৯০০ বছর আগে যে পথে বদলে গেল মালদ্বীপ

ভারত মহাসাগরের নীল জলরাশি। চারদিকে ছড়িয়ে থাকা ছোট ছোট দ্বীপ।আজকের মালদ্বীপকে দেখলে মনে হয়, এই দ্বীপদেশের পরিচয় যেন ইসলাম ও সমুদ্রকে ঘিরেই। কিন্তু প্রায় ৯০০ বছর আগে ছবিটা ছিল অন্য রকম। তখন মালদ্বীপ ছিল একটি বৌদ্ধ রাজ্য। দ্বীপগুলোর মাটির নিচে, প্রবালের তৈরি ঢিবিতে আর ভাঙা স্থাপনার ধ্বংসাবশেষে এখনো সেই পুরনো সময়ের চিহ্ন পাওয়া যায়।মজার বিষয় হলো, এই হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের সন্ধান মিলেছিল একটি জাহাজডুবির সূত্র ধরে।

১৮৭৯ সালে ব্রিটিশ বাষ্পচালিত জাহাজ সি গাল ভারত মহাসাগরে একটি প্রবালপ্রাচীরে ধাক্কা খেয়ে ডুবে যায়। ঘটনাটি ঘটে বর্তমান মালদ্বীপের কাছাকাছি এলাকায়। জাহাজডুবির কারণ খুঁজতে কয়েক বছর পর মালদ্বীপে আসেন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক কর্মকর্তা হ্যারি চার্লস পুরভিস বেল।কিন্তু সরকারি দায়িত্ব পালন করতে এসে তিনি এমন কিছু দেখতে পেলেন, যা তাকে মালদ্বীপের বহু পুরোনো ইতিহাসের দিকে নিয়ে যায়। দ্বীপগুলোতে তিনি দেখতে পান অদ্ভুত কিছু ঢিবি। স্থানীয়রা এসব ঢিবিকে বলত ‘হাভিট্টা’ বা ‘উস্তুবু’। বেল বুঝতে পারেন, এগুলো সাধারণ মাটির ঢিবি নয়। এর নিচে হয়তো লুকিয়ে আছে পুরোনো কোনো স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ।এরপর তিনি আবার মালদ্বীপে ফিরে আসেন। শুরু হয় অনুসন্ধান ও খনন। ধীরে ধীরে সামনে আসে বৌদ্ধ মঠ, স্তূপ এবং ধর্মীয় স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ। অর্থাৎ, জাহাজডুবির তদন্ত করতে এসে বেল যেন আবিষ্কার করলেন আরেকটি ডুবে যাওয়া ইতিহাস।

গবেষকদের ধারণা, খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকের দিকে মালদ্বীপে বৌদ্ধধর্মের প্রভাব শুরু হয়। কয়েক শতাব্দী ধরে এই ধর্ম দ্বীপগুলোর সমাজ, স্থাপত্য, আত্মীয়তার সম্পর্ক ও সংস্কৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রথম দিকে মালদ্বীপের বৌদ্ধধর্মকে শ্রীলঙ্কার থেরবাদ ধারার সঙ্গে যুক্ত করা হতো। পরে পাওয়া প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে মহাযান ও বজ্রযান বৌদ্ধধর্মের প্রভাবও দেখা যায়। বিভিন্ন দ্বীপে পাওয়া গেছে স্তূপ, মঠ এবং প্রবাল পাথরের তৈরি ভাস্কর্য। কিছু নিদর্শনে হিন্দু-বৌদ্ধ ঐতিহ্যেরও ছাপ রয়েছে। এসব আবিষ্কার শুধু মালদ্বীপের পুরোনো ধর্মীয় ইতিহাসই নয়, ভারত ও শ্রীলঙ্কার সঙ্গে দ্বীপগুলোর প্রাচীন যোগাযোগের কথাও জানায়। ইতিহাসবিদ নাসিমা মোহাম্মদের গবেষণায়ও ইসলাম আসার আগে মালদ্বীপে হিন্দুধর্মের উপস্থিতির ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

মালদ্বীপে ইসলাম গ্রহণের প্রচলিত ইতিহাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র দেশটির শেষ বৌদ্ধ রাজা ধোভেমি। ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ৫৪৮ হিজরি বা ১১৫৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। এরপর তিনি ‘সুলতান মুহাম্মদ আল-আদিল’ নাম গ্রহণ করেন। রাজ্যের ধর্ম ও রাষ্ট্রব্যবস্থাতেও শুরু হয় বড় পরিবর্তন। বৌদ্ধ রাজ্য পরিণত হয় ইসলামী সালতানাতে। এ বছর মালদ্বীপে সেই ঘটনার ৯০০ হিজরি বছর পূর্তি পালন করা হচ্ছে। হিজরি বছর সৌর বছরের চেয়ে প্রায় ১১ দিন ছোট হওয়ায় ৯০০ হিজরি বছর গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে প্রায় ৮৭৩ বছরের সমান। মালদ্বীপে ইসলাম গ্রহণ ও তা চালু করার সময় উত্তর ভারতের দিল্লি সালতানাতের বয়স ছিল ৫৩ বছর। আরবদের সিন্ধু বিজয়ের প্রায় ৪৪২ বছর পর এ ঘটনা ঘটে।

