মায়ের শত আকুতিতেও গলেনি সন্তানের হৃদয়

কুনালের সাথে তার মায়ের চমৎকার সম্পর্ক ছিল। এখন প্রকাশিত পুরোনো পারিবারিক ভিডিওতে দেখা ‍যাচ্ছে, কুনাল তার মায়ের সঙ্গে বসে চা খাচ্ছে।মা-ছেলের হাসিমুখের সেই সুন্দর মুহূর্তের ছবি দেখে অনেকের চোখেই পানি এসেছে। কিন্তু যাদের ভিডিও তারা আর দেখার জগতে নেই। আরেকটি ভিডিওতে তেখা যায় মা সঙ্গীতার পা ধুয়ে আশীর্বাদ নিচ্ছে কুনাল।

মায়ের প্রতি যার এত ভালোবাসা, এত শ্রদ্ধা; সেই মায়ের শত আকুতি, শত আহাজারিতেও গলেনি কুনালের পাষাণ হৃদয়।একটি আইফোন অথবা বাবার প্রতি তীব্র অভিমান কুনালের হৃদয়কে পাথর করে তুলেছিল। শুক্রবার দুপুরে ছেলের জেদ বা অভিমানের কাছে হার মেনে পুরো পরিবারটিই হারিয়ে যায় পাহাড়ের খাদে। ঘটনাটি ভারতের মহারাষ্ট্রের ছত্রপতি সম্ভাজিনগর জেলার।

মুরলীধর চন্দগুড়ে আর সঙ্গীতা চন্দগুড়ে দম্পতির একমাত্র সন্তান ১৮ বছর বয়সী কুনাল চন্দগুড়ে।অর্থের প্রাচুর্য্য না থাকলেও চন্দগুড়ে পরিবারে সুখের কমতি ছিল না।

প্রকাশিত ভিডিওতে মা-ছেলের ছবি দেখে বোঝা যায়, আর ১০টা ভারতীয় নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের মত সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, মান-অভিমান নিয়ে ভালোই ছিল চন্দগুড়ে পরিবারটি। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন মুরলীধর। পেশায় তিনি ছিলেন গাড়ি চালক। সংসারকে ভালো রাখতে, স্ত্রী-সন্তানের মুখে হাসি ফোটাতে উদয়াস্ত পরিশ্রম করতেন মুরলীধর।কুনাল হয়তো বাবার কষ্টটা দেখেনি বা মুরলীধর দেখাতে চাননি। চাইলে কুনাল হয়তো বুঝতো, একটি আইফোন তার বাবার সামর্থ্যের অনেক বাইরে। কুনাল কিস্তিতে একটি আইফোন ১৫ কিনেছিলেন। বাবার কাছে কিস্তির টাকা চাইতে গেলেই বেধে যায় তর্ক। বাবা হয়তো তার সামর্থ্যের সীমাটা ছেলেকে বোঝাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু অবুঝ অভিমানী টিনেজার কুনাল কিছুই বুঝতে চায়নি। 
বাবার সাথে তুমুল তর্কের পর শুক্রবার সকাল ১০টার দিকে রাগান্বিত কুনাল ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায় এবং ওয়ালুজ এমআইডিসি থানা এলাকার তিসগাঁও অঞ্চলের একটি পাহাড়ে চড়ে বসে। তার বাবা-মাও তাকে অনুসরণ করে সেখানে যান এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে নিয়ে প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে তাকে নিচে নেমে আসার জন্য বোঝানোর চেষ্টা করেন।

খবর পেয়ে পুলিশ ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরাও ঘটনাস্থলেও আসেন। কিন্তু কারো কথাই শোনেননি কুনাল। দুপুর ১টার দিকে, অর্থাৎ কুনালের পাহাড়ে চড়ে বসার প্রায় তিন ঘণ্টা পর, কুনালের বাবা মুরলীধর চন্দগুড় তার ছেলে যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল সেখানে উঠে যান এবং তাকে প্রান্তসীমা থেকে জোরপূর্বক টেনে পেছনে আনার চেষ্টা করেন। এই প্রক্রিয়ায় বাবা ও ছেলে দুজনেই ভারসাম্য হারিয়ে ২৫০ ফুট নিচের গিরিখাদে পড়ে যান। স্বামী ও সন্তানকে পড়ে যেতে দেখে মুহূর্তের মধ্যে কুনালের মা সঙ্গীতাও পাহাড় থেকে লাফিয়ে পড়েন। পৃথিবীর মানচিত্র থেকে হারিয়ে যায় একটি পরিবার।

