ইতিহাসের সবচেয়ে নিষ্ঠুর ৮ স্বৈরশাসক

‘ভালোবাসা ও ভয়, দুটিরই পাত্র হওয়া সম্ভব না হলে ভালোবাসার চেয়ে ভয় জাগানোই ভালো’- নিকোলো ম্যাকিয়াভেলির এই কথাটি ইতিহাসের অনেক স্বৈরশাসকের শাসনের সঙ্গে মিলে যায়। ইতিহাসের সবচেয়ে নিষ্ঠুর স্বৈরশাসকদের ক্ষেত্রে এই কথাটি বেশ মানানসই।বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্বৈরশাসকেরা নিজেদের জনগণের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে যুদ্ধ, গণহত্যা, দুর্ভিক্ষ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মতো নিষ্ঠুর পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। ইতিহাসে এমন নিষ্ঠুর শাসক অনেক ছিলেন। তবে তাদের মধ্যে আটজনের নৃশংস কর্মকাণ্ড অন্যদের ছাড়িয়ে গেছে। এই লেখায় ইতিহাসের সবচেয়ে নিষ্ঠুর আট স্বৈরশাসককে তুলে ধরা হলো।তাদের মধ্যে কে সবচেয়ে নিষ্ঠুর ছিলেন, সেই সিদ্ধান্ত আপনার।

১. মাও সে তুং

শাসনকাল : ১৯৪৯–১৯৭৬

চীনের কমিউনিস্ট বিপ্লবের অন্যতম প্রধান নেতা ছিলেন মাও সে তুং। ১৯৪৯ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার পর দেশটির ক্ষমতায় আসেন তিনি। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ার লক্ষ্যে মাও বেশ কিছু বড় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মসূচি নেন।এর মধ্যে কিছু উদ্যোগ ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে। বিশেষ করে তার শিল্পায়ন ও কৃষিনীতির ব্যর্থতার কারণে চীনে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, সেই দুর্ভিক্ষে কয়েক কোটি মানুষ মারা যায়। একই সময়ে রাজনৈতিক বিরোধিতা দমনেও কঠোর ছিলেন মাও। তার শাসনামলে অসংখ্য মানুষকে কারাবন্দি, নির্যাতন ও মৃত্যুর মুখে পড়তে হয়।এ কারণেই মাওকে বিশ শতকের সবচেয়ে ভয়ংকর শাসকদের একজন হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

1

২. আটিলা দ্য হান

শাসনকাল: ৪৩৪–৪৫৩ খ্রিস্টাব্দ

ইউরোপের ইতিহাসে ভয়ংকর যোদ্ধা হিসেবে পরিচিত আটিলা দ্য হান। তিনি ছিলেন হানদের রাজা। তার নেতৃত্বে হান বাহিনী ইউরোপের বিস্তীর্ণ এলাকায় অভিযান চালায়। আটিলার নাম শুনলেই যুদ্ধ আর ধ্বংসের কথা মনে পড়ে। তার বাহিনী কোনো এলাকা দখল করার সময় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালাত। জনপদ পুড়িয়ে দেওয়া এবং মানুষের ঘরবাড়ি ধ্বংস করা ছিল তাঁদের যুদ্ধকৌশলের অংশ। রোমানরা তাকে এতটাই ভয় পেত যে ‘ঈশ্বরের অভিশাপ’ নামেও ডাকত। আটিলাকে নিয়ে প্রচলিত একটি কথাও বেশ পরিচিত- তার ঘোড়া যেখানে পা ফেলত, সেখানে নাকি আর ঘাস জন্মাত না। তার বিশাল বাহিনী ইউরোপের তৎকালীন সাম্রাজ্যগুলোর জন্য বড় আতঙ্ক হয়ে উঠেছিল।

