ভারতে বিশ্বের একক বৃহত্তম তেল শোধনাগার পরিদর্শনে রুবিও, কিন্তু কেন?

ভারতের গুজরাটের জামনগরে রিলায়েন্সের তেল শোধনাগার পরিদর্শন করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। গত বুধবার বিশ্বের বৃহত্তম একক তেল শোধনাগারটি পরিদর্শন তিনি।এসময়  রুবিওর সঙ্গে ছিলেন ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর। রিলায়েন্সের কর্ণধার মুকেশ আম্বানি, অনন্ত আম্বানিসহ আম্বানি পরিবারের সদস্যরা তাদের স্বাগত জানান। 

কূটনীতির সাধারণ নিয়মের বাইরে গিয়ে কোনো দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর একটি নির্দিষ্ট বেসরকারি কম্পানির শোধনাগার পরিদর্শন করার পেছনে গভীর ভূ-রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক কারণ রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

অন্যদিকে ভারত-মার্কিন জ্বালানি বাণিজ্য আরো বাড়াতে জামনগর তেল শোধনাগারকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখছে ওয়াশিংটন।তার সফরের মূল লক্ষ্য ছিল জ্বালানি ক্ষেত্রে দুই দেশের বাণিজ্যিক সহযোগিতা বাড়ানোর সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা।

বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে অচলাবস্থা ও নানা মতপার্থক্যে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্ক যখন টানাপোড়েনের মধ্যে, তখন এ সফরকে বাণিজ্য ও বিনিয়োগকেন্দ্রিক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে বিশ্ববাজারে ভেনিজুয়েলার অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের সরবরাহ বাড়াতে চাইছে। তবে ভেনিজুয়েলার তেল অত্যন্ত ভারী হওয়ায় তা সব শোধনাগারে প্রক্রিয়াজাত করা যায় না।

রিলায়েন্সের শোধনাগারটি দৈনিক প্রায় ১৪ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াকরণের ক্ষমতা রয়েছে। সেই সঙ্গে এটি খুব সহজেই ভারী তেল প্রক্রিয়াজাত করতে পারে। রিলায়েন্স যাতে আরো বেশি ভেনিজুয়েলার তেল আমদানি ও শোধন করে, সেই বিষয়ে আলোচনা করতেই মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সেখানে গেছেন বলে জানা গেছে।

ডিজেলসহ বিভিন্ন পরিশোধিত জ্বালানি আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহেও এই কেন্দ্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

এটি বিশ্বের মোট তেল পরিশোধন সক্ষমতার প্রায় দেড় শতাংশ।এখানে অপরিশোধিত তেল থেকে ডিজেল, পেট্রল ও উড়োজাহাজের জ্বালানিসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন করা হয়। ভারী ও সালফারসমৃদ্ধ তেল প্রক্রিয়াজাত করার সক্ষমতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারেও শোধনাগারটির গুরুত্ব অনেক।

রিলায়েন্স বিশ্বের অন্যতম বড় পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান। ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে জামনগর থেকে ২ কোটি ১৬ লাখ ৬৬ হাজার টন পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানি করে প্রতিষ্ঠানটি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল ডিজেল। ইউরোপ এ জ্বালানির অন্যতম প্রধান বাজার।

বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান কেপলারের অনুমান, অক্টোবরে জামনগরে ভেনেজুয়েলার তেল আমদানি দৈনিক ৩ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৩ লাখ ৭০ হাজার ব্যারেলে পৌঁছাতে পারে।

রাশিয়ার তেল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ

২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন শুরুর পর রুশ তেলের অন্যতম বৃহৎ ক্রেতা হয়ে ওঠে ভারত। রিলায়েন্সও রাশিয়া থেকে তেল আমদানি বাড়ায়। ২০২২ সালের আগে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবহৃত অপরিশোধিত তেলের মাত্র ৩ শতাংশ আসত রাশিয়া থেকে। ২০২৫ সালে তা বেড়ে প্রায় ৫০ শতাংশে পৌঁছায়।

রুশ তেল কেনার কারণে ২০২৫ সালের আগস্টে ভারতীয় পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এতে রিলায়েন্সও প্রভাবিত হয়। পরে প্রতিষ্ঠানটি রুশ তেল আমদানি কমালেও ২০২৬ সালের জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে জামনগরে প্রক্রিয়াজাত তেলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ছিল রুশ উৎসের।

রুবিও বলেছেন, ভারত জ্বালানি আমদানির উৎসে বৈচিত্র্য আনছে। তবে রাশিয়ার তেলের ওপর নির্ভরতা এক দিনে কমানো কঠিন। একই সঙ্গে ভারতকে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবেও উল্লেখ করেছেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রেও বিনিয়োগ করছেন আম্বানি

রিলায়েন্স যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের ব্রাউনসভিল বন্দরে নতুন তেল শোধনাগার নির্মাণের পরিকল্পনায় যুক্ত হয়েছে। প্রায় ৩০০ কোটি থেকে ৪০০ কোটি ডলারের এ প্রকল্পে ২০২৯ সালের দিকে উৎপাদন শুরুর লক্ষ্য রয়েছে।

একদিকে রাশিয়ার তেল বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে আগ্রহী যুক্তরাষ্ট্র, অন্যদিকে নিজেদের জ্বালানি খাতে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে চায় ট্রাম্প প্রশাসন। এ পরিস্থিতিতে রিলায়েন্সের সঙ্গে ওয়াশিংটনের বাণিজ্যিক আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এদিকে ভারতের স্যাটেলাইট ইন্টারনেট বাজারে স্টারলিংকের প্রবেশ নিয়ে ইলন মাস্ক ও আম্বানির ব্যবসায়িক স্বার্থের দ্বন্দ্বও আলোচনায় এসেছে। মাস্কের অভিযোগ, আম্বানির জিওকে সুবিধা দিতে স্টারলিংকের প্রবেশ বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে। তবে রিলায়েন্স জানিয়েছে, তারা প্রতিযোগিতাকে ভয় পায় না।

সব মিলিয়ে রুবিওর জামনগর সফর কেবল একটি তেল শোধনাগার পরিদর্শন নয়। রাশিয়া ও ভেনেজুয়েলার তেল বাণিজ্য, যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম, নতুন বিনিয়োগ এবং ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সম্পর্ক-সবকিছুই এ সফরকে তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।

LEAVE A REPLY