হবিগঞ্জ জেলা ছাত্রদল সভাপতি শাহ রাজিব আহমেদ রিংগনসহ ১১ জনের নাম উল্লেখ করে মোট ১০০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে এনসিপি। বুধবার রাত ৯টার দিকে এনসিপির ছাত্র সংগঠন জেলা ছাত্রশক্তির আহ্বায়ক তন্ময় তাহের রুবেল বাদী হয়ে বাহুবল উপজেলার কামাইছড়া ফাঁড়িতে মামলাটি করেন। হবিগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) পদযাত্রায় হামলার ঘটনায় এই মামলা দেওয়া হয়। হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. তারেক মাহমুদ মামলাটি গ্রহণ করেন। এ সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম এমপি, দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ এমপি, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও মাহমুদা মিতু এমপি। সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. জাহেদুল হক বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, তবে এখনো আমি এজাহারের কপি হাতে পাইনি। এদিকে দিনভর চেষ্টা করলেও এনসিপির নেতাকর্মীরা হবিগঞ্জে ঢুকতে পারেননি।
বুধবার দলীয় কর্মসূচিতে অংশ নিতে মৌলভীবাজার থেকে হবিগঞ্জে যাওয়ার পথে দফায় দফায় পুলিশি বাধার মুখে পড়েন এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা। ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দলও একই স্থানে পালটা প্রতিবাদ সমাবেশ আহ্বান করায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ১৪৪ ধারা জারি করেছেন হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক। বুধবার রাতে সর্বশেষ খবরে জানা যায়, ১৪৪ ধারা বলবৎ রয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মঙ্গলবার দিনব্যাপী হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ ও জেলা শহরে এনসিপির কর্মসূচি ছিল। এতে এনসিপির মুখ্য সংগঠক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, জাতীয় সংসদের হুইপ জি কে গউছ এমপিসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের কটাক্ষ করে বক্তব্য দেন। সন্ধ্যায় জেলা শহরের সমাবেশ শেষ করে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও সারজিস আলম সার্কিট হাউজের উদ্দেশে রওয়ানা হন। পথে কোর্ট মসজিদের সামনে পৌঁছলে তাদের গাড়ি বহরে একদল যুবক হামলা করে। এ সময় গাড়িতে ব্যাপক ভাঙচুর করা হয়। একপর্যায়ে সারজিস আলমসহ নেতাকর্মীরা সোনালী ব্যাংকের প্রধান শাখায় গিয়ে আশ্রয় নেন। তখন দুপক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পালটাধাওয়া হয়।
সারজিস আলম এ সময় অভিযোগ করে বলেন, ছাত্রদল নেতাকর্মীরা তাদের ওপর হামলা করেছে। এতে তিনিসহ তাদের অন্তত ২০ জন নেতাকর্মী আহত হন। এ ঘটনায় রাতে ব্যাপক উত্তেজনা দেখা দেয়। পরে পুলিশের হস্তক্ষেপে পাটওয়ারী ও সারজিস রাত ১১টায় মৌলভীবাজার যান। সেখান থেকে রাতে হবিগঞ্জে বুধবার বিক্ষোভ সমাবেশ করার ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে জেলা ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলও পালটা কর্মসূচি ঘোষণা করে। এ অবস্থায় জেলা প্রশাসন বুধবার সকালে হবিগঞ্জ পৌর এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে। এতে ৫ জনের বেশি মানুষকে একসঙ্গে জড়ো হওয়ার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।
এদিকে মৌলভীবাজারে দলীয় কর্মসূচি শেষে বুধবার বিকালে নাহিদ ইসলাম, সারজিস আলম, হাসনাত আব্দুল্লাহ, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বুধবার বিকালে মৌলভীবাজার থেকে হবিগঞ্জের উদ্দেশে রওয়ানা হন। তারা প্রথম দফায় শ্রীমঙ্গলের মুছাই এলাকায় পৌঁছলে পুলিশ তাদের গাড়িবহর আটকে দেয়। পরে দীর্ঘক্ষণ ধস্তাধস্তি ও বাগ্বিতণ্ডার পর তারা সেখান থেকে অতিক্রম করেন। এরপরই তাদের বাহুবল উপজেলার রশিদপুর এলাকায় আবারও আটকে দেওয়া হয়। তখন আবার তাদের সঙ্গে পুলিশের ধস্তাধস্তি ও বাগ্বিতণ্ডা হয়। এ সময় একটি ভিডিওতে দেখা যায়, উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা তাদের মৌলভীবাজারে ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। কিন্তু এনসিপি নেতারা তাতে কোনোভাবেই সায় দিচ্ছেন না। তারা হবিগঞ্জে পৌঁছানোর দাবিতে অনড় ছিলেন। একপর্যায়ে হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. তারেক মাহমুদ এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেন। পরে দীর্ঘ আলোচনার পর তারা কামাইছড়া ফাঁড়িতে মামলা করতে রাজি হন। এরপর তাদের একটি প্রতিনিধিদল সেখানে যায়।
