র‌্যাবের সঙ্গে ইয়াসিন বাহিনীর গোলাগুলি বুলডোজারে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো র‌্যাবের ক্যাম্প

তিন মাস আগে যৌথ বাহিনীর ব্যাপক অভিযানে সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আস্তানা জঙ্গল সলিমপুর উদ্ধার করা হয়েছিল। আগামী ৩১ মে সেখানে র‌্যাবের ক্যাম্প উদ্বোধন করার কথা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের। সফরসূচিও চূড়ান্ত করা হয়েছিল। ক্যাম্পটির নির্মাণ কাজও ছিল শেষ পর্যায়ে। কিন্তু তার ৬ দিন আগে রোববার মধ্যরাতে রীতিমতো বুলডোজার এনে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো সেই ক্যাম্প।

ইয়াসিন বাহিনীর সন্ত্রসীরা কার্যত প্রশাসন তথা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতেই ২-৩শ জন সন্ত্রাসী এনে এই হামলা চালায়। র‌্যাব প্রতিরোধ গড়ে তুললে সন্ত্রাসীদের সঙ্গে ২ ঘণ্টাব্যাপী গুলিবিনিময় হয়। সন্ত্রাসীরা এ সময় এসএমজি, একে-৪৭ রাইফেলের মতো ভারী অস্ত্র ব্যবহার করে। হামলা ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা যাতে সহজে চলাচল করতে না পারে সেজন্য এক্সকেভেটর এনে কেটে দেওয়া হয় সড়কের অন্তত একাধিক স্থান।

সোমবার সকালে র‌্যাব-পুলিশ-সেনাবাহিনী অভিযান চালিয়ে ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে ২০ জনকে আটক করেছে। হারানো রাজত্ব ফিরে পেতেই ইয়াসিন বাহিনী এই হামলা চালায়। তবে গোলাগুলিতে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।

এদিকে রোববার রাত ২টা থেকে ৪টা পর্যন্ত সন্ত্রাসীদের সঙ্গে র‌্যাব-পুলিশের বন্দুকযুদ্ধ চলাকালে এলাকাবাসীর মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। প্রাণ বাঁচাতে অনেকে ছোটাছুটি শুরু করেন। হামলার সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ১০৪ রাউন্ড গুলিবর্ষণ করে।

র‌্যাব-৭-এর কমান্ডিং অফিসার (সিও) লে. কর্নেল হাফিজুর রহমান বলেন, ইয়াসিন বাহিনীর ২-৩শ লোক রাতের আঁধারে র‌্যাবের ক্যাম্পে হামলা চালায়। তারা একে-৪৭ রাইফেলের মতো ভারী অস্ত্র ব্যবহার করেছে। র‌্যাবও পালটা প্রতিরোধ করেছে। অতিরিক্ত ফোর্স ঘটনাস্থলে পৌঁছলে সন্ত্রাসীরা পিছু হটে। এ ঘটনা ইয়াসিন বাহিনী ঘটিয়েছে।

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলমও সোমবার ঘটনাস্থলে ছুটে যান। তিনি বলেন, ‘জঙ্গল সলিমপুরের দখল হারিয়ে সন্ত্রাসীরা মরিয়া হয়ে উঠেছে। প্রশাসন যখন এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে এবং তা ধরে রাখার জন্য ক্যাম্প নির্মাণসহ নানা উদ্যোগ গ্রহণ করছে তখন তারা এ ঘটনা ঘটাল। তবে সন্ত্রাসীদের উদ্দেশ্য সফল হবে না। এ ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত, ইন্ধনদাতাদের চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে। অভিযানে এ পর্যন্ত ২৪ জনকে আটক করা হয়েছে।’ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যাতে সহজে অভিযান চালাতে না পারে সেজন্যই সন্ত্রাসীরা রাস্তা কেটে দেয়। এই জনপদে শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় যা দরকার তাই করা হবে।

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, হামলা ও ভাঙচুরে একটি বুলডোজার, একটি এক্সকেভেটর ও দুটি ড্রামট্রাক ব্যবহার করা হয়েছে। সেগুলো আলিনগরের ভেতর থেকে এসেছিল। রাত ১২টা থেকে সন্ত্রাসীদের তৎপরতা শুরু হয়। প্রথমে খাল থেকে দুই ট্রাক কাঁদামাটি এনে রাস্তায় ফেলে কৃত্রিমভাবে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করতে চারটি স্থানে সড়ক কেটে দেওয়া হয়। এরপর রাত ২টার দিকে আলীনগরে অবস্থিত যৌথ বাহিনীর অস্থায়ী ক্যাম্পে হামলা চালানো হয়। এ সময় বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় উদ্বোধনের অপেক্ষায় থাকা র‌্যাবের ক্যাম্পের কয়েকটি দেয়াল।

ছিন্নমুল নুরনবীশাহ কাঁচাবাজার এলাকার বাসিন্দা অ্যাডভোকেট মো. আমজাদ হোসেন বলেন, ‘আমার ঘরের ২০০ গজের মধ্যে পুলিশের অস্থায়ী ক্যাম্প। রোববার রাত ৮টায় বিদ্যুৎ চলে যায়, আসে রাত ১২টার পর। প্রচণ্ড গরমের বাসার সামনে গিয়ে দাঁড়াই। এ সময় দেখতে পাই দুটি ড্রামট্রাক থেকে রাস্তায় কী যেন ফেলছে, আমার সঙ্গে স্থানীয় আরও দুই ব্যবসায়ী ছিলেন। ভাবছিলাম, কয়েকদিন পর যেহেতু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসছেন, সেজন্য হয়তো রাস্তা ঠিক করা হচ্ছে। এরপর দেখলাম, গাড়িগুলো দ্রুত আলিনগরের দিকে চলে যাচ্ছে, এতে সন্দেহ জাগে। একটু সামনে গিয়ে দেখি কাঁদামাটি ফেলা হয়েছে। বিষয়টি ফৌজদারহাট ফাঁড়ির এসআই আমিনুল ইসলামকে জানাই। তিনি আমাকে ফাঁড়ির ইনচার্জ ইন্সপেক্টর সোহেল রানার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। পরে ইন্সপেক্টর সোহেল রানাকে অবগত করি।’

