সিনেমার প্রচারে কোটি কোটি টাকা খরচ না করেও যে বক্স অফিসে ইতিহাস গড়া যায়, তারই নজির স্থাপন করেছে কন্নড় সিনেমা ‘প্রেমাদ ওরালি’। মাত্র ৩ কোটি রুপির কম বাজেটে নির্মিত ছবিটি বিশ্বব্যাপী আয় করেছে ১১৪ কোটি রুপি।বড় তারকা কিংবা চোখধাঁধানো প্রচারণার বদলে গল্পের শক্তি আর ব্যতিক্রমী প্রচারকৌশলেই এই সাফল্য পেয়েছে সিনেমাটি।
ছবিটির বাজেট সীমিত থাকায় প্রচলিত বিপণন কৌশলের পথে হাঁটেননি নির্মাতারা। বরং পরিচালক মনোজ কুমার ও সিনেমাটির কলাকুশলীরা নিজেরাই নেমে পড়েন প্রচারে। সাধারণ যাত্রীবাহী বাসে এবং ট্রেনে উঠে যাত্রীদের হাতে তুলে দেন প্রচারপত্র।তাদের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগই ধীরে ধীরে আলোচনায় নিয়ে আসে ছবিটিকে।
গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে অনেকটা নীরবেই প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় ‘প্রেমাদ ওরালি’। শুরুতে সিনেমাটির প্রদর্শনীর সংখ্যা ছিল হাতেগোনা। প্রথম দিনে আয়ও ছিল ১০ লাখ রুপির কম।কিন্তু দর্শকদের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পেতে শুরু করার পর বদলে যায় ছবিটির বক্স অফিসের চিত্র। মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে সিনেমাটির প্রশংসা। প্রথম সপ্তাহে ৬ কোটি ২০ লাখ রুপি আয় করা ছবিটি দ্বিতীয় সপ্তাহে ব্যবসা করে ৪৮ কোটি রুপি। মাত্র ৬০টি প্রদর্শনী দিয়ে যাত্রা শুরু করা সিনেমাটি তৃতীয় ও চতুর্থ সপ্তাহে কর্ণাটকের ১১০০টিরও বেশি পর্দায় প্রদর্শিত হতে শুরু করে।
এই অভাবনীয় সাফল্যে কন্নড় চলচ্চিত্রশিল্পেও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে ‘প্রেমাদ ওরালি’।‘কান্তারা’ ও ‘কেজিএফ’-এর মতো জনপ্রিয় সিনেমার পাশে জায়গা করে নেওয়ার পাশাপাশি কর্ণাটকের সর্বোচ্চ আয়কারী সিনেমার তালিকায় শীর্ষে ওঠার দৌড়েও এগিয়ে রয়েছে ছবিটি বলে বিভিন্ন বক্স অফিস প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। সিনেমাটির সাফল্যে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন ‘কেজিএফ’ তারকা যশ এবং ‘কান্তারা’খ্যাত ঋষভ শেঠির মতো তারকারাও।
তবে এমন সাফল্যের পেছনে রয়েছে পরিচালকের আর্থিক সংকট, কঠিন সংগ্রাম আর আবেগঘন এক ঘটনা। সিনেমার শুটিং শেষ করতে গিয়ে এমন পরিস্থিতিতে পড়েছিলেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারজয়ী পরিচালক মনোজ কুমার, যখন নিজের মায়ের মঙ্গলসূত্র বন্ধক রাখার কথাও ভাবতে হয়েছিল তাকে। অথচ সেই সিনেমার একটি দৃশ্যই পরে হয়ে ওঠে তার জীবনের স্মরণীয় মুহূর্তগুলোর একটি।
সিনেমাটির শুটিংয়ের সময় কৃত্রিম বৃষ্টির একটি দৃশ্য ধারণ করতে গিয়ে প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল কাজ। ছবির অন্যতম অভিনেত্রী তাপস্বিনী পুনাচা জানিয়েছেন, সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে দৃশ্যটির শুটিং চলছিল। কিন্তু একপর্যায়ে কৃত্রিম বৃষ্টি তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় পানি শেষ হয়ে যায়। তখন স্থানীয় গ্রামবাসীরা এগিয়ে আসেন। নিজেদের নলকূপ থেকে পানি তুলে দিয়ে তারা শুটিং চালিয়ে যেতে সাহায্য করেন।
এদিকে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ব্যস্ততার মধ্যেই মায়ের সঙ্গে কথা বলতে এক পাশে সরে যান পরিচালক মনোজ কুমার। তার কথা শুনতে পান তাপস্বিনী ও সহশিল্পী শ্রী রাম। পরিচালকের কথাগুলো তাদের আবেগাপ্লুত করে তোলে।
