে হয়েছে। আপনারা যারা নিরাপদ দূরত্বে থেকে শুধু দেখছেন, তারা বিচার করার আগে নিজেদের জিজ্ঞেস করুন—আপনারা দেশের জন্য আসলে কী ঝুঁকি নিয়েছেন?’
বক্তব্যের শেষে তিনি সাফ জানিয়ে দেন, যদি কারো তার হাসিমুখ, ফ্যাশন, ভ্রমণ কিংবা জীবনের খুশির মুহূর্তগুলো দেখতে সমস্যা হয়, তবে তারা তাকে ‘আনফলো’ করে দিতে পারেন। কিন্তু কেউ তার গল্প নতুন করে লেখার বা দেশের প্রতি তার ভালোবাসাকে নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার রাখে না।
উল্লেখ্য, গত মার্চ মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে পুরোদমে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। ইরানে জন্ম নেওয়া মান্দানা শুরু থেকেই এই সংঘাতের বিরুদ্ধে এবং নিজ দেশের মানুষের পক্ষে সোচ্চার ছিলেন।
১০ বছর আগেই ইরানে প্রবেশ নিষিদ্ধ হওয়া এই অভিনেত্রী প্রায় ১৬ বছর ধরে ভারতে বসবাস করছিলেন এবং বলিউডের ‘ভাগ জনি’, ‘ক্যায়া কুল হ্যায় হাম ৩’ এবং ওটিটি রিয়েলিটি শো ‘লক আপ’-এ অংশ নিয়ে পরিচিতি পান।
তবে যুদ্ধ পরিস্থিতি, মানসিক চাপ এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তার কারণে গত মাসে তিনি তার দ্বিতীয় বাড়ি ভারত ছেড়ে স্থায়ীভাবে দুবাইয়ে চলে যান। বর্তমানে দুবাইয়ে থেকেই নতুন করে নিজের ক্যারিয়ার ও জীবন গোছানোর চেষ্টা করছেন তিনি।
সূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস











































