কার্গো ভিলেজ থেকে নমুনা সংগ্রহ তুর্কি তদন্ত টিমের

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আমদানি কার্গো ভিলেজে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার আট দিনের মাথায় তুরস্কের ছয় সদস্যের তদন্ত টিম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। রোববার তারা কার্গো ভিলেজ থেকে কিছু নমুনাও সংগ্রহ করেছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও সিভিল এভিয়েশন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছে। পরে টিমের সদস্যরা বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের। 

এদিকে, ঘটনার নয় দিনেও উদ্ঘাটন করা যায়নি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আমদানি কার্গো ভিলেজে আগুনের কারণ কিংবা নেপথ্যের ঘটনা। কথা ছিল পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স থেকে গঠিত তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদন দাখিল করবে। বিমানের কমিটির সেই সময় পেরিয়ে গেছে গেল বৃহস্পতিবার। কিন্তু তারা তদন্তে কী পেল, কী কারণে এত বড় আগুনের ঘটনা তা সামনে না এনে তদন্তের সময়সীমা বৃদ্ধির জন্য বিমানের প্রধান নির্বাহীর কাছে আবেদন করেছে বলে জানা গেছে। কমিটি সময় চেয়েছে আরও সাত কার্যদিবস। বিষয়টি যুগান্তরকে নিশ্চিত করেন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক বোসরা ইসলাম। তিনি বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন এখনো হস্তগত হয়নি। কমিটি নির্ধারিত পাঁচ দিন শেষে আরও সাত দিন সময় চেয়েছে। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে না পারার ঘটনাকে বিমানের প্রশাসনিক দুর্বলতা ও সমন্বয়হীনতার প্রতিফলন হিসাবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এত বড় একটি কৌশলগত স্থাপনায় অগ্নিকাণ্ডের মতো ঘটনার তদন্তে বিলম্ব তদন্তের উদ্দেশ্য ও বিশ্বাসযোগ্যতা উভয়কেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলতে পারে। দ্রুত তদন্ত না হলে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও থাকে, যা ভবিষ্যতে দোষীদের চিহ্নিত করা কঠিন করে দেয়।

আগুনের ঘটনা তদন্তে ফায়ার সার্ভিস শুরু থেকেই ১৫ কার্যদিবস সময় পেয়েছে। এই কমিটি গঠিত হয় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার দুই দিন পর, ২০ অক্টোবর। অপরদিকে, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) থেকে ঘটনার একদিন পর, ১৯ অক্টোবর তদন্ত কমিটি গঠিত হওয়ার ৪ দিনের মাথায় সেটিও পুনর্গঠন করা হয়। এছাড়া রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বরাষ্ট্র সচিবের নেতৃত্বে একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়। এমন বাস্তবতায় দেশীয় তদন্তে গতি আনা এবং স্বচ্ছতা ও অধিকতর তদন্তের জন্য বিদেশ থেকে আমন্ত্রণ জানানো হয় বিশেষজ্ঞদের। এখন ঢাকায় অবস্থান করছে তুরস্কের ছয় সদস্যের বিশেষজ্ঞ টিম। তাদের সঙ্গে দুজন রয়েছেন তুরস্কের দূতাবাসের কর্মকর্তা। 

জানা গেছে, এই টিমের সদস্যরা স্বরাষ্ট্র সচিবের নেতৃত্বে গঠিত কমিটিকে সহায়তা করছে। এছাড়া অন্য কমিটিগুলোকে কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে। তাদের কাজ হবে স্বাধীন। তুরস্কের বিশেষজ্ঞ টিমের নেতৃত্ব রয়েছেন-ফার্স্ট ডিগ্রি চিফ সুপারিনটেনডেন্ট ওইকুন ইলগুন। তিনি বেসামরিক বিমান ও পর্যটন উপদেষ্টাকে তদন্তে সব ধরনের কারিগরি ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দেওয়ার আশ্বাস দেন।

তথ্যমতে, আগুন লাগার দিন ১৮ অক্টোবর শনিবারই বিমান থেকে কমিটি গঠন করা হয়েছিল। অগ্নিকাণ্ডের কারণ, ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণ, দায়দায়িত্ব শনাক্তকরণ এবং ভবিষ্যতে অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে তদন্ত করে বৃহস্পতিবারে মধ্যে সুপারিশসহ প্রতিবেদন দেওয়ার কথা ছিল সংস্থাটির কমিটির। অন্যদিকে, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিতে ঘটনার পরদিন তদন্ত কমিটি করে বেবিচক। সংস্থাটির সদস্য এয়ার কমডোর মো. আসিফ ইকবালের সভাপতিত্বে কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন-আবু সালে মো. খালেদ পরিচালক (ফায়ার), মোহাম্মদ আলমগীর, উপপরিচালক (চিফ এন্ডসেক ইন্সপেক্টর) (চ.দা.), মো. মাহবুব হোসেন, সহকারী ব্যবস্থাপক (কমার্শিয়াল) বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, সদস্য সচিব মো. ছায়েদুল হক ভূইয়া, সহকারী পরিচালক (এভসেক অপস)। এ কমিটিতে ঢাকা কাস্টমস হাউজের ডেপুটি কমিশনার মো. নেয়ামুল হাসানকে নতুন সদস্য হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পাঁচ সদস্যের এ কমিটিকে তদন্ত শেষে সাত কার্যদিবসের মধ্যে চেয়ারম্যানের কাছে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আদেশ দেওয়া হয়। তদন্ত কমিটি গঠনের চার দিন পর কমিটি পুনর্গঠন করল বেবিচক। বেবিচকের সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) মুহাম্মাদ কাউছার মাহমুদ যুগান্তরকে বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন এখনো পাওয়া যায়নি। এরই মধ্যে কমিটিতে নতুন একজন সদস্যকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আশা করছি, নির্ধারিত সাত কার্যদিবসের মধ্যেই তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন জমা দেবে।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম যুগান্তরকে বলেন, এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার পর তাৎক্ষণিক ও সমন্বিত তদন্ত অত্যন্ত জরুরি। কারণ প্রতিটি ঘণ্টা দেরি মানে সম্ভাব্য প্রমাণ হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা। এতে শুধু তদন্তের ফলাফলই নয়, জনআস্থা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। যে কোনো তদন্তের দীর্ঘসূত্রিতা বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হয়। 

এদিকে ১৮ অক্টোবর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণে পাঁচ সদস্যের আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করে অর্থ মন্ত্রণালয়। এ কমিটিকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে অগ্নিকাণ্ডের সার্বিক ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করে সরকারের কাছে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। 

এছাড়া কার্গো ভিলেজে অগ্নিকাণ্ড তদন্তে ১৯ অক্টোবর স্বরাষ্ট্র সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে সাত সদস্যের কোর কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে আগামী ৫ নভেম্বরের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরীকে সভাপতি করে ২০ অক্টোবর তদন্ত কমিটি গঠন করে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। পাঁচ সদস্যের কমিটিকে আগামী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

ফায়ার সার্ভিসের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহজাহান শিকদার যুগান্তরকে বলেন, তদন্ত কমিটি গঠনের মাত্র ছয় দিন হয়েছে। তদন্ত এখনো চলমান, বিভিন্ন দিক যাচাই চলছে। অগ্নিকাণ্ডের উৎস, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এবং প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থার কার্যকারিতা সবকিছু খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না। তদন্ত শেষ হলে পুরো বিষয়টি পরিষ্কার হবে। নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যেই প্রতিবেদন জমা দিতে পারব বলে আশা করছি।

LEAVE A REPLY