স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বাড়ার শঙ্কা প্রকাশ করেছে বিআইপি

উপজেলা পরিষদে সংসদ সদস্যদের (এমপি) জন্য ‘পরিদর্শন কক্ষ’ বা অফিস স্থাপনের প্রস্তাবকে ঘিরে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বাড়ার শঙ্কা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) (বিআইপি)। সংগঠনটি বলছে, এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় দ্বৈত নেতৃত্ব, সমন্বয়হীনতা এবং জবাবদিহিতার সংকট তৈরি হতে পারে।

মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) সকালে রাজধানীর প্ল্যানার্স টাওয়ারে বিআইপি কনফারেন্স হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ আশঙ্কার কথা তুলে ধরা হয়। সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিআইপি’র সহ-সভাপতি-১ পরিকল্পনাবিদ শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান এবং সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক মুঃ মোসলেহ উদ্দীন হাসান।

প্রবন্ধে শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান বলেন, উন্নয়ন পরিকল্পনা স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। অধিকাংশ উন্নয়ন কার্যক্রম স্থানীয় পর্যায়েই বাস্তবায়িত হয়। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ যদি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণাধীন থাকে, তাহলে তা কার্যকর ফল দিতে ব্যর্থ হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে পরিকল্পনা কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকে।

তিনি আরো বলেন, এমপিদের উন্নয়ন কার্যক্রমে সরাসরি সম্পৃক্ততা বাড়লে আইনসভা ও নির্বাহী বিভাগের সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে পড়ে।

এতে প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি জবাবদিহিতা দুর্বল হয়ে যেতে পারে।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, উপজেলা চেয়ারম্যান ও এমপি ভিন্ন রাজনৈতিক দলের হলে স্থানীয় পর্যায়ে “দ্বৈত নেতৃত্ব” পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এতে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে বিলম্ব, সমন্বয়হীনতা ও দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকি থাকে এবং ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ মানুষ।

বিআইপি’র মতে, উপজেলা পর্যায়ে সমন্বিত ও বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনার অভাব উন্নয়নের বড় বাধা।

এজন্য প্রতিটি উপজেলায় পেশাজীবী পরিকল্পনাবিদ নিয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়, যাতে ভূমি ব্যবহার, অবকাঠামো ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত উন্নয়ন নিশ্চিত করা যায়।

সমাপনী বক্তব্যে অধ্যাপক মোসলেহ উদ্দীন হাসান বলেন, নিরাপদ নগর, ফুটপাত সংকট, গণপরিবহন, জলাবদ্ধতা ও অপরিকল্পিত উন্নয়নসহ নানা সমস্যার সমাধান স্থানীয় সরকারের কার্যকর ভূমিকার ওপর নির্ভরশীল। তিনি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও ক্ষমতায়নের আহ্বান জানান।

সারজিসের মূত্রনালিতে পাথর, সার্জারির সিদ্ধান্ত চিকিৎসকদের

তিনি বিভাগীয় পর্যায়ে “লোকাল পার্লামেন্ট” গঠনের প্রস্তাব দেন, যেখানে সংশ্লিষ্ট এমপি ও প্রতিনিধিরা সমন্বিতভাবে সমস্যা ও সমাধান নিয়ে কাজ করতে পারবেন। একই সঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও উপজেলা চেয়ারম্যানের মধ্যে বিদ্যমান ক্ষমতার টানাপোড়েনের কথাও তুলে ধরেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে বিআইপি নিম্নোক্ত সুপারিশ তুলে ধরে- যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- উপজেলা পরিষদের ভেতরে এমপি অফিস না রাখার প্রস্তাব; প্রয়োজনে আলাদা কনস্টিটুয়েন্সি অফিস বা ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্ম; এমপির ভূমিকা নীতিনির্ধারণ ও নজরদারিতে সীমাবদ্ধ রাখা; এমপি, চেয়ারম্যান ও প্রশাসনের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় কাঠামো; জনশুনানি ব্যবস্থা চালু; উপজেলা পরিষদ শক্তিশালীকরণ; দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন; উপজেলা পরিষদের পূর্ণ ক্ষমতা নিশ্চিত; প্রতিটি উপজেলায় পরিকল্পনাবিদ নিয়োগ; সমন্বিত স্থানিক পরিকল্পনা বাধ্যতামূলক করা; স্বতন্ত্র বাজেট ও আর্থিক স্বায়ত্তশাসন; কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ হ্রাস ও ইউএনও’র ভূমিকা সমন্বয়ে সীমাবদ্ধ রাখা; নাগরিক অংশগ্রহণ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত এবং স্থানীয় সরকার কমিশন-২০২৫ রিপোর্ট পুনর্মূল্যায়ন।

বিআইপি মনে করে, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী না করে সেখানে এমপি অফিস স্থাপন করলে বিকেন্দ্রীকরণের পরিবর্তে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ আরো জোরদার হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। টেকসই উন্নয়নের জন্য স্পষ্ট দায়িত্ব বণ্টন, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।

LEAVE A REPLY