দেশে নিবন্ধিত অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৩২২। এর মধ্যে বর্তমানে সক্রিয় ২৫৮টি।কিন্তু এসব সক্রিয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র ৩০টি শীর্ষ কম্পানি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মানদণ্ড মেনে সিংহভাগ মানসম্মত ওষুধ উৎপাদন করছে। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১০০টি উৎপাদন কারখানা রয়েছে।
অন্যদিকে মানহীন ও অপ্রয়োজনীয় ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি বাড়ানোর কথা জানিয়েছে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (ডিজিডিএ)। রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উৎপাদন থেকে বাজারজাতকরণ, পরিবহন, সংরক্ষণ ও ব্যবহারের প্রতিটি ধাপে তদারকি জোরদারের কথাও বলা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) বিশ্ব রোগী নিরাপত্তা দিবস ২০২৬ উপলক্ষে ঢাকায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এসব তথ্য ও পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মো. আলমগীর হোসেন।
এবারের বিশ্ব রোগী নিরাপত্তা দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল ‘অসংক্রামক ব্যাধির নিরাপদ চিকিৎসা’। এ উপলক্ষে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের ফার্মাকোভিজিল্যান্স বিভাগের উদ্যোগে র্যালি, আলোচনাসভা, মুক্ত আলোচনা ও কিউআর কোডভিত্তিক কুইজের আয়োজন করা হয়।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, দেশে নিবন্ধিত ৩২২টি অ্যালোপ্যাথিক কম্পানির মধ্যে ২৫৮টি সক্রিয়।এর মধ্যে প্রায় ৩০টি শীর্ষ কম্পানি ডব্লিউএইচওর মানদণ্ড অনুসরণ করে সিংহভাগ মানসম্মত ওষুধ উৎপাদন করছে।
তিনি বলেন, মানহীন ও অপ্রয়োজনীয় ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে। দেশে উৎপাদিত ওষুধের মান নিয়ে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
ডিজিডিএর পক্ষ থেকে জানানো হয়, ওষুধের গুণগত মান, নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে কাঁচামাল বা এপিআই থেকে শুরু করে প্রস্তুত ওষুধ পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে পরীক্ষা করা হচ্ছে। রাসায়নিক অপদ্রব্য ও বিষাক্ততার বিষয়ও পরীক্ষার আওতায় রয়েছে।
এ ছাড়া স্থানীয় বাজারের ওষুধের কার্যকারিতা ও বায়োইকুইভ্যালেন্স পরীক্ষার বাধ্যবাধকতা আরো জোরদারের প্রক্রিয়া চলছে। বলেও জানানো হয়।
প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিকে কঠোরতা
দেশে দুই লাখের বেশি ফার্মেসি রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় এক লাখ ৮৫ হাজার নিবন্ধিত বলে অনুষ্ঠানে জানানো হয়। অনুমোদনহীন ও লাইসেন্সবিহীন ফার্মেসি বন্ধে অভিযান জোরদারের কথা জানিয়েছে ডিজিডিএ।
অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বা জীবাণুর ওষুধ প্রতিরোধী হয়ে ওঠা ঠেকাতে প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি বন্ধে ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি কার্যকর করার কথাও জানানো হয়।
ডিজিডিএ মহাপরিচালক বলেন, ওষুধ সাধারণ ভোগ্যপণ্য নয়। চিকিৎসকের পরামর্শ ও প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি বন্ধ করতে হবে।
অনুষ্ঠানে বলা হয়, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ক্যান্সার ও দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগের মতো অসংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত রোগীদের দীর্ঘদিন এবং অনেক ক্ষেত্রে একাধিক ওষুধ সেবন করতে হয়। ফলে ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও একাধিক ওষুধের পারস্পরিক প্রতিক্রিয়া নজরদারি করা জরুরি।
বাজারজাত হওয়ার পর কোনো ওষুধে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিলে তা দ্রুত শনাক্ত, বিশ্লেষণ ও ঝুঁকি মূল্যায়নের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ফার্মাকোভিজিল্যান্স কার্যক্রম জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
ডিজিডিএর পরিচালক (ফার্মাকোভিজিল্যান্স) ড. মো. আকতার হোসেন বলেন, বিরূপ ওষুধ প্রতিক্রিয়ার তথ্য দ্রুত রিপোর্ট করা গেলে সম্ভাব্য ঝুঁকি শনাক্ত করে রোগীর নিরাপত্তা বাড়ানো সম্ভব। এ জন্য চিকিৎসক, নার্স, ফার্মাসিস্ট, শিক্ষাবিদ, ওষুধশিল্প ও রোগীদের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে।
কারখানা থেকে রোগীর হাতে—নজরদারি
ডিজিডিএর মহাপরিচালক বলেন, নিরাপদ ও কার্যকর ওষুধ নিশ্চিত করা তাদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। উৎপাদনের পাশাপাশি পরিবহন ও সংরক্ষণেও আন্তর্জাতিক নির্দেশনা অনুসরণ করা হচ্ছে। সঠিক তাপমাত্রায় ওষুধ পরিবহন ও বিতরণ নিশ্চিত করতে জিডিপি ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
হাসপাতাল ও ফার্মেসিতে পেশাদার ফার্মাসিস্ট যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরা হয়। বিশেষ করে কিডনি ও লিভারের রোগীদের ক্ষেত্রে রোগীর অবস্থা অনুযায়ী সঠিক মাত্রায় ওষুধ প্রয়োগ এবং রোগীকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
ওষুধ ও প্রসাধনী আইন ২০২৩ অনুযায়ী ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের ফার্মাকোভিজিল্যান্স ও বিরূপ প্রতিক্রিয়ার তথ্য রিপোর্ট করার আইনি বাধ্যবাধকতা আরো জোরদার করার কথা জানানো হয়। একই সঙ্গে ওষুধের প্যাকেটে সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার পূর্ণাঙ্গ তথ্য দেওয়ার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব সালমা সিদ্দিকা মাহতাব, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. সেলিম রেজাসহ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, নিপসম, জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, আইসিডিডিআর,বি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, চিকিৎসক, ফার্মাসিস্ট, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, ওষুধ উৎপাদনকারী ও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।








