উল্লেখ্য, মঙ্গলবার হবিগঞ্জ শহরের সাইফুর রহমান টাউন হলের সামনে জুলাই পদযাত্রার সভা শেষ করে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা গাড়িবহর নিয়ে সার্কিট হাউজে যাওয়ার পথে কোর্ট মসজিদ এলাকায় পৌঁছলে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, সারজিস আলমের ওপর হামলা চালায় একদল যুবক। এ সময় তাদের বহনকারী গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। একপর্যায়ে তারা সোনালী ব্যাংক প্রধান শাখার ভেতরে গিয়ে আশ্রয় নেন। তখন দুপক্ষের মধ্যে ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। এতে সারজিস আলমসহ অন্তত ২০ জন আহত হন। পরে পুলিশ গিয়ে রাত ৮টার দিকে তাদের উদ্ধার করে সার্কিট হাউজে নিয়ে যায়। রাত ১১টায় সারজিস আলম মৌলভীবাজারের উদ্দেশে রওয়ানা হন। এর আগে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা হন। এ ঘটনার প্রতিবাদে রাতেই ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল এবং এনসিপি পালটাপালটি কর্মসূচি ঘোষণা করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বুধবার সকালে জেলা প্রশাসন হবিগঞ্জ পৌর এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে। এছাড়া ৩ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়।
এদিকে মৌলভীবাজার থেকে হবিগঞ্জ যাওয়ার পথে শ্রীমঙ্গলের ‘চা কন্যা’ নামক স্থানে পুলিশের ব্যারিকেডের (বাধার) মুখে পড়েন এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা। পরে বুধবার বিকাল ৫টার দিকে পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে হবিগঞ্জের দিকে যান তারা।
সিলেটে এনসিপির পদযাত্রা আজ : সিলেট ব্যুরো জানায়, আজ বৃহস্পতিবার সিলেটের কানাইঘাটে পদযাত্রা ও গণসংযোগ করবে এনসিপি। এতে দলটির কেন্দ্রীয় শীর্ষ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত থাকবেন বলে জানা গেছে। কেন্দ্রীয় নেতাদের পাশাপাশি পদযাত্রা ও গণসংযোগে অংশ নেবেন এনসিপি সিলেট জেলা ও মহানগর শাখা, জাতীয় ছাত্রশক্তি, যুবশক্তি এবং শ্রমিক শক্তির শীর্ষ নেতারা। কর্মসূচি উপলক্ষ্যে কানাইঘাট উপজেলা এনসিপি এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানায়।
১১ দলীয় ঐক্যের নিন্দা ও প্রতিবাদ : মঙ্গলবার হবিগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমের গাড়িবহরে হামলা এবং বুধবার মৌলভীবাজার থেকে হবিগঞ্জ যাওয়ার পথে বিভিন্ন স্থানে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামসহ এনসিপির জ্যেষ্ঠ নেতৃবৃন্দকে পুলিশ কর্তৃক বাধাদান ও হেনস্তার ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ বুধবার এক বিবৃতি দিয়েছেন। বিবৃতিতে তিনি বলেন, গত ২৮ জুলাই সন্ধ্যা ৭টায় হবিগঞ্জ শহরের কোর্ট মসজিদ ও জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনে ‘জুলাই পদযাত্রা-২০২৬’ কর্মসূচি শেষে ফেরার পথে এনসিপি শীর্ষ নেতৃবৃন্দের গাড়িবহরে সন্ত্রাসী হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়। ওই হামলার প্রতিবাদে ২৯ জুলাই হবিগঞ্জে এক কর্মসূচিতে যোগ দিতে যাওয়ার পথে ১৪৪ ধারা জারি করে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলসহ বিভিন্ন স্থানে নাহিদ ইসলাম এমপিসহ এনসিপির জ্যেষ্ঠ নেতাদের পুলিশ কর্তৃক আটকে দেওয়া গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের শামিল। আমরা এই ধরনের আচরণের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। একই সঙ্গে দায়ীদের চিহ্নিত করে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি।








































