আজ নয়, কাল—গুরুত্বপূর্ণ কাজ ফেলে রাখার মনস্তত্ত্ব

সংগৃহীত ছবি

জরুরি কাজটি শেষ করতে হবে, তা জানা আছে। তবু কাজ শুরু করতে ইচ্ছা করছে না।মনে হচ্ছে, আজ নয়, কাল করলেই হবে। এভাবে এক দিন থেকে আরেক দিন পিছিয়ে যাচ্ছে কাজ, বাড়ছে চাপও। অনেকেই এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। তবে গুরুত্বপূর্ণ কাজ বারবার ফেলে রাখার পেছনে সব সময় আলসেমি দায়ী নয়।এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকতে পারে মানসিক অস্বস্তি, ব্যর্থতার ভয় এবং অতিরিক্ত নিখুঁত হওয়ার প্রবণতা।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমস–এর এক প্রতিবেদনে স্পন্দনা হেলথকেয়ারের পরামর্শক আর্ট থেরাপিস্ট ও কাউন্সেলর স্মিথা কাশী কাজ পিছিয়ে দেওয়ার পেছনের মনস্তাত্ত্বিক কারণগুলো ব্যাখ্যা করেছেন।

কেন গুরুত্বপূর্ণ কাজও পিছিয়ে দিই?

মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, কাজ ফেলে রাখা অনেক সময় অস্বস্তিকর অনুভূতি এড়িয়ে যাওয়ার একটি উপায়। কোনো কাজ কঠিন, বিরক্তিকর বা অনিশ্চিত মনে হলে কিংবা ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা থাকলে সেটি শুরু করতেই অনীহা তৈরি হতে পারে।

কাউন্সেলর স্মিথা কাশীর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কাজটি পরে করার সিদ্ধান্ত সাময়িকভাবে মানসিক অস্বস্তি কমাতে পারে। কিন্তু কাজ জমতে থাকলে পরবর্তী সময়ে চাপ ও দুশ্চিন্তা আরও বাড়ে। তা সত্ত্বেও সাময়িক স্বস্তি পাওয়ার অভিজ্ঞতা মানুষকে পরবর্তী সময়েও একইভাবে কাজ পিছিয়ে দিতে উৎসাহিত করতে পারে।

ধরা যাক, পরদিন একটি গুরুত্বপূর্ণ উপস্থাপনা দিতে হবে। প্রস্তুতি নেওয়ার প্রয়োজন জানা সত্ত্বেও কেউ কাজটি শুরু করছেন না।এর কারণ কাজটির গুরুত্ব বুঝতে না পারা নয়; বরং অন্যের সামনে ভুল করার ভয় কিংবা নিজের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারার দুশ্চিন্তা হতে পারে।

নিখুঁত করার চেষ্টা বাধা হয়ে দাঁড়ায়

কাজ পিছিয়ে দেওয়ার আরেকটি কারণ হতে পারে পারফেকশনিজম বা সবকিছু নিখুঁতভাবে করার প্রবণতা। কেউ যদি শুরু থেকেই কাজটি একদম ঠিকঠাক করতে চান, তাহলে ভুল হওয়ার আশঙ্কায় শুরু করতেই দেরি করতে পারেন।

এ ক্ষেত্রে নিজের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারার ভয় কাজটিকে আরও কঠিন করে তোলে। ফলে কাজ শুরু করার বদলে মানুষ বারবার পরিকল্পনা করেন, প্রস্তুতি নিতে থাকেন কিংবা উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষা করেন। অথচ কাজটি শুরু না করলে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগও তৈরি হয় না।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কেন বেশি আকর্ষণীয়?

কাজ পিছিয়ে দেওয়ার সঙ্গে তাৎক্ষণিক আনন্দ পাওয়ার প্রবণতারও সম্পর্ক রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ক্রল করা, ভিডিও দেখা কিংবা বিনোদনমূলক কিছু করা থেকে সঙ্গে সঙ্গে আনন্দ পাওয়া যায়। অন্যদিকে পড়াশোনা, পরীক্ষার প্রস্তুতি বা অফিসের কাজের সুফল পেতে সময় লাগে।

তাই তাৎক্ষণিক আনন্দের সুযোগ সামনে থাকলে দীর্ঘমেয়াদি লাভের জন্য প্রয়োজনীয় কাজের বদলে মানুষ সহজ ও আকর্ষণীয় কাজ বেছে নিতে পারেন। ক্লান্তি, মানসিক চাপ কিংবা আবেগগত অস্থিরতা থাকলে এমন প্রবণতা আরও বাড়তে পারে।

কাজ পিছিয়ে দেওয়ার অভ্যাস কমাবেন কীভাবে?

কাজ ফেলে রাখার অভ্যাস কমাতে নিজেকে অতিরিক্ত চাপ দেওয়ার বদলে কাজটি শুরু করার বাধা কমানো জরুরি। প্রতিবেদনে কয়েকটি কৌশলের কথা বলা হয়েছে।

কাজকে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করুন: বড় কোনো কাজ একবারে শেষ করার চিন্তা চাপ তৈরি করতে পারে। তাই কাজটিকে কয়েকটি ছোট ধাপে ভাগ করে প্রথম ধাপটি শুরু করুন।

মাত্র পাঁচ মিনিটের লক্ষ্য নিন: শুরুতেই অনেকক্ষণ কাজ করার পরিকল্পনা না করে প্রথম পাঁচ মিনিট কাজ করার সিদ্ধান্ত নিন। এতে কাজ শুরু করার বাধা কমতে পারে।

শুরুতেই নিখুঁত হওয়ার চাপ নেবেন না: প্রথম প্রচেষ্টায় সবকিছু ঠিকঠাক না-ও হতে পারে। ভুল সংশোধনের সুযোগ রেখে কাজ শুরু করাই গুরুত্বপূর্ণ।

কাজটি অস্বস্তিকর লাগছে কেন, বুঝতে চেষ্টা করুন: ব্যর্থতার ভয়, অন্যের বিচার নিয়ে উদ্বেগ কিংবা কাজটি অতিরিক্ত কঠিন মনে হওয়া—কোন বিষয়টি আপনাকে আটকে রাখছে, তা শনাক্ত করার চেষ্টা করুন।

তবে কাজ পিছিয়ে দেওয়ার প্রবণতা যদি দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে এবং পড়াশোনা, চাকরি বা দৈনন্দিন জীবনে উল্লেখযোগ্য সমস্যা তৈরি করে, তাহলে মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। উদ্বেগ, বিষণ্নতা কিংবা মনোযোগ-সংক্রান্ত সমস্যার সঙ্গেও এমন প্রবণতার সম্পর্ক থাকতে পারে।

গুরুত্বপূর্ণ কাজ ফেলে রাখার অভ্যাস বদলাতে তাই শুধু সময় ব্যবস্থাপনায় মনোযোগ দিলেই হবে না; কাজটি শুরু করতে মানসিকভাবে কী বাধা তৈরি হচ্ছে, সেটিও বুঝতে হবে। আগামীকাল থেকে শুরু করার অপেক্ষা না করে আজই ছোট একটি পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে সেই পরিবর্তনের প্রথম ধাপ।

LEAVE A REPLY