তিনি বলেন, এ সময়ে দুই-তিনটি সিএনজি অটোরিকশা আলিনগরের দিক থেকে দ্রুতগতিতে আসছিল। তাদের থামিয়ে পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তারা জানায়, খেজুর বাগান নতুন ব্রিজ এলাকায় ৩০-৪০ জন লোক জড়ো হয়েছে। তারা ব্রিজটি ভাঙার জন্য সরঞ্জাম নিয়ে আসছে। তারা সিএনজিগুলো ফিরিয়ে দিয়েছে। বিষয়টি আমি এসআই আমিনুল ইসলামকে জানিয়েছি। প্রায় ১৫ মিনিট পর ইন্সপেক্টর সোহেল রানা ১৫-২০ জন ফোর্স নিয়ে ছুটে আসেন। তখন আমি ব্রিজ ভাঙার বিষয়টিও জানাই। মনে হলো তিনি বিষয়টি অবগত। পরবর্তীতে একটি ভিডিও করে এসপি স্যারের মোবাইলে পাঠাই।

ওই আইনজীবী বলেন, ‘আমি ফেসবুকে লাইভ করেছি। সেখানে প্রশাসনকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানাই। লাইভ করার ঘণ্টাখানেক পর সীতাকুণ্ড থানার ওসিসহ বিভিন্ন অফিসার ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। তারা আসার সময় একটি এক্সকেভেটর নিয়ে এসেছিলেন।’

অভিযানের ভিডিও আপলোড করে কামাল হোসেন নামে এক র‌্যাব সদস্য বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যাতে প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য এখানে সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন স্থানে কালভার্ট এবং রাস্তা কেটে দিয়েছে। ওরা মনে করেছে যে ওদের কৌশলের কাছে আমরা পরাজিত হয়ে যাব। কিন্তু আমরা যে তাদের থেকে আরও বেশি কৌশলী, সেটা তারা বুঝতে পারেনি।’ যে কয়টি স্থানে রাস্তা কেটে দেওয়া হয়েছে, সেখানেই প্রশাসনের গাড়ি রেখে হেঁটে ঘটনাস্থলে পৌঁছে যৌথ বাহিনী।

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড থানা এলাকায় অবস্থিত জঙ্গল সলিমপুর। ৩ হাজার একরেরও বেশি সরকারি খাস জায়গায় গড়ে উঠেছে হাজার হাজার অবৈধ বস্তি। যুগের পর যুগ এই এলাকাটি নিয়ন্ত্রণ করে আসছে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপ। সরকারি জমি বেচা-বিক্রি, বস্তি ভাড়া দেওয়া, বিনামূল্যে গ্যাস-বিদ্যুৎ ব্যবহার করাসহ নানাভাবে কোটি কোটি টাকা বাণিজ্য চলছিল এখানে। প্রশাসনের জন্য এই এলাকা ছিল এক প্রকার নিষিদ্ধ। প্রশাসন কোনো অভিযানে গেলেই প্রতিরোধের মুখে পিছু হটতো। সর্বশেষ গত জানুয়ারি মাসে সন্ত্রাসী ইয়াসিন বাহিনীর প্রধান ইয়াসিনকে ধরতে গিয়ে তার বাহিনীর হামলায় নিহত হন এক র‌্যাব সদস্য। তাকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এরপর প্রশাসন হার্ডলাইনে যায়। গত ৯ মার্চ র‌্যাব, পুলিশসহ প্রশাসনের ৩ হাজারেরও অধিক সদস্য নিয়ে পরিচালনায় করা হয় বিশেষ অভিযান। এই অভিযানে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার ও ২২ জন সন্ত্রাসী আটক করা হয়। এরপর এলাকার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে সেখানে র‌্যাব ও পুলিশের অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগর ও ছিন্নমূল এলাকায় স্থায়ী ক্যাম্প নির্মাণের কাজ শুরু করে প্রশাসন।

৩১ মে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সফরসূচিতে দেখা গেছে, সকাল ১০টায় তার জঙ্গল সলিমপুর যাওয়ার কথা। যৌথ বাহিনীর নবনির্মিত ক্যাম্প উদ্বোধনের জন্যই এই সফর। কিন্তু তার আগেই ক্যাম্প গুঁড়িয়ে দিয়ে সন্ত্রাসীরা মূলত তাকেই চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে।

জানা গেছে, এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ ছিল অন্তত দুটি সন্ত্রাসী গ্রুপের হাতে। এর মধ্যে আলীনগরের নিয়ন্ত্রণ ছিল ইয়াসিন বাহিনীর হাতে। ছিন্নমূলের নিয়ন্ত্রণ ছিল রোকন বাহিনীর হাতে। তাদের হয়ে আরও একাধিক উপ-বাহিনী এলাকা নিয়ন্ত্রণে কাজ করত।

LEAVE A REPLY