2

৩. ইভান দ্য টেরিবল

শাসনকাল: ১৫৩৩–১৫৮৪

রাশিয়ার ইতিহাসে ইভান চতুর্থ ভাসিলিয়েভিচ ‘ইভান দ্য টেরিবল’ নামেই বেশি পরিচিত। ১৫৪৭ সালে তিনি রাশিয়ার জার হন। শুরুতে শক্তিশালী শাসক হিসেবে পরিচিত হলেও সময়ের সঙ্গে তার মধ্যে সন্দেহ ও নিষ্ঠুরতা বাড়তে থাকে। বিশেষ করে তার স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তিনি মনে করতে শুরু করেন, শত্রুরা তাকে বিষ দিয়ে হত্যা করেছে। এরপর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে শুরু হয় কঠোর দমন-পীড়ন। ইভান ‘অপ্রিচনিনা’ নামে একটি বিশেষ বাহিনী গড়ে তোলেন। এই বাহিনী তার নির্দেশে বিরোধীদের দমন করত। হত্যা, নির্যাতন ও লুটপাটের অভিযোগও ছিল তাদের বিরুদ্ধে। ইভানের নিষ্ঠুরতা শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তার নিজের পরিবারও এর বাইরে ছিল না। এমনকি প্রচণ্ড রাগের সময় নিজের ছেলে ইভান ইভানোভিচকে হত্যা করার ঘটনাও তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

3

৪. তৈমুর লং

শাসনকাল: ১৩৭০–১৪০৫

তৈমুর ছিলেন মধ্য এশিয়ার একজন শক্তিশালী সামরিক শাসক ও বিজেতা। তার সাম্রাজ্য পশ্চিম ও মধ্য এশিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছিল। তবে বিজয়ের সঙ্গে সঙ্গে তার নাম জড়িয়ে আছে ভয়াবহ নিষ্ঠুরতার সঙ্গেও। বিদ্রোহ দমনের ক্ষেত্রে তৈমুর অত্যন্ত কঠোর ছিলেন। তাঁর বাহিনী বহু শহর দখলের পর ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালাত। ইরানের ইসফাহান শহরে বিদ্রোহের পর তার বাহিনী গণহত্যা চালায় বলে ইতিহাসে উল্লেখ আছে। প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, নিহত মানুষের মাথা দিয়ে সেখানে মিনার তৈরি করা হয়েছিল। তার যুদ্ধের অন্যতম লক্ষ্য ছিল শুধু কোনো অঞ্চল দখল করা নয়, বরং শত্রুর মনে ভয় তৈরি করা। সেই ভয়ই তাকে তার সময়ের অন্যতম নিষ্ঠুর শাসকে পরিণত করে।

4

৫. ভ্লাদ দ্য ইমপেলার

শাসনকাল: ১৪৪৮, ১৪৫৬–১৪৬২ এবং ১৪৭৬–১৪৭৭

ভ্লাদ তৃতীয় ছিলেন বর্তমান রোমানিয়ার ওয়ালাচিয়া অঞ্চলের শাসক। তিনি ‘ভ্লাদ দ্য ইমপেলার’ নামেই বেশি পরিচিত। এই নামের পেছনে রয়েছে তার ভয়ংকর শাস্তির পদ্ধতি। তিনি শত্রু ও অপরাধীদের শূলে চড়ানোর জন্য কুখ্যাত ছিলেন। তার শাসনামলে বহু মানুষকে শূলে চড়ানো হয় বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনায় পাওয়া যায়। এ ছাড়া হত্যা ও নির্যাতনের আরও অনেক পদ্ধতি ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।  ভ্লাদের এই নিষ্ঠুরতার গল্প পরবর্তী সময়ে আরো জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ধারণা করা হয়, তার জীবন ও কর্মকাণ্ডই লেখক ব্রাম স্টোকারের বিখ্যাত ‘ড্রাকুলা’ চরিত্রের অন্যতম অনুপ্রেরণা ছিল।

