ইরানে ‘মন্দ’ লোক নির্মূলের মিশনে দেউলিয়ার পথে যুক্তরাষ্ট্র!

ছবি : রয়টার্স

মার্কিন প্রতিরক্ষাসচিব পিট হেগসেথ বৃহস্পতিবার বলেছেন, ‘দুষ্টু লোকদের হত্যা করতে টাকা লাগে।’ তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, পেন্টাগন ইরান যুদ্ধের জন্য ২০০ বিলিয়ন ডলার তহবিলের অনুরোধ করেছে কি না? এর জবাবে তিনি এ কথা বলেন। 

এখন পর্যন্ত মোট কত টাকা খরচ হয়েছে, তা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। তবে যুদ্ধ কত দিন চলবে, তার ওপরই চূড়ান্ত খরচ নির্ভর করবে।পেন্টাগনের হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম ছয় দিনেই প্রায় ১১.৩ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে।

বিশেষজ্ঞ ড্যানিয়েল স্নাইডারম্যান বলেন, এই খরচের পরিমাণ বাস্তবসম্মত। কারণ যুদ্ধের সময় প্রচুর উন্নত অস্ত্র, বিমান হামলা, জ্বালানি এবং বিমানবাহী রণতরি পরিচালনায় বিপুল অর্থ লাগে।

তিনি জানান, ক্রুজ মিসাইল, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, বিমান থেকে ছোড়া বোমা, রণতরি ও যুদ্ধবিমান চালানো, সবকিছু মিলিয়ে খরচ দ্রুত বেড়ে যায়।

তাই ইরান সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ব্যয়বহুল যুদ্ধগুলোর একটি হয়ে উঠতে পারে।

হেগসেথ বলেন, ‘আমরা কংগ্রেসের সঙ্গে কাজ করছি, যাতে বর্তমান ও ভবিষ্যতের যুদ্ধ খরচের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ পাওয়া যায় এবং ব্যবহৃত গোলাবারুদ দ্রুত আবার পূরণ করা যায়।’

এদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, শুধু ইরান নয়, বিশ্ব পরিস্থিতি অস্থির হওয়ায় আরো বিভিন্ন কারণে এই অর্থ প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘আমাদের অনেক গোলাবারুদ দরকার, যাতে আমরা শক্ত অবস্থানে থাকতে পারি।’

যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারেও চাপ পড়েছে। ইরান হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দেওয়ায় তেলের দাম দ্রুত বেড়ে গেছে। গ্যাসের দামে প্রভাব পড়েছে।

যুদ্ধের নতুন মোড়

ইসরায়েলের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে হামলার জবাবে ইরান উপসাগরীয় কয়েকটি দেশের জ্বালানি স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালিয়েছে। এতে পুরো অঞ্চলে উত্তেজনা বেড়েছে।

সংঘাত বড় ধরনের যুদ্ধে রূপ নিতে পারে, এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বৃহস্পতিবার ভোরে ইরান কাতারের রাস লাফান এলএনজি স্থাপনায় হামলা চালায়। পাশাপাশি সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব-এর জ্বালানি অবকাঠামোতেও আঘাত হানা হয়। এতে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।

সাউথ পার্স বিশ্বের সবচেয়ে বড় গ্যাসক্ষেত্র। এটি কাতারের নর্থ ডোম গ্যাসক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত। ইরানের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি এই গ্যাসক্ষেত্র। বুশেহরের আসালুয়েহ এই গ্যাস ব্যবস্থার মূল কেন্দ্র, যেখানে উৎপাদন থেকে রপ্তানি, সবকিছু পরিচালিত হয়। তাই এখানে হামলা হলে পুরো জ্বালানি ব্যবস্থাই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এর আগে ইসরায়েল ইরানের গোয়েন্দামন্ত্রী ইসমাইল খাতিব-কে হত্যা করে এবং গ্যাস স্থাপনাতেও হামলা চালায় বলে অভিযোগ রয়েছে। এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, ইরান যদি কাতারে হামলা চালিয়ে যায়, তাহলে ইরানের সাউথ পার্সের পুরো এলাকা ধ্বংস করে দেওয়া হতে পারে।

যদিও তিনি দাবি করেছেন, ওই গ্যাসক্ষেত্রে হামলার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সম্পর্ক নেই। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, তাদের জ্বালানি স্থাপনায় হামলার জবাবে এখন পর্যন্ত খুব সীমিত শক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। তবে হামলা চলতে থাকলে ইরান আর সংযম দেখাবে না বলেও সতর্ক করেন। সব মিলিয়ে জ্বালানি অবকাঠামোকে কেন্দ্র করে এই হামলা-পাল্টা হামলা এখন পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলকে বড় ধরনের সংঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের ওপর প্রতিশোধমূলক হামলা চালাবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। তবে এমন হলে সংঘাতের নতুন অধ্যায় শুরু হতে পারে। বুধবার সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ রিয়াদে ১২টি মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠকে বলেন, ‘প্রয়োজনে আমরা সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার রাখি।’

তিনি ইরানকে সতর্ক করে বলেন, ‘এই চাপ রাজনৈতিক ও নৈতিকভাবে বিপরীত ফল দিতে পারে।’

বৃহস্পতিবার তিনি আরো বলেন, সৌদি আরব এবং প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের ওপর হামলা সহ্য করার সীমিত সুযোগ রাখে এবং তেহরানকে অবিলম্বে তাদের কৌশল পুনর্বিবেচনা করতে হবে।

কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ-এর সঙ্গে কথা বলেন। পরে জানানো হয়, নেতারা ইরানের হামলাকে বিপজ্জনক উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখেছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মেহরান কামরাভা বলেন, ইরানের বাড়তে থাকা হামলায় উপসাগরীয় দেশগুলো কূটনৈতিকভাবে কঠিন অবস্থায় পড়েছে। একদিকে তারা প্রতিক্রিয়া দিতে চায়, অন্যদিকে যুদ্ধে জড়ালে পরিস্থিতি জটিল হতে পারে। বিশেষ করে যদি ডোনাল্ড ট্রাম্প হঠাৎ আমেরিকার ‘বিজয়’ ঘোষণা করে সরে যান, তাহলে এসব দেশ একা লড়াই করতে বাধ্য হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েল এখন শুধু সামরিক বা পারমাণবিক স্থাপনা নয়, বরং ইরানের অর্থনৈতিক মূল অবকাঠামোকেও লক্ষ্য করছে, যা সংঘাতকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক চাপের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা আরো বলেন, কাতারের নর্থ ডোম গ্যাসক্ষেত্র ইউরোপ ও এশিয়ায় এলএনজি সরবরাহের বড় অংশ জোগায়। ইরানের পাশে অস্থিরতা বাড়লে এটি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকেও প্রভাবিত করতে পারে। এ ছাড়া ইসরায়েলের নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্র লেভিয়াথান, তামার ও কারিশ প্রতিশোধমূলক হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে। এতে পূর্ব ভূমধ্যসাগর অঞ্চলেও জ্বালানি সংকট তৈরি হতে পারে।

গ্যাস স্থাপনাগুলোতে ইসরায়েলের হামলা সংঘাতকে সামরিক সংঘর্ষ থেকে জ্বালানিকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক যুদ্ধে মোড় দেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

LEAVE A REPLY