সবাই মিলেই কুনালকে ৩ ঘণ্টা ধরে বোঝানোর চেষ্টা করেন। অনেকে সবাই মিলে আইফোন ১৫ প্রো কিনে দেয়ার অঙ্গীকার করেন। তাকে মায়ের জন্য বাঁচার জন্য অনুরোধ করেন। একমাত্র ছেলেকে বাঁচাতে বাবা মরিয়া হয়ে চেষ্টা করেছিলেন। মা সঙ্গীতাও ছেলের কাছে কাকুমি-মিনতি করেছিলেন। সব আবদার পূরণের আশ্বাস দিয়েছিলেন।

একটি ভিডিওতে দেখা যায়,  সঙ্গীতা কাকুতি-মিনতি করছেন, কাঁদছেন এবং কুনালকে টেনে পিছনের দিকে আনার জন্য সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন।

ক্লিপটিতে দেখা যায়, কুনাল পাহাড়ের একদম প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে এবং সঙ্গীতা মাত্র কয়েক ফুট দূরে মাটিতে বসে কাঁদছেন। তিনি কুনালকে পাহাড়ের প্রান্ত থেকে তাঁর দিকে এবং বিপদ থেকে দূরে সরে আসার জন্য রাজি করানোর চেষ্টা করছেন। এরপর তিনি তাঁর ছেলের সামনে মাটিতে উপুড় হয়ে মিনতি করেন। কিন্তু তাতেও যখন কোনো কাজ হয় না, তখন তিনি উঠে দাঁড়িয়ে তাঁর দিকে এগিয়ে যান এবং নিজের হাত বাড়িয়ে দেন। কুনাল তখন পাহাড়ের প্রান্তের দিকে আরও এক পা বাড়ায়, দেখে ভয় পেয়ে ’এই কুনাল’ বলে তাড়াহুড়ো করে পিছিয়ে আসেন সঙ্গীতা। এরপর তিনি পাহাড়ের অন্য একটি প্রান্তে চলে যান, যেন নিজেই সেখান থেকে লাফ দেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন। তাতেও মন গলেনি ছেলের। কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থাকা কিছু মানুষ সঙ্গীতাকে টেনে পেছনে নিয়ে আসেন। সঙ্গীতা বারবার কুনালকে আশ্বস্ত করেছিলেন, তার যেকোনো সমস্যা সমাধানে তারা সাহায্য করবেন। কিন্তু সে কোনো কথা শোনেনি। কুনাল তার মাকে বলেছিল, ’মা, আমার কথা কেউ শোনে না। আমার বেঁচে থাকার কোনো ইচ্ছে নেই। আমার জীবনের কোনো সমাধান নেই। কোনো কিছুই ভালো হতে যাচ্ছে না।’

ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা পাহাড়ের নিচে একটি নিরাপত্তাজাল বসিয়েছিলেন। কিন্তু কুনাল পাহাড়ের চূড়ায় এক জায়গায় স্থির না থেকে অনবরত তার অবস্থান পরিবর্তন করছিল। তাকে বাঁচাতে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরাও বারবার জালের অবস্থান পরিবর্তন করছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, বাবা ও ছেলে যখন ভারসাম্য 
হারিয়ে নিচে পড়েন, তখন তারা নিরাপত্তাজালের সীমানার বাইরে অন্য একটি জায়গায় গিয়ে আছড়ে পড়েন। 

স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, পরিবারটি মাস চারেক আগে ঝালতা গ্রামের একদন্ত নগর এলাকায় আসে। একমাত্র সন্তান আর একটি পোষা কুকুর নিয়ে পরিবারটি নিজেদের মতই থাকতো। পোষা কুকুরটি তাদের পরিবারেরই অংশ ছিল। সবার সাথে তার দারুণ বন্ধন ছিল। একজন প্রতিবেশী বলেন, ‘পোষা কুকুরটি এখনো ঘরে অপেক্ষা করছে এই আশায় যে তার পরিবার ফিরে আসবে। সে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে এবং একটুও নড়াচড়া করেনি।’

LEAVE A REPLY