অগ্রগতি নেই ধর্ষণ মামলায়

ধর্ষণ মামলার আসামি না পাওয়ায় সম্পূর্ণ হচ্ছে না ডিএনএ পরীক্ষা। আসামির ডিএনএ নমুনা না পাওয়ায় অনেক মামলায় পরীক্ষা অসম্পূর্ণই থেকে যাচ্ছে। তাদের গ্রেপ্তার করতে না পারায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। পলাতক আসামিদের কারণে অনেক ধর্ষণ মামলার সুরাহা করা যাচ্ছে না।

দিনের পর দিন ঝুলে থাকছে ধর্ষণ মামলা। তবে ধর্ষণের শিকার ব্যক্তির এবং আলামতের ডিএনএ পরীক্ষা হয়।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) হিসাবে, তাদের ডিএনএ ল্যাবে এ পর্যন্ত আসা ধর্ষণ মামলার নমুনার প্রায় ২০ শতাংশ ক্ষেত্রে আসামিদের পাওয়া যাচ্ছে না। আর মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের অধীনে থাকা ন্যাশনাল ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবের হিসাবে এই হার আরো বেশি।

আমাদের দেশে ডিএনএ (ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড) পরীক্ষার জন্য কেবল এ দুটিই ল্যাবরেটরি আছে। এর মধ্যে সিআইডির ল্যাবে নমুনা জমা এবং পরীক্ষা সম্পন্ন হওয়ার হার বেশি।

কিন্তু আসামির ডিএনএ নমুনা না পাওয়া গেলে কী হবে? এ প্রশ্নটির উত্তর এখনো পরিষ্কার নয়। এতে ভুক্তভোগীরাও হতাশ।

জানা গেছে, ডিএনএ হচ্ছে একজন ব্যক্তির বংশগতির মৌলিক উপাদান। দুজন মানুষের ডিএনএ প্রোফাইল কখনো এক হয় না। এমনকি কিছু গবেষণা বলছে, হুবহু যমজদেরও ডিএনএ প্রোফাইল হুবহু এক হয় না। ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের সাহায্যে ন্যূনতম জৈবিক নমুনা থেকেও কোনো ব্যক্তিকে শনাক্ত করা যায়। ধর্ষণের ঘটনায় ভুক্তভোগী ও অভিযুক্ত বা সন্দেহভাজন ব্যক্তি এবং অপরাধস্থল থেকে নমুনা সংগ্রহ করে তার ডিএনএ প্রোফাইল করা হয়।

তারপর সেগুলোর তুলনা করে মিল বা অমিল খুঁজে বের করা হয়। জৈবিক নমুনা অর্থাৎ রক্ত, লালা, বীর্য, চুল, মাংসপেশি, হাড় ইত্যাদি ডিএনএর গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। পরীক্ষার জন্য যথাযথভাবে আলামত সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা খুব জরুরি।

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খান জানান, ডিএনএ পরীক্ষার জন্য আসা ধর্ষণ মামলায় আসামিকে গ্রেপ্তারের সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়। তাছাড়া আসামিকে গ্রেপ্তার করতে না পারলে তদন্তও পরিপূর্ণ হয় না। একান্ত যখন আসামি পাওয়া যায় না তখন পারিপার্শ্বিক তথ্য-প্রমাণ দিয়ে চার্জশিট দেওয়া হয়। সিআইডি ও থানা পুলিশ সূত্র জানায়, গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলায় ২০১৯ সালের ১৪ ডিসেম্বর নানাবাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার সময় ধর্ষণের শিকার হয় ১৫ বছরের এক কিশোরী। পূর্বপরিচিত এক তরুণ ও তার দুই বন্ধু মিলে মেয়েটিকে ধর্ষণ করে। পুলিশ আলামত হিসেবে মেয়েটির পোশাক জব্দ করে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য সিআইডির ডিএনএ ল্যাবে পাঠায়। কিন্তু তিন আসামির মধ্যে একজনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করলেও তার ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করেনি। বাকি দুজন আসামি শুরু থেকেই পলাতক। একই বছরের মে মাসে বরিশালের কোতোয়ালি থানায় ৪০ বছর বয়সি এক নারীকে ধর্ষণের মামলা হয়। ওই নারীর ডিএনএ নমুনা সিআইডিতে জমা করা হলেও আসামিরা পলাতক থাকায় তাদের ডিএনএ নমুনা পাওয়া যায়নি।

সিআইডি ফরেনসিক ল্যাব সূত্র জানায়, ২০১৪ সাল থেকে ২০২৫ পর্যন্ত ২৪ হাজার ৪৪৪টি মামলার ডিএনএ পরীক্ষার নমুনা নেওয়া হয়েছে। আলামতের সংখ্যা ৬৬ হাজার ১০০টি। মামলাগুলোর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ২৪ হাজার ২৮১টির। ৬৫ হাজার ৫৪৯টি আলামতের পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। এগুলোর মধ্যে ১৬৩টি মামলা ঝুলে আছে। অভিযুক্তের নমুনা না পাওয়ায় ৫৫১টি আলামতের পরীক্ষা অসম্পূর্ণই রয়ে গেছে।

সিআইডির ল্যাব ও ন্যাশনাল ফরেনসিক ল্যাবে হত্যা, ধর্ষণসহ অপরাধের ঘটনা ছাড়াও বিদেশে অধিবাসী হতে ইচ্ছুক, পিতৃত্ব-মাতৃত্ব প্রমাণ, অজ্ঞাতনামা মৃত ব্যক্তির পরিচয় বের করতে ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়।

মামলায় ডিএনএ বাধ্যতামূলক
ঢাকায় বাসের জন্য অপেক্ষায় থাকা এক নারীকে মাইক্রোবাসে তুলে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। অভিযোগ করার পরও সময়মতো মামলা গ্রহণ ও ডাক্তারি পরীক্ষা না করায় ২০১৫ সালের ২৫ মে কয়েকজন নারী ও মানবাধিকার সংগঠন হাই কোর্টে রিট করে। ২০১৮ সালের ১৮ এপ্রিল হাই কোর্টের বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি কাজী মো. ইজারুল হক আকন্দের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ ধর্ষণের শিকার নারীর বিচারপ্রাপ্তি ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনাসহ পূর্ণাঙ্গ একটি রায় দেন। এই রায়ে বলা হয়, সব প্রকার ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়নের শিকার নারীর ডাক্তারি পরীক্ষার ক্ষেত্রে রাসায়নিক কিংবা ডিএনএ পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। এরপর সরকার ধর্ষণের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০ সংশোধন করে। সংশোধিত আইনে ধর্ষণ মামলার ক্ষেত্রে ডিএনএ পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়।

সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন 

LEAVE A REPLY