ছবি : রয়টার্স।
ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও জ্বালানির দাম বাড়ার প্রতিবাদে শনিবার দেশজুড়ে বড় ধরনের বিক্ষোভের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এতে শ্রমিক সংগঠন, ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের সমর্থক ও বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।সম্ভাব্য সংঘর্ষ ও সহিংসতার আশঙ্কায় দেশটির কর্তৃপক্ষ সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে।
দক্ষিণ ফ্রান্সের মার্সেই শহরে শনিবার সকালেই বিক্ষোভকারীরা ময়লার পাত্র ও বৈদ্যুতিক স্কুটারে আগুন ধরিয়ে দেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেখানে দাঙ্গা পুলিশকে হস্তক্ষেপ করতে হয়। এদিকে সম্ভাব্য লুটপাট ও ভাঙচুর ঠেকাতে দেশজুড়ে অনেক দোকানের সামনে কাঠের তক্তা লাগিয়ে সুরক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শনিবার দেশজুড়ে প্রায় ৯০টি বিক্ষোভসহ মোট ৫০০টি কর্মসূচি হতে পারে। প্যারিসসহ দেশটির বিভিন্ন বড় শহরে সম্ভাব্য সহিংসতা মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিচ্ছে কর্তৃপক্ষ। শনিবার দেশটির বিভিন্ন শহরে এই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। এতে হাজার হাজার মানুষের অংশ নেওয়ার কথা ছিল।
গত মাসে প্যারিসের উত্তরাঞ্চলের দরিদ্র শহরতলির কয়েকটি উচ্চবিদ্যালয়ে এই আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। শিক্ষকদের অনুপস্থিতি ও বিদ্যালয়ের জরাজীর্ণ পরিবেশ নিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ পরে বৈষম্য, সরকারি ব্যয় হ্রাস এবং শিক্ষার মান কমে যাওয়ার প্রতিবাদে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।
ফ্রান্সের বিভিন্ন স্থানে শত শত বিক্ষোভের আয়োজন করা হয়। বিক্ষোভকারীরা উজ্জ্বল রঙের ভেস্ট পরে বিভিন্ন সড়ক অবরোধ করেন। পরিস্থিতি দেশটিতে প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাখোঁর আগের মেয়াদে দেখা দেওয়া আন্দোলনের কথা মনে করিয়ে দেয়।
বিক্ষোভকারীদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে আনা। পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে দেশজুড়ে। শিক্ষকদের অনুপস্থিতি, শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত ভিড় এবং পুরোনো সুযোগ-সুবিধাসহ বিভিন্ন ইস্যুতে চার সপ্তাহ ধরে চলা ছাত্র বিক্ষোভের পর এই প্রতিবাদগুলো অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
বেশিরভাগ ছাত্র বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ হলেও, দাঙ্গাকারীদের সাথে সংঘর্ষ এবং পুলিশের কথিত বর্বরতা ও সহিংসতার ব্যাপক সমালোচনাও হয়েছে। সূত্রটি ইউরোনিউজকে জানিয়েছে, উগ্র-বামপন্থী আন্দোলনটি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে সংঘর্ষ উস্কে দিতে পারে এবং বিক্ষোভের পথ বরাবর নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেদ করার চেষ্টা করতে পারে।
তারা আরো সতর্ক করেছে, গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন পথ এবং অত্যাবশ্যকীয় অবকাঠামো অবরোধ ‘সহ্য করা হবে না’। এদিকে ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাখোঁ শুক্রবার বলেছেন, ‘প্রতিবাদের অধিকারকে সম্পূর্ণরূপে সম্মান করা হলেও, এর সাথে মানুষ ও সম্পত্তির প্রতিও সম্মান থাকতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘এ কারণেই আমি শান্ত ও শ্রদ্ধাশীল থাকার আহ্বান জানাচ্ছি। এই অধিকারগুলো অবশ্যই রক্ষা করতে হবে।’ পুলিশি সহিংসতার বেশ কয়েকটি অভিযোগের মধ্যে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ফরাসি আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষ ক্রমবর্ধমান তদন্তের মুখোমুখি হয়েছে।
প্যারিসের ১৯ বছর বয়সী বিক্ষোভকারী লোলা বলেন, জীবনযাত্রার ব্যয় ও জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ চাপে রয়েছেন। পাশাপাশি, উন্নত শিক্ষার পরিবেশ ও আরো শিক্ষক নিয়োগের দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা হামলার শিকার হচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
লোলার ভাষায়, ‘জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেশি, জ্বালানির দামও চড়া। অথচ আরও শিক্ষক ও উন্নত শিক্ষার পরিবেশের দাবিতে প্রতিবাদ করতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের হামলার শিকার হতে হচ্ছে।’
বিক্ষোভকারীদের দাবি, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর পাশাপাশি শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন এবং সাধারণ মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাখোঁ তার শাসনামলের শেষ পর্যায়ে রয়েছেন। তার সময়ে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গন আরো বিভক্ত হয়েছে এবং ভোটারদের মধ্যেও মতভেদ বেড়েছে।
এদিকে সরকারি ঋণ কমানোর দীর্ঘ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও ফ্রান্সের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। দেশটির সরকারি বন্ড থেকে বিনিয়োগকারীরা মুখ ফিরিয়ে নেওয়ায় ঋণ নেওয়ার খরচ দুই দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকোর্নু বৃহস্পতিবার বলেন, চলমান বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছে সরকার। এদিকে বিক্ষোভে উসকানি দেওয়ার অভিযোগে কট্টর বামপন্থী রাজনৈতিক দল ‘ফ্রান্স আনবাউড’-কে দায়ী করেছে সরকার। তবে দলটি এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
ফ্রান্সে ছাত্র বিক্ষোভে সহিংসতা, আহত শত শত
ফ্রান্সে ছাত্র বিক্ষোভ ঘিরে সহিংসতা বেড়েছে। বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় গুরুতর আহতদের মধ্যে এক কিশোরও রয়েছে। স্টান গ্রেনেড হাতে নেওয়ার পর বিস্ফোরণে তার একটি হাত উড়ে যায়।
প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকোর্নু জানিয়েছেন, বিক্ষোভ চলাকালে ৯০০ জনেরও বেশি পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। এদিকে পুলিশের বিরুদ্ধে সহিংসতার অভিযোগ তদন্ত করছে দেশটির অভ্যন্তরীণ পুলিশ তদারকি সংস্থা। এ ধরনের অন্তত দুই ডজন ঘটনার তদন্ত চলছে।
ছাত্র বিক্ষোভের সময় স্টান গ্রেনেডের ব্যবহার সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে ফ্রান্স। তবে দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজ জানিয়েছেন, শনিবারের বিক্ষোভে পরিস্থিতি বিবেচনায় আবারও এই গ্রেনেড ব্যবহার করা হতে পারে।








































