হুমকির মুখে অস্তিত্ব ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের আগেই ভাঙছে কুয়াকাটা সৈকত

ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের মৌসুম আসতে না আসতেই কুয়াকাটায় ফের শুরু হয়েছে সৈকতের ভাঙন। উত্তাল ঢেউয়ের কারণে ভাঙছে পূর্ব অংশের বিস্তীর্ণ এলাকা। যুগ যুগ ধরে এই ভাঙন চললেও তা প্রতিরোধে নেওয়া হয়নি কার্যকর কোনো ব্যবস্থা। বরং, ভাঙন প্রতিরোধের নামে বালুভর্তি টিউব আর বস্তা ফেলে নষ্ট করা হয়েছে সৈকতের সৌন্দর্য। কুয়াকাটার মতো একটি পর্যটন কেন্দ্রের প্রতি কেন এ অবহেলা সেটাই এখন প্রশ্ন সেখানকার বাসিন্দাদের।

জানা গেছে, সৈকত রক্ষার লক্ষ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ডের জমা দেওয়া প্রকল্প পরপর চারবার ফেরত দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। টেকসই সাগর-রক্ষা বাঁধ নির্মাণের বিষয়টিও রয়ে গেছে অবহেলিত। ফলে ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের মৌসুম এলেই সৈকত গিলে খেয়ে লোকালয়ের দিকে এগোতে শুরু করে সমুদ্র। এভাবে গত ৫০ বছরে কম করে হলেও ৩ কিলোমিটার এগিয়েছে বঙ্গোপসাগর।

সাগর পারের বাসিন্দা সোহরাব হোসেন বলেন, শীত মৌসুমে শান্ত থাকে সমুদ্র। কিন্তু গ্রীষ্ম এলেই রুদ্র রূপ দেখা যায় সাগরের। উঁচু ঢেউ আছড়ে পড়ে সৈকতে। ভাঙনের ভয়াবহতাও বাড়ে তখন। বর্তমানে যেখানে বেড়িবাঁধের জিরো পয়েন্ট, সেখান থেকে কয়েক কিলোমিটার সামনে ছিল সমুদ্র। প্রতিবছর ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের মৌসুমে ভাঙতে ভাঙতে এ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। সাগরের এই অব্যাহত ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে কয়েকশ একরজুড়ে থাকা ফয়েজ মিয়ার নারিকেল বাগান, ডিসি পার্কের বিশাল অংশ, পূর্বে থাকা ঝাউ বাগান, স্থানীয় সরকার বিভাগের গেস্টহাউজ, হোটেল, মোটেল ও দোকান, প্রতিষ্ঠানসহ বহু মানুষের ঘরবাড়ি।

পর্যটন ব্যবসায়ী আজাদ রহমান বলেন, এখানে আমার একটি গেস্টহাউজ আছে। বেড়িবাঁধের সঙ্গেই সাগর পারে যার অবস্থান। প্রথম যখন জমি কিনেছি তখন সাগর ছিল অনেক দূরে। আস্তে আস্তে তা বেড়িবাঁধ ছুঁয়েছে। বহু বছর ধরে শুনছি ভাঙন ঠেকাতে ব্যবস্থা নেবে সরকার। কিন্তু কোনো উদ্যোগ আজ পর্যন্ত চোখে পড়েনি।

ট্যুরিজম অ্যাসোসিয়েশন অব কুয়াকাটার (টোয়াক) প্রেসিডেন্ট রুম্মান ইমতিয়াজ তুষার বলেন, কয়েক বছর আগে একবার জিও টিউব আর জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করেছিল পানি উন্নয়ন বোর্ড। সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। ভাঙন ঠেকানো তো দূরে থাক, টিউব আর ব্যাগগুলোই এখন দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যতদূর জানি, এখানে ভাঙন ঠেকাতে ৫-৬ বছর আগে একটি প্রকল্প জমা দিয়েছিল পানি উন্নয়ন বোর্ড। নানা অজুহাতে এ পর্যন্ত ৪ বার সেই প্রকল্প ফেরত পাঠিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। সর্বশেষ গত বছরের মার্চে নতুন আরেকটি প্রকল্প জমা দেয় পাউবো। ৭শ কোটি টাকা ব্যয় সাপেক্ষ সেই প্রকল্পের আওতায় ভাঙন প্রতিরোধে গ্রোইন বাঁধ নির্মাণসহ সাগর পারে থাকা বেড়িবাঁধের উন্নয়ন ও ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ মেরিন ড্রাইভ নির্মাণের প্রস্তাবনা রয়েছে। তবে কী জুটেছে সেই প্রস্তাবনার ভাগ্যে তা জানে না কেউ।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ শাহ আলম বলেন, বিকল্প আরেকটি প্রস্তাব তৈরি করছি আমরা। ওই প্রস্তাবনায় নিজস্ব অর্থায়ন অর্থাৎ সরকারের উদ্যোগে যাতে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয় সেই অনুরোধ জানাব। এটা এখন অত্যন্ত জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে প্রতিবছরই আরও উন্মত্ত হয়ে উঠছে সাগর। এখনই প্রতিরোধ করা না গেলে কুয়াকাটার অস্তিত্বই সংকটের মুখে পড়বে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বর্তমানে যে ভাঙন চলছে তা ঠেকাতে কয়েক হাজার জিও ব্যাগ ফেলার কাজ শুরু করছি আমরা।

পটুয়াখালী-৪ (কলাপাড়া-রাঙ্গাবালী) আসনের সংসদ-সদস্য এবিএম মোশাররফ হোসেন বলেন, যে প্রস্তাবটি পরিকল্পনা কমিশনে রয়েছে সেটি কিভাবে অনুমোদন করানো যায় সেই চেষ্টা করছি।

LEAVE A REPLY