আদমজী জুট মিল বন্ধের ২৪ বছর আজ পাটকল থেকে ইপিজেড, ক্ষতির চেয়ে লাভের পাল্লা ভারি

আদমজী জুট মিল বন্ধের ২৪তম বছর আজ। ২০০২ সালের এইদিনে এশিয়ার বৃহত্তম জুট মিল আদমজী তৎকালীন বিএনপি জোট সরকার চিরতরে বন্ধ করে দেন। ফলে এ মিলের ৩৫ হাজার শ্রমিক-কর্মচারী বেকার হয়ে পড়েন। পরবর্তীতে ২০০৬ সালের ৬ মার্চে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া আদমজী ইপিজেডের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। সেই থেকেই আদমজী ইপিজেডের অগ্রযাত্রা শুরু হয়। যা ক্ষতির চাইতে লাভের পাল্লা ভারি বলে মনে করছেন এ এলাকার ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিকবিদরা। 

ইপিজেডে এ পর্যন্ত বিনিয়োগের অঙ্ক ৮৪০ দশমিক ৪০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। আদমজী ইপিজেড প্রতিষ্ঠার সময় থেকে এ পর্যন্ত ১০ হাজার ৯৩৪ দশমিক ৯৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের পণ্যসামগ্রী রপ্তানি করা হয়েছে। বর্তমানে আদমজী ইপিজেডে ৭৫ হাজার ৯৫৯ জন শ্রমিক-কর্মচারী ও কর্মকর্তা কর্মরত রয়েছেন। দিন দিন বাড়ছে কর্মসূযোগ, বাড়ছে শ্রমিকদের সংখ্যাও। সমৃদ্ধি এসছে এ এলাকার অর্থনীতিতে। আদমজী জুট মিল বন্ধের সময় বাম রাজনৈতিকদলগুলোসহ কিছু সুবিধাভোগী সংগঠন এ জুট মিল বন্ধের বিরোধীতা করে আন্দোলন সংগ্রামও করেছিল। কিন্তু বছরের পর বছর লোকসান, উৎপাদন দক্ষতার অবনতি এবং রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় গড়ে উঠা শ্রমিক সংগঠনগুলোর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের কারণে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এ জুট মিলকে বন্ধ করে দেয়। কিন্তু এরপর বিপরীতে তিনি চালু করেন আদমজী ইপিজেড। যা রাষ্ট্রের এবং এ এলাকার অর্থনৈতিক চালিকাশক্তিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সহায়তা করেছে।

রাজধানী ঢাকার জিরো পয়েন্ট থেকে মাত্র ১৫ কিলোমিটার পূর্বদিকে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের আদমজীনগরে আদমজী ইপিজেডের অবস্থান। ২৯২ দশমিক ৬২ একর জমির উপর স্থাপিত এ ইপিজেডের বর্তমানে শিল্প প্লটের সংখ্যা ২৭৬টি। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, প্ল্যান মাফিক ইপিজেড স্থাপন ও দক্ষ জনশক্তি আদমজী ইপিজেডের সাফল্যের মূল কারণ। এই ইপিজেডের অবস্থান এমন এক জায়গায় যেখান থেকে সড়ক, নৌ ও আকাশ পথের যোগাযোগ ব্যবস্থা সুবিধাজনক। উড়াল সেতুর কারণে ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ করা যায় অনায়েসে। তাছাড়া ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক কাঁচপুর ব্রিজ পর্যন্ত আটলেন ও এরপর থেকে ফোরলেন মহাসড়ক হওয়ায় চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে পোশাক আমদানি-রপ্তানি করাটাও অনেক সহজ। আদমজী ইপিজেডের সর্বমোট ২৭৬ টি শিল্প প্লটের মধ্যে বর্তমানে ৫০টি শিল্প প্রতিষ্ঠান উৎপাদনে রয়েছে। আদমজী ইপিজেডে রেমি হোল্ডিংস লিমিটেডের মতো বিশ্বের শীর্ষ পরিবেশবান্ধব সবুজ কারখানার অবস্থান রয়েছে।

সিদ্ধিরগঞ্জ থানা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও নাসিক কাউন্সিলর ব্যবসায়ী মো. ইকবাল হোসেন জানায়, বছরের পর বছর লোকসান হওয়ায় আদমজী জুট মিল বন্ধ করে দিয়েছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী আমাদের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। এপরই তিনি একই জায়গায় আদমজী ইপিজেড প্রতিষ্ঠা করেন। এতে বাংলাদেশের পাশাপাশি এলাকার বিপুল সংখ্যক জনসংখ্যা কর্মসংস্থান পেয়েছে। এ ইপিজেডের কারণে বিভিন্ন দেশের শিল্প প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে আসছে। আমাদের রপ্তানীখাত চাঙ্গা হচ্ছে। আমরা বিদেশী মুদ্রা আয় করতে পারছি। বেগম খালেদা জিয়া জুট মিল থেকে ইপিজেড প্রতিষ্ঠা করায় ক্ষতির চাইতে লাভের হিসাবটাই বেশি হয়েছে। 

বর্তমানে আদমজী ইপিজেডে গার্মেন্টস, গার্মেন্টস এক্সেসরিজ, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, জুতা, গাড়ির সিট ট্রিম কভার, লেবেল, সোয়েটার, মেটাল পণ্য, জুয়েলারি, ওপিসি ড্রাম, কেমিক্যাল এন্ড ফার্টিলাইজার, নিটিং অ্যান্ড টেক্সটাইল পণ্য ইত্যাদি পণ্য উৎপাদিত হয়। স্বাগতিক বাংলাদেশসহ যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, জাপান, মরিসাস, সিঙ্গাপুর, চীন, কানাডা, স্পেন, জার্মানি, হংকং (চীন), মালয়শিয়া, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ড, নেদারল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, কুয়েত, ইউক্রেন এবং রোমানিয়ার বিনিয়োগকারীগণ বিনিয়োগ করেছে পরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠা আদমজী ইপিজেডে। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, আদমজী ইপিজেডে রেমি হোল্ডিংস লিমিটেডের মতো বিশ্বের শীর্ষ পরিবেশবান্ধব সবুজ কারখানা নির্মাণের জন্য অন্যান্য প্রতিষ্ঠানদের উৎসাহিত করা হচ্ছে। আদমজী ইপিজেডে আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করা হয়। 

তিনি জানায়, আদমজী ইপিজেডের প্রধান সড়ক (শিমরাইল-আদমজীইপিজেড-নারায়ণগঞ্জ সড়ক) অনেক সংকীর্ণ। এতে করে অধিকাংশ সময় যানজট লেগে থাকায় শ্রমিকদের দূর্ভোগের পাশাপাশি অনেক কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়ে থাকে। তাছাড়া ডিএনডি ক্যানেলের ওপর নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের অপরিকল্পিত সেতু নির্মাণের ফলে দূর্ভোগে পড়তে হয় শ্রমিকদের। যা সমাধান করার জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর দৃষ্টি কামনা করেন।

LEAVE A REPLY