ছবি : এআই জেনারেটেড
যেকোনো কিছুই অতিরিক্ত হয়ে গেলে তা আর উপভোগ্য থাকে না। খাবারের শেষ বাড়তি টুকরোটি হোক কিংবা একটানা অতিরিক্ত সময় ধরে চলা কোনো বিনোদন—সীমারেখা অতিক্রম করলে আনন্দটাও অস্বস্তিতে পরিণত হয়।জীবনযাত্রায় এই অতিরিক্তের প্রতিযোগিতা পেরিয়ে কীভাবে ‘যথাযথ’ বা পরিমিতিবোধ বজায় রেখে সুখী হওয়া যায়, সুইডিশ জীবনদর্শন ‘লাগোম’ আমাদের সেই পথই দেখায়।
‘লাগোম’ কী এবং এর মূল চেতনা
সুইডিশ শব্দ ‘লাগোম’-এর মূল অর্থ হলো ‘যথাযথ পরিমাণ’ বা ‘না খুব কম, না খুব বেশি’। এটি মূলত এমন এক জীবনবোধ, যা মানুষকে অতিরিক্তের পেছনে না ছুটে বর্তমানের পর্যাপ্ত সম্পদে সন্তুষ্ট হতে শেখায়। বিলাসবহুল জীবনযাপন কিংবা চরম অভাব—দুটির মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে প্রয়োজনীয় সবকিছু নিয়ে শান্তিতে বেঁচে থাকার নামই লাগোম।সংক্ষেপে বলতে গেলে, এটি জীবনের সার্বিক ভারসাম্য ও আত্মতৃপ্তির একটি বিজ্ঞানভিত্তিক ও ব্যবহারিক চর্চা।
লাগোম মূলত দুটি বিশেষ ধারণার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে :
সামাজিক সচেতনতা ও ন্যায্যতা : আমাদের আচরণ বা ব্যবহার যেন অন্যের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব না ফেলে, লাগোম সেই শিক্ষা দেয়। যেমন—কোনো অনুষ্ঠানে নিজের দরকারের চেয়ে বেশি খাবার বা সুবিধা হস্তগত করলে তা অন্যের জন্য ঘাটতি তৈরি করে। পরিমিত আচরণের মাধ্যমে সবার অধিকার রক্ষা করাই লাগোমের সামাজিক দিক।
মানসিক সন্তুষ্টি ও মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন : সমাজ যেখানে ‘যত বেশি, তত ভালো’ নীতিতে বিশ্বাসী, লাগোম সেখানে শেখায় কমের মধ্যেই পূর্ণতা। অতিরিক্ত টাকা, বড় বাড়ি বা প্রাচুর্যই যে সুখের একমাত্র মানদণ্ড নয়, তা অনুধাবন করা। উদাহরণস্বরূপ, বন্ধুর সাথে টং এর দোকানে এক কাপ চা পানের খাওয়ার আনন্দ; কোনো দামি ক্যাফেতে বসে কফি পানের চেয়ে দশগুণ আনন্দের।
দৈনন্দিন জীবনে লাগোম প্রয়োগের উপায়
সুইডিশদের এই কার্যকর জীবনদর্শন আমরাও দৈনন্দিন জীবনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সহজে প্রয়োগ করতে পারি :
কর্মজীবন ও ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্য : কাজের অতিরিক্ত চাপ যেমন জীবনকে একঘেয়ে করে তোলে, তেমনি কাজকে অবহেলা করলেও ক্ষতি হয়। সুইডিশরা কাজের ফাঁকে নিয়ম করে বিরতি নেয় এবং কর্মক্ষেত্রের বাইরে নিজের পরিবার ও শরীরকে সময় দেয়।জীবনকে সর্বাঙ্গীণ সুন্দর করতে এই ভারসাম্য রক্ষা করা জরুরি।
ব্যায়াম ও ফিটনেস : ফিট থাকার জন্য দামী জিম মেম্বারশিপ বা দামি সরঞ্জামের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। সাধারণ পোশাকে নিয়মিত হাঁটা, বাগান করা, কিংবা ঘরে বসে সাধারণ ব্যায়ামের মাধ্যমেই শরীর সুস্থ রাখা সম্ভব। যা পুরোপুরি ‘লাগোম’-এর অন্তর্ভুক্ত।
বিনোদনে পরিমিতি ও ঘরে থাকার আনন্দ: আনন্দ পেতে সবসময় বিপুল অর্থ খরচ করে দূরে কোথাও ভ্রমণ করার প্রয়োজন পড়ে না। কম খরচে ঘরে তৈরি খাবার আর পছন্দের কোনো সিনেমা বা আড্ডাতেই চমৎকার সময় কাটানো সম্ভব।
‘লাগোম’ আমাদের শেখায় কিভাবে জীবনকে জটিল না করে সাধারণ আনন্দের মাঝে শান্তি খুঁজে পাওয়া যায়। সাধারণ জিনিস উপভোগ করা মানেই মানুষ হিসেবে সাধারণ হয়ে যাওয়া নয়, বরং অতিরিক্ত চাহিদার মানসিক চাপ থেকে নিজেকে মুক্ত রেখে শান্তিময় জীবন গড়ে তোলাই হলো লাগোমের মূল বার্তা।










































