গণঅভ্যুন্থানের পর বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচন, কী বলছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম?

ছবিসূত্র : সংগৃহীত

২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের প্রায় দেড় বছর পর আজ বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্র সংস্কারের কয়েকটি মৌলিক প্রশ্নে গণভোটও আয়োজন করা হয়েছে।

আজ বৃহস্পতিবারের এ নির্বাচন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে গুরুত্বের সঙ্গে উঠে এসেছে।

এএফপি ‘গণঅভ্যুত্থানের পর নির্বাচনে বাংলাদেশে বেশি ভোটারের অংশগ্রহণের প্রত্যাশা’ শিরোনামে জানায়, ১৫ বছরের শাসনের অবসানের পর অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনে ব্যাপক ভোটার উপস্থিতি আশা করছে নির্বাচন কমিশন।

সংস্থাটির এক কর্মকর্তা বলেন, বর্তমানে ২০ ও ৩০ বছর বয়সী অনেক তরুণ পূর্ববর্তী সময়ে নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার সুযোগ থেকে কার্যত বঞ্চিত ছিলেন।

রয়টার্স ‘বাংলাদেশের জেন-জি ভোটারদের প্রত্যাশা: চাকরি, সুশাসন ও স্বাধীনতা’ শিরোনামে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, তরুণ ভোটারদের অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে কর্মসংস্থান, সুশাসন এবং ভীতিমুক্তভাবে মত প্রকাশের অধিকার।

২০২৪ সালে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে হওয়া গণঅভ্যুত্থানে দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দেশটি নতুন নির্বাচনের পথে এগোয়। প্রতিবেদনে এ নির্বাচনকে ২০০৯ সালের পর প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।তবে আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত থাকায় দলটি নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না।

রয়টার্স আরো জানায়, প্রায় সাড়ে ১৭ কোটি মানুষের দেশে কয়েক মাসের রাজনৈতিক অস্থিরতায় তৈরি পোশাকসহ বড় শিল্প খাত ক্ষতির মুখে পড়ে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে একটি গ্রহণযোগ্য ও স্পষ্ট নির্বাচনী ফল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা ‘২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর প্রথম নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশে নিরাপত্তা জোরদার’ শিরোনামে জানায়, ভোটকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

প্রায় এক লাখ ৫৭ হাজার পুলিশ সদস্যের পাশাপাশি সেনাবাহিনী ও অন্যান্য বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। এবারের নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা প্রায় ১২ কোটি ৭০ লাখ।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু ‘বাংলাদেশের নির্বাচন: ৫০ শতাংশের বেশি ভোটকেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ’ শিরোনামে জানায়, অর্ধেকের বেশি ভোটকেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব কেন্দ্রের অধিকাংশে সিসিটিভি স্থাপন করা হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ঢাকায় দায়িত্ব পালনকারী অনেক পুলিশ সদস্য বডি ক্যামেরা ব্যবহার করবেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

ডয়চে ভেলে ‘বাংলাদেশে নির্বাচনের প্রস্তুতির মধ্যে ইসলামপন্থিদের প্রভাব বাড়ছে’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলেছে, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ অংশ না নেওয়ায় রাজনৈতিক সমীকরণে পরিবর্তন এসেছে।

শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সঙ্গে জোটবদ্ধ একটি ইসলামপন্থি দল শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। ১৯৭১ সালের পর এই প্রথম ইসলামপন্থি শক্তিগুলো এতটা দৃশ্যমান নির্বাচনী অবস্থানে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে ‘লাইভ নিউজ’ প্রকাশ করছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি।  এতে সকাল সাড়ে ৭টার দিকে ভোটগ্রহণ শুরুর খবর প্রকাশ করা হয়েছে। 

বিবিসির লাইভে বলা হয়েছে, এটি শুধু ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর প্রথম নির্বাচনই নয়, বরং কয়েক দশকের মধ্যে এই প্রথমবার বাংলাদেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব (শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া) কেউ-ই নির্বাচনী মাঠে নেই।

আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়ায় দেশের প্রধান ইসলামপন্থি দল প্রথমবারের মতো সাধারণ নির্বাচনে বড় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ভোটাররা কেবল নতুন সরকারই নির্বাচন করবেন না, তারা একটি সাংবিধানিক গণভোটেও অংশ নেবেন। ‘জুলাই সনদ’ নামে ব্যাপক সংস্কারপ্যাকেজ বাস্তবায়িত হবে কি না সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে এই নির্বাচনে। এ ছাড়া প্রথমবারের মতো প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো পোস্টাল ভোটের মাধ্যমে গ্রহণ করা হচ্ছে।

‘বৃহস্পতিবারের নির্বাচন ঘিরে বাংলাদেশের তরুণ ভোটারদের নানা দাবি’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমস। প্রতিবেদনের শুরুতে বলা হয়, তরুণ ভোটারদের অনেকেই ২০২৪ সালে সরকার পতনের আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। তাদের আশা, আসন্ন নির্বাচন দেশের জন্য নতুন দিকনির্দেশনা বয়ে আনবে।

‘বাংলাদেশের নির্বাচন: ভুয়া তথ্যে সয়লাব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে পাকিস্তানের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য ডন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক এখন ভুয়া তথ্য ও অপপ্রচারের বড় একটি ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনকে ঘিরে বানানো উক্তি, বিকৃত ছবি এবং বিভ্রান্তিকর ফটোকার্ড ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার নামে মিথ্যা বক্তব্য ছড়িয়ে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে। আবার সম্পর্কহীন ছবি ব্যবহার করে বিদেশি সমর্থন বা আন্তর্জাতিক উত্তেজনার ভুয়া ধারণা তৈরি করা হচ্ছে।

একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি ভিজ্যুয়াল ব্যবহার করে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সাজানো দৃশ্যে দেখানো হচ্ছে। যেমন, বানানো বৈঠক বা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এসব অপপ্রচার ভোটের আগে দলীয় বিদ্বেষ বাড়াতে পারে এবং অনেক ভোটারের মতামত প্রভাবিত করতে পারে, বিশেষ করে যারা সামাজিক মাধ্যমে পাওয়া তথ্য যাচাই না করেই বিশ্বাস করেন।

 ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ইউল্যাব)-এর মিডিয়া স্টাডিজ অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগের প্রধান ড. দীন এম সুমন রহমান বলেন, ‘ভুল তথ্য প্রচারের মূল উদ্দেশ্য হলো ভোটারের পছন্দকে প্রভাবিত করা।

জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট ঘিরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, তরুণ ভোটারদের প্রত্যাশা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সম্ভাব্য রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস—এসব বিষয় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বিস্তৃতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

LEAVE A REPLY