রাজা কেন ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন—এ প্রশ্নের একটি রোমাঞ্চকর উত্তর পাওয়া যায় মরক্কোর পর্যটক ইবনে বতুতার বর্ণনায়। চতুর্দশ শতকে মালদ্বীপ সফর করেছিলেন ইবনে বতুতা। তার বর্ণনায় রয়েছে এক সমুদ্রদানব, এক তরুণী এবং একজন মুসলিম ধর্মীয় পণ্ডিতের গল্প। কথিত আছে, ‘রান্নামারি’ নামের এক সমুদ্রদানব প্রতি মাসে এটি সমুদ্র থেকে উঠে আসতো। এই দানবটিকে শান্ত রাখতে প্রতি মাসে একজন করে তরুণীকে বলি দিতে হতো।। একবার এক মুসলিম ধর্মীয় পণ্ডিত ওই তরুণীর বদলে মন্দিরে রাত কাটানোর সিদ্ধান্ত নেন। তিনি সারা রাত কোরআনের আয়াত পড়তে থাকেন। কিন্তু সেই রাতে দানব আর আসেনি। ঘটনাটিকে অলৌকিক ঘটনা হিসেবে দেখানো হয়। এরপর বৌদ্ধ রাজা ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তার প্রজাদেরও ইসলাম গ্রহণ করতে বলেন—এমনটাই রয়েছে মালদ্বীপের প্রাচীন উপকথার বর্ণনায়।

তবে ইতিহাসবিদেরা এই ঘটনাকে নিশ্চিত ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে দেখেন না। বরং এটি ইসলাম গ্রহণের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি কিংবদন্তি বলেই মনে করা হয়। মুসলিম ধর্মীয় নেতা আবু আল-বারাকাতের পরিচয় নিয়েও মতভেদ রয়েছে। ইবনে বতুতা তাকে মাগরিবি বলে উল্লেখ করলেও অন্য কিছু বর্ণনায় তাকে সোমালিয়ার মানুষ বলা হয়েছে। শুধু ধর্মীয় গল্প দিয়ে মালদ্বীপে ইসলামের বিস্তার ব্যাখ্যা করা কঠিন। মালদ্বীপ ছিল ভারত মহাসাগরের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথে। আরব, পূর্ব আফ্রিকা, ভারত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া- বিভিন্ন অঞ্চলের ব্যবসায়ীদের যাতায়াত ছিল এই এলাকায়। মালদ্বীপের কড়ি ছিল গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপণ্য। এসব কড়ি এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে মুদ্রা হিসেবে ব্যবহার করা হতো। নারকেল, নারকেলের আঁশ, মসলা ও শুকনো মাছও ছিল দ্বীপগুলোর গুরুত্বপূর্ণ পণ্য। ফলে মুসলিম ব্যবসায়ী ও ধর্মীয় ব্যক্তিদের সঙ্গে মালদ্বীপের মানুষের নিয়মিত যোগাযোগ তৈরি হয়েছিল। এই যোগাযোগই রাজপরিবারের ইসলাম গ্রহণের পথ সহজ করে থাকতে পারে বলে গবেষকদের ধারণা।

এখানেই মালদ্বীপের ইতিহাসের আরেকটি কঠিন অধ্যায় সামনে আসে। সরকারি বর্ণনায় মালদ্বীপের ইসলাম গ্রহণকে সাধারণত শান্তিপূর্ণ ও সম্পূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে তুলে ধরা হয়। কিন্তু কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও মধ্যযুগের তামার পাতের নথি ভিন্ন চিত্র দেখায়। ১১৯৫ ও ১১৯৬ সালের তামার পাতের নথিতে ইসলাম গ্রহণের কয়েক দশক পর দক্ষিণের দ্বীপগুলোতে বৌদ্ধ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। কিছু নথিতে বৌদ্ধ মঠ ধ্বংস এবং একটি পুরোনো মঠের জায়গায় মসজিদ নির্মাণের কথাও উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ, ইসলাম রাষ্ট্রধর্মে পরিণত হওয়ার পরও দ্বীপগুলোর সব জায়গায় পরিবর্তন একসঙ্গে ঘটেনি। কোথাও পুরনো ধর্মীয় স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয়েছে, আবার কোথাও পুরোনো রীতিনীতি দীর্ঘ সময় টিকে ছিল।

