‘চোকার’ তকমা ঝেড়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন বাভুমার দল যেন উড়ছেই

প্রায় তিন দশক ধরে প্রতিটি আইসিসি ইভেন্টে দক্ষিণ আফ্রিকার যাত্রা শেষ হয়েছে একেকটা হতাশায়। ১৯৯২ সাল, যখন অপরাধবোধ ও অবরোধের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে প্রোটিয়ারা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফিরল, তখন বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয়ের দোরগোড়ায় ছিল তারা, শেষদিকে ১৩ বলে দরকার ছিল ২২ রান। ঠিক তখনই নেমে এলো বৃষ্টির বাগড়া। আর সেই বৃষ্টির ভাগ্য বিপক্ষে গেল প্রোটিয়াদের।

কিন্তু বৃষ্টির অদ্ভুত নিয়মে শেষ বলে ২১ রান দরকার হওয়ায় শেষ হয়ে যায় স্বপ্ন।

১৯৯৯ সালে আবারও প্রায় হাতের মুঠোয় ছিল ফাইনাল। ল্যান্স ক্লুসনার দুই বলে দুই চার মেরে ম্যাচ জেতানোর অবস্থায় নিয়ে গেছেন, ঠিক পরের বলে ক্লুজনারের অদ্ভুত দৌড়ের বিপরীতে বলের দিকে তাকিয়ে থেকে ডোনাল্ডের অসহায়ত্ব রান-আউট দক্ষিণ আফ্রিকাকে ফের হতাশার গহ্বরে ঠেলে দেয়।

২০০৩ বিশ্বকাপের ভুল হিসাব তো ক্রিকেট ইতিহাসের এক তিক্ত স্মৃতি।

 শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে বৃষ্টিবিঘ্নিত ম্যাচে লক্ষ্য এক রান ভুল হিসাব করে আগেভাগে উদ্‌যাপন করেন মার্ক বাউচার। আর তার ফল, নিজেদের ঘরের বিশ্বকাপ থেকেই বিদায়। সেই দংশন তাদের তাড়া করে বেড়িয়েছে বহু বছর।

তারপরও একই গল্প, ২০১৫, ২০১৯, ২০২৩, যখনই সেমিফাইনাল, তখনই হোঁচট।

টি-টোয়েন্টিতেও ছবিটা বদলায়নি। ‘চোকার’ তকমা তাই তাদের কাঁধে যেন চেপেই ছিল। ২০২৪ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে এইডেন মারক্রামের দল যখন ফাইনালে উঠল, তখন অনেকেই ভাবল এবার বুঝি সেই চোকার তকমা ঝেড়ে ফেলার সময় হয়েছে। কিন্তু এবারও বিধি বাম। রোহিত শর্মার ভারতের কাছে হেরে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে রানার্স আপ ট্রফি নিয়ে।

কিন্তু দীর্ঘ হতাশার পর অবশেষে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজেদের ভাগ্য বদলে ফেলেছে দক্ষিণ আফ্রিকা। ২০২৩-২৫ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ের পর ভারত সফরে এসে টেম্বা বাভুমার দল ২-০ ব্যবধানে ভারতকে হারিয়ে নতুন ইতিহাস লিখেছে।  গুয়াহাটিতে ৪০৮ রানের জয় নতুন করে ব্যাখ্যা দিচ্ছে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রভাবশালী উত্থানকে।

গত ৩২ বছরে ৮টি বিশ্বকাপে সেমির (২০২৪ ফাইনাল) ব্যর্থতা নিয়ে ‘চোকার’ তকমাকে বুকে বয়ে বেড়াতে হয়েছে প্রোটিয়াদের। কিন্তু গত ১৮ মাসে নিঃশব্দ প্রস্তুতি, স্পষ্ট পরিকল্পনা ও দৃঢ় নেতৃত্বে দক্ষিণ আফ্রিকা বদলে দিয়েছে নিজেদের ক্রিকেটীয় পরিচয়। লর্ডসে অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর পর ভারত জয় যেন সেই রূপান্তরের সিলমোহর।

বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়শিপ জিতে খরা কাটানোর পর ভারতকে ২-০ হারানো ক্রিকেটের মানচিত্র নতুন করে এঁকে দিয়েছে। বহুদিন ধরে ভারত ছিল ক্রিকেটের শেষ সীমান্ত। স্পিনিং ট্র্যাক, ব্যাটিং গভীরতা এবং ঘরের মাঠে অপ্রতিরোধ্য আধিপত্যের দুর্গ। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়ে ভারতে এসে ৪০৮ রানের লজ্জাজনক সবচেয়ে বড় টেস্ট হার উপহার দেওয়া যেন পুরোনো স্ক্রিপ্ট টুকরো টুকরো করে আগুনে ফেলে দেওয়ার মতোই। 

২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ২৫ বছর ধরে কোনো দক্ষিণ আফ্রিকান অধিনায়ক ভারতে টেস্ট সিরিজ জিততে পারেননি। টেম্বা বাভুমা এখন সেই সংক্ষিপ্ত তালিকায় হ্যান্সি ক্রনিয়ের পাশে। তার থেকেও বড় কথা, শেষ ১২ টেস্টে বাভুমা অধিনায়ক হিসেবে অপরাজিত।

ভারতে বাভুমাকে নিয়ে ‘বাউনা’ মন্তব্য ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। দক্ষিণ আফ্রিকার কোচ শুকরি কনরাডের ‘গ্রোভেল’ মন্তব্যেও উত্তাপ ছড়ায়। তবে বাভুমা জানেন জবাব কিভাবে দিতে হয়। চ্যাম্পিয়নদের অস্ত্র ঠিকই জবাব খুঁজে নেয়। কলকাতা ও গুয়াহাটির ইনিংসই তার প্রমাণ।

দশকের পর দশক দক্ষিণ আফ্রিকার কোটা নীতিকে ভারত-অস্ট্রেলিয়ায় তুলে ধরা হয়েছে ‘রাজনীতি ঢোকানো’ ক্রিকেটের উদাহরণ হিসেবে। কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড়ের একদিনের বাজে ফর্ম মানেই ‘ট্রান্সফরমেশন’, এমন অলস যুক্তি দেওয়া হয়েছে বছরের পর বছর। অথচ শ্বেতাঙ্গ খেলোয়াড়ের ব্যর্থতা মেনে নেওয়া হয়েছে ‘খারাপ দিন’ হিসেবে।

এই দক্ষিণ আফ্রিকা দল এখন বিশ্বকে আয়না ধরছে। তারা এবার প্রমাণ করেছেন মাঠের পারফরম্যান্সই শেষ কথা, কৃষ্ণাঙ্গ অধিনায়ক, কৃষ্ণাঙ্গ পেসার, মিশ্রবর্ণ কোচ এবং বৈচিত্র্যময় ব্যাটিং লাইন-আপ নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা এখন টেস্টের চূড়ায়। সময়ের সাথে গড়ে ওঠা পাইপলাইন এত শক্তিশালী হয়েছে যে কোটা-নীতি এখন আর একাদশ নির্বাচনেই প্রাসঙ্গিক নয়। এবং এটাই তো লক্ষ্য ছিল।

আর্থিক টানাপড়েন, দেশীয় কাঠামোর দুর্বলতা ও ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে খেলোয়াড় হারানোর ঝুঁকি, এসব সত্ত্বেও বাভুমা-কনরাড যুগে গড়ে উঠেছে একটি সুসংহত টেস্ট একাদশ। ৩৫ বছর বয়সী স্টিভ হার্মারের প্রত্যাবর্তন ও সিরিজ সেরা পারফরম্যান্স তাদের সেই পরিকল্পনায় যেন পূর্ণতা দিয়েছে।

LEAVE A REPLY