সংগৃহীত ছবি
একসময় যে জায়গায় নিজের অসুস্থ মেয়ের জন্য কবর খুঁড়েছিলেন বাবা, আজ সেই জায়গাতেই ফুটছে সূর্যমুখী ফুল। দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের ছোট্ট মেয়ে ঝাং শিনলেইয়ের জীবনের গল্প যেন দুঃখ থেকে আশার এক অসাধারণ যাত্রা।
সিচুয়ান প্রদেশের নেইজিয়াংয়ের শিনলেই জন্ম থেকেই গুরুতর থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত ছিল। এই রোগে আক্রান্তদের নিয়মিত রক্ত দিতে হয়। শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশেও দেরি হতে পারে। পাশাপাশি হৃদ্যন্ত্রের নানা জটিলতার ঝুঁকিও থাকে।অসুস্থতার কারণে ছোটবেলায় শিনলেই অনেকটাই একা হয়ে পড়েছিল। সে প্রায়ই নিজের কুকুরছানার সঙ্গে খেলত। কখনো আবার প্রতিবেশীর বালুর স্তূপে খেলেই সময় কাটত। শিনলেইয়ের বাবা ঝাং লিইয়ং একটি কাচ কারখানায় কাজ করতেন।তার মাসিক আয় ছিল মাত্র ২ হাজার ৫০০ ইউয়ান। অথচ মেয়ের চিকিৎসায় দুই বছরে খরচ হয়ে যায় ১ লাখ ৪০ হাজার ইউয়ানের বেশি। গ্রামের মানুষের সহায়তা পেলেও পরিবারের প্রায় সব সঞ্চয় শেষ হয়ে যায়।
২০১৭ সালের জুনে একসময় অসহায় বাবা মেয়ের জন্য নিজেদের জমিতে একটি কবর খুঁড়ে ফেলেন। সেখানে তিনি শিনলেইয়ের পাশে বসতেন, তার সঙ্গে খেলতেন।তিনি জায়গাটিকে মেয়ের ‘শেষ বিশ্রামের জায়গা’ বলতেন। বাবার ধারণা ছিল, কবরটির সঙ্গে পরিচিত হয়ে গেলে শিনলেই হয়তো মৃত্যুকে আর ভয় পাবে না। মেয়ের চিকিৎসার জন্য সাহায্য চেয়ে কবরের পাশে একটি সাইনবোর্ডও লাগিয়েছিলেন তার মা। ঘটনাটি জানাজানি হলে মানুষের মধ্যে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। কেউ পরিবারটির প্রতি সহানুভূতি দেখান, আবার কেউ বাবার এমন সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন। কেউ কেউ মনে করেন, মেয়ের কষ্টকে প্রচারের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে শেষ পর্যন্ত এই ঘটনা দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। শিনলেইয়ের চিকিৎসার জন্য অর্থ সংগ্রহ শুরু হয়। স্থানীয় সরকারও তার চিকিৎসার বড় একটি অংশের খরচ বহন করে। এরপর আসে জীবনের সবচেয়ে বড় মোড়।
২০১৭ সালের আগস্টে শিনলেইয়ের ছোট বোন জন্ম নেয়। তার নাড়ির রক্ত সংরক্ষণ করা হয়। পরে সেই নাড়ির রক্ত থেকে স্টেম সেল নিয়ে শিনলেইয়ের প্রতিস্থাপন করা হয়। প্রায় আট ঘণ্টার এই চিকিৎসাকেই তার জন্য সম্ভাব্য কার্যকর চিকিৎসা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। দীর্ঘ চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের পর ধীরে ধীরে শিনলেই সুস্থ হয়ে ওঠে। তার রক্ত পরীক্ষার ফল স্বাভাবিক আসে। এরপর তাকে আর প্রতি মাসে রক্ত দিতে হয়নি। শুধু নিয়মিত চিকিৎসার প্রয়োজন ছিল।
আজ সেই ছোট্ট মেয়েটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ে। সে এখন হাসিখুশি। ছবি আঁকা ও নাচতে ভালোবাসে। পড়াশোনাতেও ভালো করছে। আর যে জায়গায় একদিন তার বাবা কবর খুঁড়েছিলেন, সেটিই এখন বদলে গেছে সূর্যমুখীর বাগানে। শিনলেইয়ের মা আদর করে জায়গাটির নাম দিয়েছেন ‘জাদুর বাগান’। তার বিশ্বাস, এই বাগান পরিবারের জন্য সৌভাগ্য বয়ে আনবে। সম্প্রতি শিনলেইয়ের গল্প আবারও অনলাইনে ছড়িয়ে পড়েছে। তাকে নিয়ে মানুষের আবেগও নতুন করে সামনে এসেছে।
একজন লিখেছেন, মেয়েটি একবার যেন কবরে গিয়েও ফিরে এসেছে। সেই দুঃসময় এখন অতীত। সামনে তার জন্য অপেক্ষা করছে সুন্দর একটি জীবন। আরেকজনের মন্তব্য, সারা বছরের খবরের মধ্যে এটি সবচেয়ে ভালো খবরগুলোর একটি। তার মতে, সামাজিক সহায়তার সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো- যখন তা একটি শিশুকে নতুন জীবন পাওয়ার সুযোগ করে দেয়। শিনলেইয়ের গল্প শুধু একটি শিশুর সুস্থ হয়ে ওঠার গল্প নয়। এটি এক বাবার অসহায় ভালোবাসা, মানুষের সহায়তা আর শেষ পর্যন্ত আশার জিতে যাওয়ার গল্প।
২০২০ সালের একটি সরকারি প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চীনে মাঝারি থেকে গুরুতর থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ। ২০১৫ সাল থেকে দেশটির কর্তৃপক্ষ দক্ষিণ চীনের থ্যালাসেমিয়ার ঝুঁকিপূর্ণ প্রদেশগুলোতে রোগ প্রতিরোধ কর্মসূচি চালু করেছে। এর মধ্যে গর্ভাবস্থায় পরীক্ষা এবং চিকিৎসায় ভর্তুকির ব্যবস্থা রয়েছে। দক্ষিণ চীন থ্যালাসেমিয়ার জন্য একটি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। এর প্রধান কারণগুলোর একটি হলো ম্যালেরিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত দীর্ঘদিনের বিবর্তনগত চাপ। এর পাশাপাশি ভৌগোলিক, জলবায়ু ও জনসংখ্যাগত কারণও এর পেছনে ভূমিকা রাখে।











