মালদ্বীপে বৌদ্ধ অতীতের অনেক স্মৃতিই এখন আর নেই। ২০১২ সালে রাজধানী মালেতে জাতীয় জাদুঘরে হামলা চালিয়ে ইসলাম-পূর্ব সময়ের বিপুলসংখ্যক নিদর্শন ধ্বংস করা হয়। এর মধ্যে অনেক বৌদ্ধ ভাস্কর্যও ছিল। তবু দ্বীপগুলোর বিভিন্ন জায়গায় এখনো প্রবালের তৈরি ঢিবি, পুরোনো স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ এবং মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা কাঠামো সেই অতীতের কথা মনে করিয়ে দেয়। মালদ্বীপের ব্যঙ্গ লেখক ইয়ামিন রশিদকে ২০১৭ সালে ‘ইসলাম নিয়ে ব্যঙ্গ করার’ অভিযোগে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। তিনি ২০১১ সালে একটি লেখায় বলেছিলেন, ‘মালদ্বীপে পাওয়া দ্বাদশ শতকের তামার পাতের নথি দেশটির ইসলাম গ্রহণের রক্তাক্ত ও কষ্টের প্রক্রিয়ার কথা জানায়। সে সময়ের সুলতানরা বৌদ্ধ ভিক্ষুদের রাজধানীতে এনে তাদের শিরশ্ছেদ করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন।’ ২০১৮ সালে মালদ্বীপ ইন্ডিপেন্ডেন্টে প্রকাশিত ওই লেখায় রশিদ আরো লিখেছিলেন, ‘আধুনিক মালদ্বীপ অনেক সহজ পথ নিয়েছে। ২০০৮ সালের সংবিধান কোনো জনমত যাচাই ছাড়াই একতরফাভাবে সব মালদ্বীপবাসীকে সুন্নি মুসলিম হিসেবে ঘোষণা করেছে।’

২০২২ সালে বিক্ষোভকারীরা যোগব্যায়ামকে ইসলামের বিরোধী বলে দাবি করেন। এরপর তারা ১৫০ জনের বেশি মানুষের অংশ নেওয়া আন্তর্জাতিক যোগ দিবসের অনুষ্ঠানে হামলা চালান এবং সেখানে ভাঙচুর করেন। অনুষ্ঠানে কূটনীতিকরাও উপস্থিত ছিলেন। ভারত-সমর্থিত ওই অনুষ্ঠানে হামলা চালানো হয়। মালদ্বীপের একাংশের মানুষের মধ্যে কট্টরপন্থী চিন্তার বিস্তার থেকেও মুইজ্জু রাজনৈতিকভাবে লাভবান হয়েছেন। রবিবার (১২ সেপ্টেম্বর) ইসলাম গ্রহণের ৯০০ হিজরি বছর পূর্তির অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে মুইজ্জু হুলহুমালে সুলতান মোহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ গ্র্যান্ড মসজিদ ও ইসলামী সভ্যতা কেন্দ্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। সৌদি আরবের আল রাজহিকোম্পানির অর্থায়নে এই প্রকল্প তৈরি হবে। এতে মালদ্বীপের সবচেয়ে বড় মসজিদ থাকবে। পাশাপাশি থাকবে একটি ইসলামী গ্রন্থাগার, একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র এবং একটি কোরআন জাদুঘর।

মালদ্বীপ বর্তমানে নিজেকে ১০০ শতাংশ মুসলিম দেশ হিসেবে পরিচয় দেয়। সংবিধানে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করা হয়েছে। অমুসলিমদের নাগরিক হওয়ার ক্ষেত্রেও সাংবিধানিক বিধিনিষেধ রয়েছে। সম্প্রতি ইসলাম গ্রহণের ৯০০ হিজরি বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুইজ্জু ইসলামকে দেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা রক্ষার ঢাল হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে মালদ্বীপ তার ইসলামী পরিচয়ের দীর্ঘ ইতিহাসকে স্মরণ করছে। কিন্তু সেই পরিচয়ের নিচে চাপা পড়ে আছে আরো পুরোনো একটি অধ্যায়। ১৮৭৯ সালের একটি জাহাজডুবি সেই অধ্যায়ের দরজা খুলে দিয়েছিল। প্রবালের ঢিবি, ভাঙা মঠ, স্তূপ আর প্রাচীন ভাস্কর্য জানিয়ে দেয় মালদ্বীপের ইতিহাস শুধু ৯০০ বছরের ইসলামী ইতিহাস নয়। তারও বহু আগে এই নীল দ্বীপগুলোতে গড়ে উঠেছিল বৌদ্ধ ও হিন্দু-বৌদ্ধ সংস্কৃতির এক জগৎ।

সমুদ্রের ঢেউ অনেক কিছু মুছে দিয়েছে। কিন্তু প্রবালের নিচে, মাটির গভীরে আর কিছু ভাঙা ধ্বংসাবশেষে সেই হারিয়ে যাওয়া মালদ্বীপ এখনো টিকে আছে।

LEAVE A REPLY