ছবি: রয়টার্স
ফিলিপাইনের ভাইস প্রেসিডেন্ট সারা দুতের্তের বিরুদ্ধে আনা অভিশংসন অভিযোগের বিচার শুরু হচ্ছে আজ সোমবার। এ জন্য দেশটির সিনেট অভিশংসন আদালত হিসেবে বসবে।প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়রের সঙ্গে সারা দুতের্তের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিরোধের মধ্যেই এই বিচার শুরু হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ বিচার দেশটির রাজনৈতিক উত্তেজনা আরো বাড়িয়ে দিতে পারে।
বিচার শুরুর আগে রাজধানী ম্যানিলায় সিনেট ভবন ও আশপাশের এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সেখানে ছয় হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।তাদের মধ্যে দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে প্রশিক্ষিত বিশেষ বাহিনীর সদস্যরাও রয়েছেন। কর্তৃপক্ষের আশঙ্কা, বিচার শুরুর দিন সারা দুতের্তের সমর্থক ও বিরোধী- উভয় পক্ষই বিক্ষোভ করতে পারে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের দেখা বিচার-সংক্রান্ত পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিচার শুরুর দিনে সারা দুতের্তে অথবা তার আইনজীবীরা আদালতে উপস্থিত থাকতে পারবেন। পুরো বিচারপ্রক্রিয়া ৯২ দিন চলার কথা রয়েছে।
সারা দুতের্তের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হলে তিনি স্থায়ীভাবে সরকারি যেকোনো পদে দায়িত্ব পালনের অযোগ্য হয়ে যেতে পারেন। এতে ২০২৮ সালে তার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পরিকল্পনাও বড় ধাক্কার মুখে পড়বে। ওই নির্বাচনেই প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়রের ছয় বছরের মেয়াদ শেষ হবে। ভাইস প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অজানা উৎস থেকে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। এছাড়া গোপন রাষ্ট্রীয় তহবিলের অপব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।এ ছাড়া প্রকাশ্যে প্রেসিডেন্ট মার্কোসকে হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। তবে সারা দুতের্তে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। বিচার শুরুর আগে তিনি অভিযোগগুলোর বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রকাশ্যে দিতে রাজি হননি। তাঁর সমর্থকদের দাবি, প্রেসিডেন্ট মার্কোস ও তাঁর রাজনৈতিক মিত্ররা পরিকল্পিতভাবে ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ সিনেট সদস্যদের রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করার চেষ্টা করছেন।
২০২২ সালের নির্বাচনে ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র ও সারা দুতের্তে একই জোট থেকে প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হন। সে সময় ফিলিপাইনের সবচেয়ে প্রভাবশালী দুই রাজনৈতিক পরিবারের সমর্থন একত্রিত করতেই এই জোট গড়ে উঠেছিল। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের সম্পর্কের অবনতি ঘটে এবং দুই পক্ষের মধ্যে প্রকাশ্য রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব শুরু হয়। সারা দুতের্তে সাবেক প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতের্তের মেয়ে। রদ্রিগো দুতের্তে গত বছর আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) নির্দেশে গ্রেপ্তার হন। পরে তাকে নেদারল্যান্ডসের হেগে নেওয়া হয়। বর্তমানে তিনি সেখানেই আটক রয়েছেন। মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আগামী ৩০ নভেম্বর তার বিচার শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
রদ্রিগো দুতের্তের বিরুদ্ধে অভিযোগের মূল ভিত্তি তার প্রেসিডেন্ট থাকাকালে পরিচালিত মাদকবিরোধী অভিযান। ওই অভিযানে হাজার হাজার মানুষ নিহত হন। নিহতদের বেশির ভাগই ছিলেন দরিদ্র এবং সন্দেহভাজন ব্যক্তি। এ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহল, পশ্চিমা দেশ এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। যদিও রদ্রিগো দুতের্তে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অনুমতি দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। সারা দুতের্তের অভিযোগ, তার ৮১ বছর বয়সী বাবাকে গ্রেপ্তার করে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের হাতে তুলে দেওয়ার পেছনে প্রেসিডেন্ট মার্কোসের ভূমিকা রয়েছে। দুই পরিবারের পররাষ্ট্রনীতিতেও বড় পার্থক্য রয়েছে। প্রেসিডেন্ট মার্কোস ক্ষমতায় আসার পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরো জোরদার করেছেন। একই সঙ্গে দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের বাড়তে থাকা তৎপরতার বিরোধিতা করে আসছে তার সরকার।
অন্যদিকে সাবেক প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতের্তে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার হুমকিও দিয়েছিলেন। সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের উপকূলরক্ষী বাহিনী ফিলিপাইনের নৌবাহিনী ও জেলেদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী জলকামান ব্যবহার করলেও সারা দুতের্তে প্রকাশ্যে তার নিন্দা করেননি। এ কারণে তিনি সমালোচনার মুখে পড়েন। গত মাসে ফিলিপাইনের প্রতিনিধি পরিষদে বিপুল ভোটে সারা দুতের্তের বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রস্তাব পাস হয়। প্রতিনিধি পরিষদে প্রেসিডেন্ট মার্কোসের সমর্থকদেরই সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। সারা দুতের্তেকে দোষী সাব্যস্ত করতে ২৪ সদস্যের সিনেটে অন্তত ১৬ জন সিনেটরের সমর্থন লাগবে। অর্থাৎ দুই-তৃতীয়াংশ ভোট পেলেই তিনি দোষী সাব্যস্ত হবেন এবং সরকারি পদে থাকার অধিকার হারাতে পারেন।
এদিকে বিচার শুরুর আগেই দুতের্তে-সমর্থক কয়েকজন সিনেটর আইনি সমস্যায় পড়েছেন। দুতের্তে-ঘনিষ্ঠ সিনেটর জিংগয় এস্ট্রাডাকে গত মাসে একটি বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য দুর্নীতির মামলা হয়েছে। তবে তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। দুতের্তে-সমর্থক আরেক সিনেটর রোদান্তে মারকোলেতার বিরুদ্ধেও দুর্নীতির মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তার বিরুদ্ধে বড় অঙ্কের নির্বাচনী অনুদান গ্রহণ এবং সম্পদের ঘোষণায় সেই অর্থ গোপন করার অভিযোগ আনা হয়েছে। তিনিও কোনো অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এ ছাড়া সাবেক জাতীয় পুলিশপ্রধান ও বর্তমান সিনেটর রোনাল্ড দেলা রোসা আত্মগোপনে রয়েছেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত রদ্রিগো দুতের্তের আমলের হত্যাকাণ্ডে সহঅভিযুক্ত হিসেবে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। দুতের্তের মাদকবিরোধী অভিযান বাস্তবায়নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।











































