প্রতীকী ছবি
যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে বছরের পর বছর ছদ্মবেশে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করা এবং একাধিক সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক ধ্বংস করতে সাহায্য করা কসোভো বংশোদ্ভূত এক ব্যক্তিকে এখন বাধ্যতামূলকভাবে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর (ডিপোর্ট) উদ্যোগ নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। সিবিএস নিউজের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের বরাতে এ খবর জানিয়েছে এনডিটিভি।
ভুক্তভোগী ওই ব্যক্তির নাম ব্লেয়ারিম স্কোরো (৫৫)। তিন সন্তানের এই জনক দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। গত ৩ আগস্ট নিউ জার্সির একটি অভিবাসন কার্যালয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নবায়ন করতে গেলে মার্কিন ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) তাকে গ্রেপ্তার করে।
স্কোরোর আইনজীবীরা তার বহিষ্কারাদেশ ঠেকাতে ইতিমধ্যেই দেশটির ফেডারেল আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন।তাদের যুক্তি, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর হয়ে কাজ করার কারণে কসোভোতে তার প্রাণনাশের চরম ঝুঁকি রয়েছে। আর এই ঝুঁকির কথা বিবেচনা করেই এর আগে আদালত তাকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন।
নিউজিল্যান্ডের ইমিগ্রেশন অফিসে গ্রেপ্তারের সময় স্কোরোর পাশে ছিলেন তার স্ত্রী সুসান স্কোরো। ক্ষোভ ও আক্ষেপ প্রকাশ করে তিনি সিবিএস নিউজকে বলেন, ‘তারা ওর সঙ্গে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।ও নিজের সাজা খেটেছে, দেশের জন্য প্রাণ দিতে বসেছিল—অথচ এখন কারও কিছু আসে যায় না! ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমার যোগ্য।’
তিনি আরো বলেন, ‘ওকে বিশ্বের কোথাও নিরাপদে ফেরত পাঠানো সম্ভব নয়, আমরা সবসময় জীবনের ঝুঁকিতে থাকি।’
বর্তমানে স্ট্যাটেন আইল্যান্ডে ট্যাক্সিচালক হিসেবে কর্মরত স্কোরোর স্ত্রী ও সন্তানরা আমেরিকান নাগরিক। আইনজীবীদের দাবি, মার্কিন আইনশৃঙ্খলা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করার বিনিময়ে তাকে আমেরিকায় স্থায়ীভাবে বসবাসের মৌখিক আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০০ সালে হেরোইন পাচারের অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়ার পরেই মার্কিন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে স্কোরোর সম্পর্কের সূচনা হয়।১৯৯৪ সালে কসোভো সংঘাত থেকে বাঁচতে যুক্তরাষ্ট্রের আশ্রয় চেয়েছিলেন তিনি। সেখানে গিয়ে পরিবার সামলাতে না পেরে অপরাধের জগতে জড়িয়ে পড়েন।
পেনসিলভানিয়ার একটি ফেডারেল কারাগারে সাজা খাটার সময় স্কোরো উগ্রপন্থীদের সান্নিধ্যে আসেন। সেখান থেকেই এফবিআই-এর ‘গোপন তথ্যদাতা’ হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার পর সিআইএ তার এই যোগাযোগকে কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নেয়। ২০০২ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে কারাগারে বসেই তিনি লাকাওয়ানা সিক্স, ভার্জিনিয়া জিহাদ নেটওয়ার্ক এবং হিজবুল্লাহর মতো শীর্ষ সন্ত্রাসী সংগঠনের তথ্য মার্কিন গোয়েন্দাদের হাতে তুলে দেন।
এমনকি সিবিএস নিউজের হাতে আসা ২০০৪ সালের এফবিআই-এর নথি থেকে জানা যায়, ওসামা বিন লাদেনের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি তদন্তেও তথ্যদাতা ছিলেন স্কোরো। সিরিয়ার একটি সন্ত্রাসী প্রশিক্ষণ ক্যাম্পসহ তার দেওয়া বেশ কিছু তথ্য ছিল অত্যন্ত নিখুঁত ও কার্যকর।
২০০৭ সালে সাজা শেষে কসোভোতে ফেরত পাঠানোর পরও সিআইএ-এর অনুরোধে বলকান অঞ্চলে আল-কায়েদা নেটওয়ার্কে অনুপ্রবেশের কাজ চালিয়ে যান স্কোরো। আইনি নথিপত্র অনুযায়ী, তিনি ছদ্মবেশে সিরিয়া, লেবানন, জর্ডান, পাকিস্তান এবং মিসর ভ্রমণ করেন। ২০০৯ সাল পর্যন্ত চলে তার এই গোপন মিশন। সিআইএ, এফবিআই এবং ইউএস ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (ডিইএ) হয়ে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেছেন তিনি।
২০১৪ সালে কসোভোতে এক হামলায় পায়ে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর নিজের পরিচয় ফাঁস হয়ে গেছে বুঝতে পেরে কানাডা হয়ে পুনরায় যুক্তরাষ্ট্রে অনুপ্রবেশ করেন স্কোরো। পরে ২০১৬ সালে মেয়ের ডিসকাউন্ট কার্ড ব্যবহার করায় নিউইয়র্ক পুলিশ তাকে আটক করলে বিষয়টি আবারও ইমিগ্রেশনের হাতে যায়।
এরপর ২০২২ সালের নভেম্বরে জাতিসংঘের ‘কনভেনশন এগেইনস্ট টর্চার’-এর আওতায় এক আমেরিকান বিচারক রায় দেন যে, কসোভোতে নির্যাতন বা হত্যার আশঙ্কা থাকায় স্কোরোকে সেখানে ফেরত পাঠানো যাবে না। তবে এই রায়ে তাকে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি দেওয়া হয়নি।
বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসন অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ায় নতুন করে আইসিই-এর হাতে বন্দি হতে হয়েছে তাকে। নিউ জার্সির এলিজাবেথ ডিটেনশন সেন্টার থেকে সিবিএস নিউজকে তিনি কাতর কণ্ঠে বলেন, ‘আমি ভাবতেও পারিনি তারা আমার সঙ্গে এভাবে বিশ্বাসঘাতকতা করবে। দয়া করে আমাকে বাঁচান, আমি যদি মারাও যাই, এই দেশেই মরতে চাই যেন আমার সন্তানরা আমাকে এখানেই কবর দিতে পারে।’









