ঘটনাটি স্মরণ করে তাপস্বিনী বলেন, ‘আগামীকাল তোমার মঙ্গলসূত্র বন্ধক রাখার জন্য প্রস্তুত রেখো। আজকের বাজেট শেষ। এখন যদি দৃশ্যটা ধারণ করতে না পারি, তাহলে শুটিংয়ের সময় বাড়াতে হবে।’
পরিচালকের মুখে এমন কথা শুনে ভেঙে পড়েছিলেন অভিনেত্রী ও তার সহশিল্পী। কারণ, সিনেমাটি শেষ করার জন্য নির্মাতাকে যে কতটা আর্থিক চাপের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছিল, তা তাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল।
তাপস্বিনী আরো জানান, তার অভিনীত রুক্মিণী চরিত্রটির আবেগ প্রকাশের ক্ষেত্রে অত্যন্ত যত্নশীল ছিলেন মনোজ। বিশেষ করে দুঃখের দৃশ্যে চোখের জল কীভাবে ফুটিয়ে তুলতে হবে, সে বিষয়ে তার সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা ছিল। তিনি চাইতেন, চোখে জল জমে উঠুক, কিন্তু তা যেন খুব তাড়াতাড়ি গড়িয়ে না পড়ে।
শেষ পর্যন্ত দৃশ্যটি একবারেই ধারণ করা সম্ভব হয়। কৃত্রিম বৃষ্টি, ক্যামেরার গতিবিধি আর অভিনেতাদের আবেগ—সবকিছু মিলে যায় পরিচালকের পরিকল্পনার সঙ্গে। শুটিং শেষ হওয়ার পর ‘কাট’ বলে অভিনেতাদের জড়িয়ে ধরেন মনোজ। এরপর মাকে ফোন করে জানান, আর মঙ্গলসূত্র বন্ধক রাখতে হবে না। দৃশ্যটির শুটিং শেষ হয়েছে।
জাতীয় পুরস্কার পেয়েও কাজ পাননি পরিচালক
‘প্রেমাদ ওরালি’ পরিচালকের জীবনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এর আগে তার পরিচালিত ‘অক্ষি’ কন্নড় ভাষার সেরা পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করে। মাত্র ২৩ লাখ রুপি বাজেটে নির্মিত ছবিটির শুটিং শেষ করতে সময় লেগেছিল ৫৫ দিন। তবে জাতীয় স্বীকৃতি পেলেও পরবর্তী সময়ে কাজ পেতে বেশ বেগ পেতে হয় মনোজকে।
‘সিনেমা এক্সপ্রেস’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, জাতীয় পুরস্কার জয়ের পরও নতুন কাজের সুযোগ সহজে আসেনি। শিল্পধর্মী সিনেমার সঙ্গে যুক্ত নির্মাতা হিসেবে তাকে নিয়ে প্রযোজকদের মধ্যে অনীহা ছিল।
এমন পরিস্থিতিতে ‘প্রেমাদ ওরালি’ নির্মাণে এগিয়ে আসেন ছবিটির সহলেখক ও প্রযোজক দেবেন্দ্র। নিজের সঞ্চয়ের অর্থ দিয়ে তিনি প্রকল্পটিতে সহায়তা করেন। কিন্তু শুটিং শেষ হতে না হতেই প্রচারের জন্য হাতে প্রায় কোনো অর্থ অবশিষ্ট ছিল না।
বিয়ের নিমন্ত্রণপত্রের আদলে প্রচার
অর্থের অভাবে প্রচলিত বিপণন কৌশল অনুসরণ করতে পারেননি নির্মাতারা। তাই তারা বেছে নেন অভিনব এক উপায়। বিয়ের নিমন্ত্রণপত্রের আদলে কার্ড ছাপিয়ে বাস ও ট্রেনের যাত্রীদের মধ্যে তা বিতরণ করেন। দর্শকদের কাছে তাদের আবেদন ছিল, ছোট বাজেটের এই সিনেমাটিকে যেন অন্তত একবার সুযোগ দেওয়া হয়।
সিনেমাটির প্রচারে অটোরিকশাচালকদের অবদানের কথাও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেছেন মনোজ। তারা বিভিন্ন জায়গায় ছবির পোস্টার লাগিয়ে প্রচারে সাহায্য করেন। পাশাপাশি পরিবেশক জয়ান্নার সহযোগিতায় সিনেমাটি আরও বেশি দর্শকের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ পায়।
মুক্তির পর প্রথম দিকে দর্শক টানতে হিমশিম খেতে হয়েছিল নির্মাতাদের। কিন্তু ধীরে ধীরে দর্শকদের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে সিনেমাটির প্রশংসা। বাড়তে থাকে আগ্রহ, আর সেই সঙ্গে আরও বেশি প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শনীর সুযোগ পায় ছবিটি।
যে সিনেমার শুটিং শেষ করতেই পরিচালকের মায়ের মঙ্গলসূত্র বন্ধক রাখার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, সেই সিনেমাই এখন বক্স অফিসে বিপুল সাফল্যের উদাহরণ।









































