ছবি : রয়টার্স
যুক্তরাষ্ট্র ২৩০ বছরের বেশি সময় ধরে ব্যবহার করা ‘পেনি’ বন্ধ করেছে এ সপ্তাহে। এমন সময় আলোচনা শুরু হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী মুদ্রা ডলারের জন্মস্থান নিয়ে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহু দূরে, চেক প্রজাতন্ত্রের একটি নীরব উপত্যকায় জন্ম নিয়েছিল ডলার। একই সঙ্গে এখানেই আবিষ্কৃত হয়েছিল পরমাণু শক্তির ক্ষমতা।
চেক–জার্মান সীমান্তের কাছে ছোট্ট শহর ইয়াখিমভ। জনসংখ্যা মাত্র আড়াই হাজার। শহরের প্রধান সড়কে দাঁড়ালে বোঝার উপায় নেই, এখানেই পাঁচ শতাব্দী আগে জন্ম হয়েছিল বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর মুদ্রা ডলারের।
অঞ্চলের পাহাড়ের আড়ালে লুকিয়ে থাকা উনিশ শতকের রেনেসাঁ ভবনগুলো আজ পরিত্যক্ত, আর শহরে ব্যাংকের চেয়ে ‘ব্রথেল’ বেশি।এই জায়গায়ই এমন এক ইতিহাস লুকিয়ে আছে যার ধারণা অধিকাংশ স্থানীয়রাই রাখেন না।
ইয়াখিমভের ১৬শ শতকের রয়্যাল মিন্ট হাউস মিউজিয়ামে ঢুকে একজন মার্কিন পর্যটক যখন মানিব্যাগ থেকে এক ডলার বের করলেন, গাইড ইয়ান ফ্রানচোভিচ যেন চমকে উঠলেন।
‘অনেক দিন হলো এটা দেখিনি,’ হাসতে হাসতে বললেন তিনি।
তিনি আরো বলেন, ‘আমরা এখানে কোরুনা, ইউরো—কখনো সখনো রুবল নেই।তিন বছরে আপনিই প্রথম মার্কিনি।’
১৫১৬ সালে এখানকার পাহাড়ে বিপুল পরিমাণ রুপা আবিষ্কৃত হলে স্থানীয় অভিজাত হাইরোনিমাস শ্লিক উপত্যকার নাম দিলেন ইওয়াখিমস্টাল। যার সংক্ষিপ্ত রূপ থেকেই জন্ম নেয় থালার, পরে যা হয়ে যায় ডলার।
১৫২০ সালে শ্লিক এই রুপা দিয়ে বিশেষ মুদ্রা তৈরির অনুমতি পান। সামনের দিকে খোদাই করা যিশুর নানা চিত্র, পেছনে বোহেমিয়ার সিংহ—এভাবেই জন্ম নেয় ‘ইওয়াখিমস্টালার’, বা থালার।
দশকের মধ্যেই এখানে খনির সংখ্যা হাজার ছাড়ায়। রুপার জোয়ারে ১০৫০ জনের ছোট্ট গ্রাম বদলে যায় ১৮ হাজার লোকের জনবহুল কেন্দ্রে। ১৬শ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত এখানকার প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ থালার ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।
থালার থেকে ডলার
পরবর্তীতে থালার ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নামে ছড়িয়ে পড়ে—ডেনমার্কের ডালার, ইতালির ট্যালেরো, পোল্যান্ডের টালার, গ্রীসের তালিরো। এমনকি ইথিওপিয়া, তানজানিয়া থেকে আরব উপদ্বীপ পর্যন্ত থালার ব্যবহৃত হতো ২০শ শতক পর্যন্ত।
কিন্তু ডলারের নামটি আসে ডাচ লিওভেনডালার থেকে। যা যুক্তরাষ্ট্রে এসে হয়ে যায় ডলার। ১৭৯২ সালে যুক্তরাষ্ট্র এটিকেই সরকারি মুদ্রা হিসেবে ঘোষণা করে।
ইয়াখিমভের অন্ধকার অধ্যায়
ইয়াখিমভ শহরটির ইতিহাস শুধু রুপা আর ডলারের নয়। রুপা ফুরিয়ে গেলে খনিগুলোতে পাওয়া যায় অদ্ভুত কালো খনিজ—পেখব্লেন্ড। এখান থেকেই মেরি কুরি আবিষ্কার করেন রেডিয়াম ও পোলোনিয়াম। এই আবিষ্কার তাকে নোবেল এনে দিলেও শেষ পর্যন্ত তেজস্ক্রিয়তা তার প্রাণ কেড়ে নেয়।
এরপর জার্মান নাৎসিরা এখানে পারমাণবিক গবেষণা চালায়। ওপেনহাইমারের গবেষণার উৎস ছিল এখানকার ইউরেনিয়াম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সোভিয়েতরা এই উপত্যকাকে পরিণত করে গোপন গুলাগে (শ্রমিক শিবির যেখানে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কাজ করতে হতো)। ১৯৪৯ থেকে ১৯৬৪ পর্যন্ত প্রায় ৫০ হাজার রাজনৈতিক বন্দিকে বাধ্য করা হয় ইউরেনিয়াম তোলায়—যা ব্যবহার হতো সোভিয়েত পরমাণু অস্ত্রে।
বিশ্বের আধুনিক দুটি সবচেয়ে ক্ষমতাধর প্রতীকের উৎপত্তি—ডলার এবং অ্যাটম বোমা দুটিই এই পাহাড়ি শহর থেকে এসেছে।
আজকের ইয়াখিমভ
খনিগুলো আজ শান্ত। ঢেকে যাচ্ছে গাছপালায়। আর শেষ খনি স্ভোর্নোস্ট এখন সরবরাহ করছে রেডন-ওয়াটার থেরাপির জন্য গরম রেডিওঅ্যাকটিভ পানি।
তবুও শহরে কোথাও লেখা নেই, এখানেই জন্ম হয়েছিল ডলারের। শুধু রয়্যাল মিন্ট হাউসের ভেতর তাকের ওপর সাজানো একটি এক ডলার নীরবে জানিয়ে দেয়—দূর দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী মুদ্রার গল্প শুরু হয়েছিল এখানেই।










































