গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের পাঁচ ভাগের এক ভাগ জ্বালানি তেল পরিবহন করা হয়। তাই ইরান হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণকেই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারছে।হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকলে সরাসরি তার প্রভাব পরে জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক বাজারে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধের পর থেকে প্রায় ছয় মাস ধরে কার্যত বন্ধ হরমুজ প্রণালি। তার মানে বিশ্বের পাঁচ ভাগের এক ভাগ তেল পরিবহন হতে পারছে না। এর চেয়ে বড় কথা যুদ্ধ ধারণার চেয়েও অনেক বেশি সময় ধরে চলছে।
এতদিনে তো তেলের দাম আকাশ ছুঁয়ে ফেলার কথা। যুদ্ধ শুরুর পর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে বটে। তবে যতটা বাড়ার কথা, ততটা বাড়েনি। যুদ্ধ শুরু হওয়ার ১৬ দিনের মাথায় তেলের দাম ৪০ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৩.৯০ ডলারে গিয়ে ঠেকেছিল।এপ্রিল মাসে তা বাড়তে বাড়তে ১২৬.৩১ ডলার পর্যন্ত উঠেছিল। জুন-জুলাই মাসে শান্তি আলোচনা চলার সময় তা ৭২ ডলারে নেমে এসেছিল। তবে সমঝোতা স্মারক ভেস্তে যাওয়ার পর দাম আবার বাড়তে থাকে। এখন তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯৪ থেকে ৯৭ ডলারে ওঠানামা করছে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকলে তেলের বাজার পাগলা ঘোড়ায় সওয়ার হওয়ার কথা।কিন্তু সেটা ঘটেনি। তেলের দাম বেড়েছে, তবে এখনো তা সহনীয় পর্যায়েই রয়েছে। এর রহস্যটা কোথায়? আসলেই এটা একটা রহস্য। এই রহস্য রীতিমতো সিনেমার মতো রোমাঞ্চকর। এখানে যুদ্ধ বা কূটনীতির কোনো ভূমিকা নেই। আছে কৌশল। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়া নানা নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ে। নিজেদের অর্থনীতিকে বাঁচাতে তারা ছদ্মবেশী নৌবহর সমুদ্রে নামায়। ইরান যুদ্ধের উত্তাপ থেকে বিশ্বকে বাঁচাতে এমনই এক অভিনব কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো। ইরানের রাডারের চোখ ফাঁকি দিয়ে তেল পরিবহন করতে তারা জলে নামিয়েছে ’ডার্ক ট্যাংকার’, হরমুজে গিয়ে যারা স্রেফ হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। পারস্য উপসাগরে ইরানি ড্রোন ট্যাংকারগুলোর জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ানোয় সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেল কম্পানিগুলো এই কৌশল বেছে নিয়েছে।
সিএনএন-এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, তারা তেল পরিবহনের জন্য ট্যাংকার ভাড়া করে সেগুলোর ট্রান্সপন্ডার (যোগাযোগ ও ট্র্যাকিং যন্ত্র) বন্ধ করে দিচ্ছে এবং মার্কিন নৌবাহিনীর পাহারায় উপসাগর থেকে অপরিশোধিত তেল সরিয়ে নিচ্ছে। এই রাডার ফাঁকি দেওয়া ডার্ক ট্যাংকারগুলো হরমুজ প্রণালি পার হয়ে ওমান উপসাগরে পৌঁছায়। সেখানে গিয়ে আবার তারা রাডারের চোখে দৃশমান হয়, অপেক্ষারত অন্য ট্যাংকারে তেল খালাস করে এবং খালি জাহাজটি আবার প্রণালি দিয়ে ফিরে আসে। ফিরে আসার সময়ও তারা হরমুজ পার হওয়ার সময় সবকিছু বন্ধ করে দিয়ে গায়েব হয়ে যায়। এই কৌশলের ফলে সাধারণ বাণিজ্যিক জাহাজ কম্পানিগুলোর ওপর থেকে আর্থিক ও শারীরিক ঝুঁকি দূর হয়েছে। তার বদলে বীমা খরচের বোঝা এবং হামলার ঝুঁকি এখন সরাসরি মার্কিন সরকার এবং তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর ওপর বর্তেছে।
