সংগৃহীত ছবি
সাহারা মরুভূমিকে সাধারণত পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন ও প্রতিকূল অঞ্চলগুলোর একটি হিসেবে ধরা হয়- যেখানে চারদিকে শুধু বিস্তীর্ণ বালু, তীব্র গরম, প্রচণ্ড পানির অভাব আর গভীর নিঃসঙ্গতা। এখন যেখানে মানুষের বসবাস প্রায় অসম্ভব হলেও হাজার হাজার বছর আগে এই অঞ্চলের রূপ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
প্রাচীন সময়ে উত্তর আফ্রিকার বড় অংশজুড়ে ছিল সবুজ তৃণভূমি, হ্রদ এবং নদী। তখন এই অঞ্চল ছিল প্রাণী ও মানুষের জন্য উপযোগী একটি পরিবেশ। সেসব জায়গায় মানুষ বসতি গড়ে তুলেছিল, যেসব এলাকা এখন পুরোপুরি জনশূন্য মরুভূমি। সেই হারিয়ে যাওয়া সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র উঠে এসেছে দক্ষিণ-পশ্চিম লিবিয়ায় পাওয়া প্রাচীন দুটি মানবদেহের ডিএনএ বিশ্লেষণে।প্রায় সাত হাজার বছর পুরনো এই দেহাবশেষ পাওয়া গেছে তাকারকোরি শিলা আশ্রয়স্থল থেকে। এই গবেষণায় বিজ্ঞানীরা এমন একটি মানব বংশের প্রমাণ পেয়েছেন, যার অস্তিত্ব সম্পর্কে আগে জানা ছিল না। ধারণা করা হচ্ছে, এই গোষ্ঠী প্রায় ৫০ হাজার বছর ধরে অন্য মানব জনগোষ্ঠী থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন ছিল।
কিভাবে অজানা শনাক্ত হলো মানব বংশ?
বহু বছর ধরে গবেষকদের ধারণা ছিল, আফ্রিকার কিছু অঞ্চলের বর্তমান মানুষের ডিএনএর মধ্যে কোনো অজানা প্রাচীন মানবগোষ্ঠীর ছাপ রয়ে গেছে।তবে সরাসরি কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কিন্তু তাকারকোরি থেকে পাওয়া এই প্রাচীন দেহাবশেষ সেই ধারণায় বড় পরিবর্তন আনে। আধুনিক জিন বিশ্লেষণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে গবেষকেরা পুরো জিনোম বিশ্লেষণ করেন। এতে দেখা যায়, এই মানুষের জিনগত গঠন এমন একটি বংশের সঙ্গে সম্পর্কিত, যা আগে কোনো পরিচিত প্রাচীন মানবগোষ্ঠীর সঙ্গে মেলে না। বৈজ্ঞানিক সাময়িকী ‘সায়েন্স’-এর তথ্য অনুযায়ী, এই দুই ব্যক্তি এমন একটি বিচ্ছিন্ন মানবগোষ্ঠীর সদস্য ছিলেন, যারা হাজার হাজার বছর আগে আফ্রিকার অন্য জনগোষ্ঠী থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছিলেন।
কেন এই আবিষ্কার গুরুত্বপূর্ণ?
সাধারণভাবে মানব ইতিহাসে দেখা যায়, বিভিন্ন জনগোষ্ঠী দীর্ঘ সময় একা থাকে না। মানুষের চলাচল, বিয়ে, বাণিজ্য এবং সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের মাধ্যমে জিনগত মিশ্রণ ঘটে। কিন্তু তাকারকোরির মানুষের ক্ষেত্রে এই চিত্র ভিন্ন। গবেষণায় দেখা গেছে, তাদের পূর্বপুরুষরা প্রায় ৫০ হাজার বছর আগে অন্য আফ্রিকান জনগোষ্ঠী থেকে আলাদা হয়ে যায় এবং দীর্ঘ সময় ধরে প্রায় বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠীর মানুষ মাত্র সাত হাজার বছর আগেও জীবিত ছিল। এদের জিনে এমন প্রাচীন বৈশিষ্ট্য পাওয়া গেছে, যা সাধারণত এত অল্প সময় আগে বেঁচে থাকা মানুষের মধ্যে দেখা যায় না। সহজভাবে বললে, এই জনগোষ্ঠী দীর্ঘ সময় ধরে নিজের আলাদা পরিচয় ধরে রেখেছিল।
‘সবুজ সাহারা’ যুগ নিয়ে নতুন ধারণা
এই গবেষণা ‘সবুজ সাহারা’ যুগ নিয়ে প্রচলিত ধারণাকেও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। সেই সময়ে সাহারায় বৃষ্টি বেশি হতো। হ্রদ ও নদী বড় ছিল, চারদিকে গাছপালা ছিল এবং পরিবেশ ছিল অনেক বেশি বাসযোগ্য। ধারণা করা হয়, তখন মানুষের যাতায়াতও সহজ ছিল। কিন্তু নতুন জিনগত তথ্য বলছে, পরিবেশ ভালো হলেও সব সময় জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ব্যাপক মিশ্রণ ঘটেনি। তাকারকোরির মানুষের মধ্যে বাইরের জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বড় ধরনের জিনগত মিশ্রণের খুব কম প্রমাণ পাওয়া গেছে। অর্থাৎ তারা অনেকটাই নিজেদের ভেতরেই সীমাবদ্ধ ছিল।
যোগাযোগ ছিল, তবে সীমিত
গবেষণায় কিছু জিনগত চিহ্ন পাওয়া গেছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে উত্তরাঞ্চলের অন্যান্য জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সীমিত যোগাযোগ ছিল। এ ছাড়া খুব সামান্য পরিমাণে প্রাচীন নিয়ান্ডারথাল মানুষের সঙ্গে দূরবর্তী জিনগত সংযোগের ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে। তবে এসব মিশ্রণ খুবই দুর্বল এবং সীমিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, হয়তো ছোট ছোট দল বা একক ব্যক্তি বিভিন্ন অঞ্চলে যাতায়াত করেছিল। তারা জ্ঞান, সামগ্রী বা সম্পর্ক বিনিময় করলেও বড় পরিসরে জনসংখ্যার মিশ্রণ হয়নি।
কেন এই আবিষ্কার তাৎপর্যপূর্ণ?
বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে এমন একটি মানব গোষ্ঠীর অস্তিত্ব খুঁজছিলেন, যার ইঙ্গিত শুধু পরোক্ষভাবে পাওয়া যেত। তাকারকোরির এই আবিষ্কার সেই খোঁজের সরাসরি প্রমাণ দিয়েছে। এটি শুধু মানব ইতিহাসের একটি হারিয়ে যাওয়া অধ্যায় উন্মোচনই করেনি, বরং এটাও দেখিয়েছে যে আজকের পরিচিত বসবাসের প্রায় অযোগ্য সাহারা মরুভূমিতে প্রাচীনকালে মানুষ থাকতে পারতো অনায়াসেই।
তবে সাহারার অতীত এখনো অনেকটাই অজানা রয়ে গেছে। ভবিষ্যতে এমনসব নতুন আবিষ্কার মানব ইতিহাস সম্পর্কে আরো বিস্ময়কর তথ্য দিতে পারে।










































