চীনের কারখানা পরিদর্শনে মালয়েশিয়ায় যান পুলিশ কর্তারা

প্রতীকী ছবি

পুলিশ টেলিকমের সরঞ্জাম আমদানির আগে প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের কারখানা পরিদর্শনের নিয়ম রয়েছে। পণ্যের গুণগত মান পরীক্ষা বা পর্যবেক্ষণ করতে সরকারি খরচে প্রতিবছর মালয়েশিয়া ভ্রমণও করেছেন পুলিশ টেলিকমের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। কালের কণ্ঠ অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখেছে, ২০১৫ সালেই মালয়েশিয়া থেকে সরিয়ে চীনে প্রতিস্থাপন করা হয় মটরোলা সলিউশনের কারখানা। তাহলে কর্মকর্তারা মালয়েশিয়ায় ঠিক কোথায় কোন কারখানা পরিদর্শনে যেতেন, এ নিয়ে বিস্ময়ের অন্ত নেই।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এমডিএম ট্রেডার্সের পাওয়া সব টেন্ডারের আগে কোনো ধরনের কারখানা পরিদর্শন না করে শুধু মালয়েশিয়ায় থাকা মটরোলা সলিউশন ইনকরপোরেশনের বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করেছেন পুলিশ কর্মকর্তারা। উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে মালয়েশিয়ার পেনাং থেকে তুলে নিয়ে চীনে নতুন করে কারখানা প্রতিষ্ঠা করে মটোরোলা সলিউশন। অর্থাৎ ২০১৫ সালের পর থেকে মালয়শিয়ায় মটোরোলার বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান থাকলেও কারখানার কোনো অস্তিত্ব নেই সেখানে। সে ক্ষেত্রে সরকারি নিয়ম উপেক্ষা করে এমডিএম ট্রেডার্স নামক প্রতিষ্ঠানটিকে একাধারে কাজ পাইয়ে দিয়েছেন পুলিশ টেলিকম সংস্থার অসাধু কর্মকর্তারা।

পুলিশের সূত্রগুলো জানায়, এমডিএম ট্রেডার্স যেসব সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে, তার বেশির ভাগই নিম্নমানের। নানা জালিয়াতির মাধ্যমে সরবরাহ করা এসব নিম্নমানের রেডিও যন্ত্রাংশ প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তায় নিয়োজিত এসএসএফসহ পুরো পুলিশ বাহিনীর নিরাপত্তাব্যবস্থাকে ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত করছে। অভিযোগ উঠেছে, নিম্নমানের পণ্যের কারণে একটু জনসমাগম এলাকায় নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এসএসএফসহ পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা ওয়্যারলেসে কোনো নেটওয়ার্ক পান না।

পুলিশের দায়িত্বশীল কয়েকজন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, সারা দেশে পুলিশের বেতার যোগাযোগ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে পুলিশ টেলিকম।

এ ক্ষেত্রে পুলিশের যোগাযোগে ব্যবহৃত রেডিও সিস্টেম থেকে শুরু করে সিমলেস ওয়্যারলেস, অডিও ভিজ্যুয়াল ডাটা ট্রান্সফার, রিসিভ ও ট্রান্সমিটারের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজের অংশীদার এই সংস্থা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে দেখা গেছে, বিপুল জনসমাগম হলে তাদের ব্যবহারকৃত ওয়াকিটকি সেটগুলো ঠিকমতো কাজ করে না।

তথ্য-প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলেন, নিম্নমানের ওয়াকিটকির ফ্রিকোয়েন্স হ্যাক করা খুবই সাধারণ ব্যাপার। এর মাধ্যমে আইন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বাহিনীর উচ্চ পর্যায় থেকে বিনিময়কৃত তথ্য খুব সহজেই ফাঁস হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিভিন্ন সময় দেশে পুলিশের ওয়াকিটকির তথ্য ফাঁস হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ তানভীর জোহা বলেন, যদি থার্ড পার্টির মাধ্যমে কোনো ওয়াকিটকি কেনা হয় তবে তো একটা ঝুঁকি থেকেই যায়। কারণ যিনি কিনবেন তিনি তো অটো স্ক্যান করবেন না। এখন কেউ যদি ফ্রিকোয়েন্সিটা জানে এবং এটা যদি কম্পিউটারে ডিজিটালি প্রগ্রামিং করা হয়, অর্থাৎ এখানে যদি কন্ট্রোল ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম, যাকে সিএমএস বলা হয়, সেটা যদি সেট থেকে বের করা না হয় তবে যেকোনো সেট থেকেই আবার শোনা যাবে। এখানে যেটা সবচেয়ে জরুরি তা হলো, কোন কোন ওয়াকিটকি অ্যাকটিভ আছে এবং সেগুলো ভ্যালিড কি না এটা মনিটর করা।

তিনি বলেন, পুলিশের কাছে এখনো সেই সিস্টেম নেই। হয়তো দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তারা আরো ভালো বলতে পারবেন এ বিষয়ে। এ ক্ষেত্রে শুধু সেট আনলেই হবে না, এটির সিকিউরিটি সিস্টেমটাও জানতে হবে।

গত বছর জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় পুলিশের ওয়াকিটকির তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। বিদেশ থেকে প্রকাশিত একটি অনলাইন গণমাধ্যমে পুলিশের মধ্যে হওয়া কথোপকথন সবিস্তারে প্রকাশ পেয়ে যায়। এতে নিরাপত্তা বাহিনীর নিত্যব্যবহার্য এই গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম নিয়ে দেশজুড়ে হৈচৈ পড়ে যায়। বিশেষ করে প্রশাসনের অভ্যন্তরে এটি নিয়ে বিব্রতকর অবস্থা সৃষ্টি হয়।

জানা গেছে, এমডিএম ট্রেডার্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেলোয়ার হোসেন সাবেক আইজিপি বেনজীরের মদদে আট বছর ধরে একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করেছেন। এই সময়ে হওয়া ৪২টি টেন্ডারের মধ্যে ৪১টিই বাগিয়ে নেন তিনি। শুধু তাই নয়, ২০২১ সালের পর পুলিশ টেলিকমের টেন্ডারে তাঁর তিনটি প্রতিষ্ঠানের বাইরে আর কেউ অংশই নিতে পারেনি।

LEAVE A REPLY