এআই জানবে আমাদের মনের কথাও, বদলে দেবে কি মানুষের সম্পর্ক?

সংগৃহীত ছবি

মন খারাপ হলে আমরা বন্ধুকে ফোন করি, সম্পর্কের সমস্যায় কাছের মানুষের পরামর্শ নিই। কিন্তু ভবিষ্যতে সেই জায়গায় যদি এমন এক প্রযুক্তি আসে, যে শুধু আমাদের কথা শুনবে না, আগের কথাও মনে রাখবে, অভ্যাস বুঝবে এবং প্রয়োজনের আগেই পরামর্শ দেবে?

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পরবর্তী ধাপের এআই এজেন্টকে ঘিরে এমন সম্ভাবনাই তৈরি হচ্ছে।চ্যাটবট যেখানে মূলত প্রশ্নের উত্তর দেয় বা কথোপকথন চালায়, এআই এজেন্ট সেখানে নির্দিষ্ট লক্ষ্য পূরণে একাধিক ধাপের কাজ করতে পারে, আগের তথ্য মনে রাখতে পারে, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে পারে এবং প্রয়োজন হলে নিজে থেকেই পদক্ষেপ নিতে পারে।

সাইকোলজি টুডেতে ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট মারিয়ানে ব্র্যান্ডন লিখেছেন, থেরাপিস্টরা যখন চ্যাটবট নিয়ে আলোচনা শুরু করছেন, তখন এআই এজেন্ট ইতিমধ্যে বাস্তব জগতে চলে এসেছে। তার মতে, এখনকার চ্যাটবটকে কয়েক বছরের মধ্যে অনেকটাই পুরোনো প্রযুক্তি মনে হতে পারে।

চ্যাটবট শুধু কথা বলে, এজেন্ট কাজও করে

ব্র্যান্ডন নিজের একটি অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেছেন।ওয়েবসাইট নতুন করে সাজাতে তিনি এআই এজেন্ট ব্যবহার করেন। তার দাবি, মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এজেন্ট ওয়েবসাইটের সমস্যা চিহ্নিত করে ঠিক করে এবং প্রয়োজনীয় পরিবর্তনও করে দেয়।

এই অভিজ্ঞতাই তাকে চ্যাটবট ও এআই এজেন্টের পার্থক্য বুঝিয়েছে। চ্যাটবট কোনো বিষয়ে ধারণা বা উত্তর দিতে পারে।কিন্তু এআই এজেন্ট একটি লক্ষ্য ধরে একাধিক কাজ সম্পন্ন করতে পারে এবং আগের ঘটনা মনে রেখে পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে পারে।

আর এ কারণেই এআইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনাটি শুধু প্রযুক্তির মধ্যে আটকে নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে মানুষের ব্যক্তিগত জীবনও।

থেরাপিস্টের চেয়েও বেশি জানবে এআই?

মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন সবচেয়ে বেশি ভাবনার বিষয় হতে পারে।

একজন মানুষ সপ্তাহে হয়তো একবার ৫০ মিনিটের জন্য থেরাপিস্টের সঙ্গে কথা বলেন।কিন্তু তার ব্যক্তিগত এআই এজেন্ট যদি প্রতিদিনের কথোপকথন, উদ্বেগ, সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং বিভিন্ন ঘটনার পর তার প্রতিক্রিয়া মনে রাখতে পারে, তাহলে কয়েক বছর পর সেই এআইয়ের কাছে ওই ব্যক্তির জীবন সম্পর্কে বিপুল তথ্য জমা হতে পারে।

ব্র্যান্ডনের মতে, তখন এমন পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে, যখন এআই একজন ক্লায়েন্টের জীবন সম্পর্কে তার থেরাপিস্টের চেয়েও বেশি তথ্য জানবে। এমনকি থেরাপিস্ট কোনো ব্যক্তিকে যেভাবে বুঝছেন, এআই তার সঙ্গে দ্বিমতও করতে পারে।

এখানেই প্রশ্নটা আরো বড় হয়ে ওঠে, যে প্রযুক্তি আমাদের জীবনের এতটা ব্যক্তিগত তথ্য জানে, তার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কেমন হবে?

এআই কি হয়ে উঠবে ব্যক্তিগত সঙ্গী?

বিগ টেকের লক্ষ্য শুধু আরও ভালো থেরাপিস্ট তৈরি করা নয়। বরং এমন ব্যক্তিগত এআই তৈরি করা, যা মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত থাকবে বলে ব্র্যান্ডনের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

একটি এআই হয়তো একই সঙ্গে কাজের পরামর্শদাতা, ব্যবসার কোচ, স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্যের উৎস এবং বন্ধুর মতো সঙ্গী হয়ে উঠতে পারে। ফোন, ঘড়ি, চশমা কিংবা অন্য ডিভাইসের মাধ্যমে সেটি আমাদের অতীত ও বর্তমান সম্পর্কে জানবে এবং ভবিষ্যতের সিদ্ধান্তেও সহায়তা করতে পারে।

তখন এআই বন্ধ করে দেওয়া মানে শুধু একটি সফটওয়্যার বন্ধ করা হবে না। বরং দীর্ঘদিনের জমে থাকা ব্যক্তিগত তথ্য, অভ্যাস ও এক ধরনের পরিচিত সঙ্গও হারানোর অনুভূতি তৈরি হতে পারে।

মানুষ কি মানুষের প্রয়োজন হারাবে?

আমার মনে হয়, এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

এআই হয়তো আমাদের কথা মন দিয়ে শুনবে, আগের কথাও মনে রাখবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক পরামর্শ দেবে। কিন্তু মানুষের সম্পর্ক শুধু বোঝাপড়ার ওপর তৈরি হয় না। সেখানে থাকে অভিমান, ভুল, ক্ষমা, তর্ক, আপস এবং একে অন্যের জন্য সময় দেওয়ার বিষয়টিও।

এআই এসব আচরণের অনুকরণ করতে পারবে। কিন্তু অনুকরণ আর অনুভব করা এক বিষয় নয়।

তবু পরিবর্তন আসবে। মানুষ হয়তো এমন কিছু কথা এআইকে বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে, যা কাছের মানুষকেও বলতে পারে না। ফলে এআইয়ের ওপর এক ধরনের আবেগগত নির্ভরতাও তৈরি হতে পারে।

প্রযুক্তি তাই আমাদের জীবনকে সহজ করবে, কিন্তু একই সঙ্গে নতুন একটি দায়িত্বও তৈরি করবে।এআইকে কতটা কাছে আনব, আর মানুষের জন্য কতটা জায়গা রেখে দেব।

হয়তো একদিন এআই আমাদের মনের পরিবর্তনও আগেভাগে বুঝে ফেলবে। কিন্তু মনের কথা জানা আর মনের অনুভূতি ভাগ করে নেওয়া এক নয়।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা এআই আমাদের কতটা বুঝবে, তা নয়। প্রশ্ন হলো— এআই যত বেশি আমাদের বুঝতে শিখবে, আমরা কি ততদিন মানুষকে বোঝার চেষ্টা করে যাব?

LEAVE A REPLY