শিপিং ডেটা ফার্ম ‘কেপলার’ জানিয়েছে, সাম্প্রতিক দুই সপ্তাহের ব্যবধানে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পার হওয়া তরল কার্গোর ৮০ শতাংশেরও বেশি হয় ওমানি রুট ব্যবহার করেছে, অথবা ‘ডার্ক ট্রানজিট’ হিসেবে একই পথ অনুসরণ করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মার্কিন জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, ডার্ক ট্রানজিট কৌশলটি কাজ করছে। আগস্টে তাদের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এই প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৮০ থেকে ৯০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবাহিত হচ্ছে, যা ট্রান্সপন্ডার-ভিত্তিক ট্র্যাকিংয়ের অনুমিত হিসাবের প্রায় দ্বিগুণ। কেপলারের রেকর্ড বলছে, গত ১ মার্চ থেকে পারস্য উপসাগরে এ ধরনের ১ হাজার ৫১৪টি ‘ডার্ক ক্রসিং’ বা অদৃশ্য যাতায়াত সম্পন্ন হয়েছে।
সিএনএন এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৫ জুলাই গ্রিসের মালিকানাধীন সুপারট্যাঙ্কার কিকু কাতারের মেসাইদ টার্মিনালে নোঙর করে এবং পরে তেলবোঝাই করে হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশ করে। ৩১ জুলাই দুবাই উপকূলের কাছে জাহাজটির ট্রান্সপন্ডার বন্ধ করে দেওয়া হলে এটি ট্র্যাকিং ব্যবস্থা থেকে অদৃশ্য হয়ে যায় এবং ১ আগস্ট আবার দৃশ্যমান হয়। তবে হরমুজ প্রণালিটি খুবই সংকীর্ণ হওয়ায় ডার্ক ট্রানজিট কৌশলটি পুরোপুরি নিখুঁত নয়। এখানে কোনো ট্যাঙ্কারের লুকিয়ে থাকার মতো জায়গা খুব কম এবং ট্রান্সপন্ডার বন্ধ থাকলেও জাহাজ শনাক্ত করা অসম্ভব নয়। তবে, এই কৌশলটি তাদের কিছুটা বাড়তি সময় দেয়। তাছাড়া রাডার ফাঁকি দিলেও ধরা পড়ার ভয় থাকে, থাকে মাইনের ভয়
তবে ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রেখে জাহাজ চালানো এই চিত্রের একটি অংশ মাত্র। মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো হরমুজ প্রণালিকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে বিপুল পরিমাণ তেল পরিবহনের বিকল্প উপায় খুঁজে বের করেছে। এর ফলে তেলের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে ইরানের যে সক্ষমতা রয়েছে, তা অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে। সৌদি আরব প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল পারস্য উপসাগরে ট্যাঙ্কারে বোঝাই করার পরিবর্তে তাদের ‘ইস্ট-ওয়েস্ট’ পাইপলাইনের মাধ্যমে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে পাঠিয়ে দিচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য উৎপাদক দেশগুলো হরমুজ প্রণালিকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে প্রতিদিন আরো ২০ লাখ ব্যারেল তেল ভিন্ন পথে পাঠাচ্ছে।
তেলের বাজার স্বাভাবিক রাখতে বিশ্বের অন্য অঞ্চলের তেল উৎপাদকরা এই সময়ে তাদের উৎপাদন বাড়িয়েছে। ব্রাজিল, গায়ানা এবং ভেনেজুয়েলা একত্রে প্রতিদিন ১০ লাখ ব্যারেলেরও বেশি অতিরিক্ত তেল উৎপাদন করছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদিন আরো কয়েক লাখ ব্যারেল তেল বাজারে যুক্ত করেছে। এভাবেই যুদ্ধের বহুমাত্রিক অভিঘাত সত্ত্বেও বিশ্ববাজারে তেলের দাম এখনো সহনীয় পর্যায়েই রাখা সম্ভব হয়েছে।











































