সংগৃহীত ছবি
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ংয়ের কোরীয় যুদ্ধ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ করে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবে এখনো কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি উত্তর কোরিয়া। এর মধ্যেই দুই দেশের সীমান্তে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে।
রবিবার দক্ষিণ কোরিয়ার সেনারা উত্তর কোরিয়ার কয়েকজন সেনার দিকে সতর্কতামূলক গুলি ছুড়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার বার্তা সংস্থা ইয়োনহাপ জানিয়েছে, উত্তর কোরিয়ার কয়েকজন সেনা অল্প সময়ের জন্য দুই দেশের সীমান্তের নির্ধারিত সামরিক সীমারেখা অতিক্রম করে দক্ষিণ কোরিয়ার দিকে ঢুকে পড়েছিলেন। দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, গত সপ্তাহে পূর্বাঞ্চলীয় অসামরিকীকৃত এলাকা বা ডিমিলিটারাইজড জোনে (ডিএমজেড) এ ঘটনা ঘটে। উত্তর কোরিয়ার একাধিক সেনা নির্ধারিত সামরিক সীমারেখা পেরিয়ে দক্ষিণের দিকে এগিয়ে এলে দক্ষিণ কোরিয়ার সেনারা সতর্কবার্তা দেয় এবং পরে সতর্কতামূলক গুলি ছোড়ে।
গুলির শব্দ ও সতর্কবার্তা পাওয়ার পর উত্তর কোরিয়ার সেনারা দ্রুত সীমারেখার নিজেদের পাশে ফিরে যায়। দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক কর্মকর্তাদের ধারণা, ওই সেনারা নিয়মিত টহল দিচ্ছিলেন। চলতি বছরে সামরিক সীমারেখা অতিক্রমের ঘটনায় দক্ষিণ কোরিয়ার সেনাদের সতর্কতামূলক গুলি ছোড়ার এটিই প্রথম ঘটনা। এর আগে ২০২৫ সালেও সীমান্ত এলাকায় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরির সময় উত্তর কোরিয়ার সেনারা অল্প সময়ের জন্য সামরিক সীমারেখা অতিক্রম করেছিলেন।
সীমান্তে এই সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই দক্ষিণ কোরিয়ার নতুন শান্তি প্রস্তাবে নীরব রয়েছে পিয়ংইয়ং। শনিবার জাপানের ঔপনিবেশিক শাসন থেকে কোরিয়ার মুক্তির ৮১তম বার্ষিকী উপলক্ষে দেওয়া ভাষণে প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং দুই কোরিয়ার মধ্যে আবার আলোচনা শুরুর প্রস্তাব দেন। লি বলেন, ১৯৫৩ সালের যুদ্ধবিরতি চুক্তির পরিবর্তে একটি স্থায়ী শান্তি ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। পাশাপাশি উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও পারস্পরিক উন্নয়নের ওপরও জোর দেন তিনি।
দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট ইউন সুক ইওল সামরিক আইন জারির চেষ্টা করায় অভিশংসিত হওয়ার পর গত বছর প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন লি।ভাষণে তিনি আশা প্রকাশ করেন, দুই কোরিয়া যেন ‘শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও পারস্পরিক উন্নতির জন্য মুখোমুখি বসতে পারে।’ তবে রবিবার সকাল পর্যন্ত উত্তর কোরিয়ার সরকারি সংবাদমাধ্যমগুলো লির এই বক্তব্য নিয়ে কোনো প্রতিবেদন বা প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেনি। দেশটির প্রধান সরকারি সংবাদ সংস্থা কোরিয়ান সেন্ট্রাল নিউজ এজেন্সি এবং রোদং সিনমুন পত্রিকাতেও এ বিষয়ে কোনো খবর প্রকাশ করা হয়নি।
ইয়োনহাপের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব সংবাদমাধ্যমে জাপানের কাছ থেকে কোরিয়ার মুক্তির বার্ষিকী উপলক্ষে উত্তর কোরিয়ার অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন আয়োজনের খবরই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। এর মধ্যে সাবেক নেতা কিম ইল সুং ও কিম জং ইলের স্মৃতিসৌধে আনুগত্যের শপথ নেওয়ার খবরও রয়েছে। ১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত চলা কোরীয় যুদ্ধ কোনো আনুষ্ঠানিক শান্তি চুক্তির মাধ্যমে শেষ হয়নি। ১৯৫৩ সালে যুদ্ধবিরতি চুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধ থামানো হয়। এ কারণে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া এখনো যুদ্ধাবস্থায় রয়েছে। দুই দেশকে আলাদা করে রেখেছে ২৫০ কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ একটি কঠোরভাবে সুরক্ষিত সীমান্ত। এটি বিশ্বের অন্যতম সামরিকীকৃত সীমান্ত হিসেবে পরিচিত।
দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের বড় বাধা হয়ে আছে সীমান্তের সামরিক উত্তেজনা, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক মহড়া। কোরীয় উপদ্বীপে সামরিক প্রস্তুতি এমন সময় বাড়ছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার বার্ষিক যৌথ সামরিক মহড়া ‘উলচি ফ্রিডম শিল্ড’ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে সোমবার। পিয়ংইয়ং নিয়মিত এই যৌথ মহড়ার বিরোধিতা করে। উত্তর কোরিয়ার দাবি, এসব মহড়া তাদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য হামলার প্রস্তুতি। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়া বলে আসছে, এসব মহড়া তাদের প্রতিরক্ষামূলক সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য পরিচালিত হয়। উত্তর কোরিয়া নিয়মিত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালায়। এসব ক্ষেপণাস্ত্রের কিছু পরমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম। সিউল ও জাপান এসব ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা উত্তর কোরিয়ার শক্তি প্রদর্শন ও ভয় দেখানোর চেষ্টা হিসেবে দেখে।
২০২২ সালে উত্তর কোরিয়া নিজেকে একটি পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিরুদ্ধে নিজেদের পারমাণবিক ও সামরিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা আরো শক্তিশালী করার অঙ্গীকার করে আসছে দেশটি। এদিকে কোরিয়ার জাপানি ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তির বার্ষিকী উপলক্ষে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কও আরো জোরদার করছে উত্তর কোরিয়া। শনিবার রাশিয়ার জাহাজ ‘পাল্লাদা’ বন্ধুত্বপূর্ণ সফরে উত্তর কোরিয়ার ওনসান বন্দরে পৌঁছেছে।
এ ছাড়া উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক আরো গভীর করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। মুক্তির বার্ষিকী উপলক্ষে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে পাঠানো এক বার্তায় তিনি এ কথা বলেন। উত্তর কোরিয়ার সরকারি সংবাদ সংস্থার বরাতে রবিবার চ্যানেল নিউজ এশিয়া এ তথ্য জানিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে সমর্থন দিতে উত্তর কোরিয়া সেনা ও অস্ত্র পাঠানো শুরু করার পর পিয়ংইয়ং ও মস্কোর সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠ হয়েছে। ১৯৫০-এর দশকের কোরীয় যুদ্ধের পর কোনো বিদেশি যুদ্ধে উত্তর কোরিয়ার এটাই সবচেয়ে বড় ধরনের সামরিক অংশগ্রহণ বলে মনে করা হয়।










































