বাজার বিশ্লেষণ ছাড়া দরপত্র, বাড়ছে মেট্রোরেল প্রকল্পের ব্যয়

বাজারমূল্য যথাযথভাবে বিশ্লেষণ না করে মেট্রোরেল প্রকল্পের বিভিন্ন ঠিকাদারি প্যাকেজে দরপত্র আহ্বান করে বিপাকে পড়েছে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)। দরপত্রে অনেক ‘অসংগতিপূর্ণ’ শর্ত রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।প্রাক-প্রাথমিক আলোচনায় আগ্রহ দেখানো আন্তর্জাতিক কনসোর্টিয়ামগুলো শেষ পর্যন্ত সরে যাচ্ছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ডিএমটিসিএলের দরপত্রে ‘অবাস্তব শর্ত’ আরোপের অভিযোগও করেছে।

খবরের কাগজ এক প্রতিবেদনের প্রকাশ করে এমআরটি-১ প্রকল্পের কন্ট্রাক্ট প্যাকেজ (সিপি)-৩-এর ঠিকাদারি কার্যক্রমে নানা অব্যবস্থাপনার তথ্য পাওয়া গেছে। এ প্যাকেজের জন্য জাপানের পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে প্রি-কোয়ালিফাইড করে ডিএমটিসিএল।২০২৩ সালের মার্চে দরপত্র আহ্বান করা হলে ‘অবাস্তব শর্তাবলি’ ও ‘ভুল বাজার বিশ্লেষণের’ অভিযোগ তুলে প্রতিষ্ঠানগুলো অংশ নেয়নি। এরপর তিন বছর পেরিয়ে গেলেও সিপি-৩-এর দরপত্র প্রক্রিয়া এগোয়নি। দুই দফায় খসড়াপত্র জাইকার কাছে পাঠানো হলেও এখনো অনুমোদন মেলেনি।

সিপি-৪ প্যাকেজে সর্বনিম্ন দরদাতা জাপানের টোকিও-মিল কনসোর্টিয়াম।চুক্তি চূড়ান্ত করার আগে ডিএমটিসিএল দর-কষাকষি করছে। গত বছরের ৪ আগস্ট শুরু হওয়া এ প্রক্রিয়া এখনো চলছে।

সিপি-৫ প্যাকেজে সর্বনিম্ন দরদাতা জাপানের কাজিমা করপোরেশন প্রায় পাঁচ হাজার ৫৫ কোটি টাকার দর প্রস্তাব করেছিল। প্রকল্পের ধীরগতির কারণে দরপত্রের বৈধতার মেয়াদ বাড়াতে অস্বীকৃতি জানিয়ে প্রতিষ্ঠানটি সরে দাঁড়ায়। নির্মাণসামগ্রীর দাম বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার বিপরীতে স্থানীয় মুদ্রার দর পরিবর্তনকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে কাজিমা।ফলে প্যাকেজটি বাতিল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সিপি-৬-এর ক্ষেত্রেও জটিলতা দেখা দিয়েছে। সর্বনিম্ন দরদাতার সঙ্গে দর-কষাকষি শেষে দর প্রস্তাব জাইকার অনুমোদনের জন্য পাঠানো হলেও প্রক্রিয়াটি দীর্ঘায়িত হয়েছে।

মূল মেট্রোরেল লাইনের ট্র্যাক নির্মাণের প্যাকেজ সিপি-৯-এ সর্বনিম্ন দরদাতা সুমিতুমি জয়েন্ট ভেঞ্চার দরপত্রের বৈধতার মেয়াদ বাড়াতে আপত্তি জানিয়েছে। ডিএমটিসিএল দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা মিতসুবিশি-সিমেন্স কনসোর্টিয়ামকে কাজ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে তাদের দর প্রথম সর্বনিম্ন দরদাতার চেয়ে ৭১ শতাংশ বেশি।

ডিএমটিসিএলের বোর্ডসভার একজন সদস্য বলেন, প্রথম দরদাতাকে ধরে রাখা না গেলে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতাকে কাজ দিতে হবে। এতে প্রকল্পের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাবে। তাই পুনরায় দরপত্র না ডেকে সর্বনিম্ন দরদাতার সঙ্গে দর-কষাকষির মাধ্যমে ব্যয় কমানোর চেষ্টা করছে ডিএমটিসিএল। এ প্রক্রিয়ায় দেড় বছর পার হলেও অগ্রগতি নেই।

সিপি-৭ ও সিপি-৮-এর মূল্যায়ন প্রতিবেদন জাইকার অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। সিপি-১০-এর আর্থিক প্রস্তাবের মূল্যায়ন প্রতিবেদনেও নানা ত্রুটি ধরা পড়েছে। সংশোধিত প্রতিবেদন একাধিকবার পাঠালেও প্রস্তাবটি চূড়ান্ত হয়নি। সিপি-১১-এর দরপত্র ২০২৩ সালের ৯ জানুয়ারি খোলার কথা থাকলেও তা পিছিয়ে ২০২৬ সালের অক্টোবরে নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি খোলা সিপি-১২-এর দরপত্রও বছরের পর বছর ‘মূল্যায়ন প্রক্রিয়াধীন’ রয়েছে।

এ বিষয়ে ডিএমটিসিএলের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাঁরা মন্তব্য করতে রাজি হননি। গত ২৫ জুলাই থেকে একাধিকবার ভারপ্রাপ্ত জনসংযোগ কর্মকর্তা আহসান উল্লাহ শরীফিকে প্রশ্ন পাঠানো হলেও তিনি উত্তর দেননি। গত বুধবার (১২ আগস্ট) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাওগাতুল আলমকে বার্তা পাঠানো ও ফোন করেও সাড়া পাওয়া যায়নি।

বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত দেশের প্রথম ভূগর্ভস্থ মেট্রোরেল প্রকল্প এমআরটি-১-এর প্রাথমিক ব্যয় ছিল ৫২ হাজার ৫৬২ কোটি টাকা। এখন তা বাড়িয়ে ১ লাখ ২০ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকা করার প্রস্তাব করেছে ডিএমটিসিএল। প্রকল্পের মেয়াদও ডিসেম্বর ২০২৬ থেকে বাড়িয়ে ডিসেম্বর ২০৩৫ পর্যন্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্রকল্পটির ১২টি প্যাকেজের মূল আনুমানিক ব্যয় ছিল ৩৭ হাজার ৬৫৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। এখন তা বেড়ে ৮০ হাজার ৯৯৯ কোটি ৭৯ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। ডিএমটিসিএল ও পরিকল্পনা কমিশন ব্যয় বৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে প্রাক্কলনের চেয়ে বেশি দর পাওয়া এবং মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার দরপতনের কথা জানিয়েছে।

প্রস্তাবটি অনুমোদন হলে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পর এমআরটি-১ হবে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রকল্প। পরিকল্পনা কমিশনের অতিরিক্ত সচিব (পরিবহন উইং) মো. আলী রেজা সিদ্দিকী বলেন, প্যাকেজগুলোর দর পুনর্মূল্যায়ন করে বাড়তি অর্থের প্রয়োজন নির্ধারণ করা হবে। পুরো প্রকল্পের ১২টি প্যাকেজ পুনর্মূল্যায়ন করতে হতে পারে।

LEAVE A REPLY