5

৬. ইদি আমিন

শাসনকাল: ১৯৭১–১৯৭৯

উগান্ডার সাবেক শাসক ইদি আমিনকে অনেক সময় ‘উগান্ডার কসাই’ বলা হয়। ১৯৭১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তিনি দেশটির ক্ষমতা দখল করেন। এরপর প্রায় আট বছর কঠোর হাতে উগান্ডা শাসন করেন।  ক্ষমতায় আসার পর রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন করতে ব্যাপক হত্যা ও নির্যাতন চালানো হয়। বিশেষ করে আচোলি ও লাঙ্গো জনগোষ্ঠীর বহু মানুষ তার শাসনের সময় নিহত হন। ১৯৭২ সালে তিনি উগান্ডার এশীয় জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করেন। তাদের অনেকেই ছিলেন ব্যবসায়ী। এর ফলে দেশটির অর্থনীতিতেও বড় ধরনের ধাক্কা লাগে। তার শাসনামলে অন্তত ৩ লাখ বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছিল বলে বিভিন্ন হিসাব রয়েছে।

6

৭. অ্যাডলফ হিটলার

শাসনকাল: ১৯৩৩–১৯৪৫

ইতিহাসের সবচেয়ে পরিচিত স্বৈরশাসকদের তালিকায় অ্যাডলফ হিটলারের নাম থাকবেই। তার শাসন শুধু জার্মানিকে নয়, পুরো বিশ্বকে ভয়াবহ এক যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়। ১৯৩৩ সালে জার্মানির ক্ষমতায় আসেন হিটলার। তার নেতৃত্বাধীন নাৎসি দলের আদর্শ ছিল চরম জাতীয়তাবাদ ও ইহুদিবিদ্বেষ। ক্ষমতায় আসার পর রাজনৈতিক বিরোধীসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ওপর নির্যাতন শুরু হয়। পরে ইহুদিরাও হয়ে ওঠে নাৎসিদের প্রধান লক্ষ্য। ইহুদিদের বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা চালানো হয়। তাদের নানা অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। পরে শুরু হয় আরো ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ। ১৯৪১ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে চলা হলোকাস্টে প্রায় ৬০ লাখ ইহুদি নিহত হন। এ ছাড়া আরও বহু মানুষ নাৎসি বন্দিশিবির ও হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। হিটলারের আগ্রাসী নীতির ফলেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধও ভয়াবহ রূপ নেয়। তাই তার নাম ইতিহাসে নিষ্ঠুরতা ও ধ্বংসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।

৭

৮. জোসেফ স্টালিন

শাসনকাল : ১৯২২–১৯৫৩

সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্যতম শক্তিশালী নেতা ছিলেন জোসেফ স্টালিন। ১৯২০-এর দশক থেকে ১৯৫৩ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি দেশটির রাজনীতিতে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেন। দ্রুত শিল্পায়নের পাশাপাশি কৃষিতে বাধ্যতামূলক সমবায় ব্যবস্থা চালু করেন স্টালিন। এসব নীতির ফলে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিভিন্ন অঞ্চলে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। লাখ লাখ মানুষ অনাহারে মারা যায়। এরপর রাজনৈতিক বিরোধীদের বিরুদ্ধে শুরু হয় ব্যাপক দমন-পীড়ন। ১৯৩০-এর দশকের ‘মহাশুদ্ধি অভিযান’-এ বিপুলসংখ্যক মানুষকে গ্রেপ্তার, নির্বাসন ও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। অনেককে পাঠানো হয় ‘গুলাগ’ নামে পরিচিত শ্রমশিবিরে। সেখানে কঠিন পরিবেশে কাজ করতে গিয়ে বহু মানুষ মারা যান। স্টালিনের শাসন তাই সোভিয়েত ইউনিয়নের ইতিহাসে একদিকে শিল্পায়ন ও শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠনের সময় হলেও, অন্যদিকে ব্যাপক দমন-পীড়ন ও প্রাণহানির জন্যও স্মরণীয়।

৮

ক্ষমতার জন্য যুদ্ধ, হত্যা, নির্যাতন ও ভয় দেখানোর পথ বেছে নেওয়া এসব শাসকের গল্প ইতিহাসেরই অংশ। তাদের সময়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও কর্মকাণ্ড নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে নানা মতভেদ থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট যে, এই শাসনগুলো অসংখ্য মানুষের জীবনে ভয়াবহ প্রভাব ফেলেছিল।

LEAVE A REPLY