দিল্লির বৈঠক থেকে পুতিন-মোদি কী পেলেন?

ছবিসূত্র : রয়টার্স

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করেছেন। একটি ব্যাবসায়িক ফোরামে অংশ নিয়েছেন এবং ‘রাশিয়া টুডে’, ক্রেমলিন-নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রীয় টিভি নেটওয়ার্ক ভারতে চালুর ঘোষণা দিয়েছেন। ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে পুতিন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কূটনৈতিকভাবে বেশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। তাই দিল্লির এই লাল গালিচা অভ্যর্থনা পশ্চিমা বিশ্বে শক্ত বার্তা পাঠিয়েছে।

কিন্তু এই সফর থেকে দিল্লি ও মস্কো আসলে কী পেল? 

জাঁকজমকের অভাব নেই, তবে বাস্তব চুক্তি কম
—সাংবাদিক স্টিভ রোজেনবার্গ

ভারতে ভ্লাদিমির পুতিন যে অভ্যর্থনা পেয়েছেন, রাশিয়ানরা সেটা ভীষণভাবে উপভোগ করেছে। অতিরাষ্ট্রবাদী প্রো-ক্রেমলিন সংবাদমাধ্যম কমসোমলস্কায়া প্রাভদা লিখেছে, ‘গাড়িবহর, কামানের সালাম আর মার্বেল-সাজানো সিংহাসন কক্ষ।’ ‘৩৪০ কক্ষের ভারতীয় প্রাসাদে পুতিনকে যেভাবে স্বাগত জানানো হলো।’

ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর পশ্চিমা দেশগুলো পুতিনকে আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে করার যে চেষ্টা করছে—সেই প্রেক্ষাপটে এই অভ্যর্থনা ছিল চোখে পড়ার মতো।

তবে চুক্তির সংখ্যার দিক থেকে বললে, প্রাসাদের কক্ষসংখ্যার তুলনায় কমই। তবুও রাশিয়া ও ভারত তাদের ‘বিশেষ ও বিশেষাধিকারপ্রাপ্ত কৌশলগত অংশীদারত্ব’ তুলে ধরার মতো যথেষ্টই পেয়েছে এবং পুতিনও সহযোগিতা বাড়ানোর প্রচেষ্টার প্রশংসা করেছেন।

তিনি আরো বলেন, চুক্তিগুলোর মধ্যে রয়েছে রাশিয়া–ভারত অর্থনৈতিক সহযোগিতা কর্মসূচি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও সরবরাহ শৃঙ্খলা–সম্পর্কিত সমঝোতা, এমনকি ওষুধশিল্পও রাশিয়ার কালুগা অঞ্চলে একটি রুশ-ভারতীয় ওষুধ কারখানা নির্মাণ করা হবে।

এবার আসি আলোচিত এবং সংবেদনশীল বিষয়গুলোয়।

প্রথমত, তেল। ভারত রাশিয়ার তেল ব্যাপক পরিমাণে কিনছে, যা নিষেধাজ্ঞার মুখে রাশিয়ার অর্থনীতিকে বড় সহায়তা দিয়েছে। এতে যুক্তরাষ্ট্র খুবই বিরক্ত। তাদের অভিযোগ, ভারত মূলত ক্রেমলিনের যুদ্ধ তহবিলকে শক্তিশালী করছে। তাই ট্রাম্প প্রশাসন ভারতীয় পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ করে দিল্লিকে রাশিয়ার জ্বালানি কেনা কমানোর চাপ দিচ্ছে।

শুক্রবার পুতিন বলেছেন, ভারতকে নিরবচ্ছিন্নভাবে তেল সরবরাহ করতে মস্কো প্রস্তুত। তবে এর কোনো বিশদ তথ্য ঘোষণা করা হয়নি। এখন সিদ্ধান্ত ভারতের হাতেই—এগোবে কি এগোবে না।

পরবর্তী বিষয়, রুশ অস্ত্র ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। পুতিনের সফরের আগে জল্পনা ছিল, ভারত কি আধুনিক রুশ যুদ্ধবিমান ও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কিনতে যাচ্ছে? কিন্তু কোনো প্রতিরক্ষা চুক্তি শেষ পর্যন্ত ঘোষণা করা হয়নি। এটি হয়তো ইঙ্গিত দেয় দিল্লির ভারসাম্যের রাজনীতির। মস্কোর সঙ্গে সম্পর্ক যেমন বজায় রাখতে হয়, তেমনি ওয়াশিংটনের সঙ্গেও দূরত্ব বাড়ানো যায় না।

শুক্রবার সবার নজর ছিল জাঁকজমক, অনুষ্ঠান, প্রাসাদ আর ঘোষিত চুক্তির দিকে। কিন্তু আমি সবচেয়ে জানতে চাই—গত রাতে পুতিন ও মোদির তথাকথিত ‘অনানুষ্ঠানিক নৈশভোজে’ কী আলোচনা হয়েছিল, যেটিকে রাশিয়া সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত বলছে। পুতিনের পররাষ্ট্রনীতি উপদেষ্টা ইউরি উশাকভ রসিয়স্কায়া গেজেতাকে বলেছেন, এমন গোপন মুখোমুখি বৈঠকেই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সবচেয়ে জরুরি, সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। ‘এই ধরনের বৈঠকেই মূলত রাজনীতি তৈরি হয়।’

এই সফরের কেন্দ্রে ছিল বাণিজ্য
— সাংবাদিক বিকাশ পাণ্ডে

সফরটি শুরু হয়েছিল বিমানবন্দরে মোদির সেই বিখ্যাত আলিঙ্গন দিয়ে। সাধারণত ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী বিদেশি রাষ্ট্রনেতাদের বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা জানান না, কিন্তু পুতিনের ক্ষেত্রে তিনি ব্যতিক্রম করেছেন। এ থেকে বোঝা যায়, রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত অংশীদারত্ব এবং পুতিনের সঙ্গে মোদির ব্যক্তিগত সম্পর্ক, উভয়কেই তিনি কতটা গুরুত্ব দেন।

তবে আনুষ্ঠানিকতা, জাঁকজমক আর বড় বড় অনুষ্ঠানের পরও বড় কোনো চুক্তি হয়নি। না কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা চুক্তি, না রাশিয়ার ছাড়মূল্যের অপরিশোধিত তেল আমদানি অব্যাহত রাখার নিশ্চয়তা। অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর দুই নেতা বক্তব্য দেন। তাদের বিবৃতি থেকে প্রথম যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে তা হলো পরস্পরের প্রতি অত্যন্ত দৃশ্যমান সম্মান। দ্বিতীয়টি, কোনো বড় ঘোষণা না থাকা। তবে তাদের কথায় সবচেয়ে পরিষ্কার যেটি ফুটে উঠেছে, তা হলো—এই সফরের কেন্দ্রবিন্দু ছিল বাণিজ্য।

রাশিয়া পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার চাপে টালমাটাল আর ভারত ওয়াশিংটনের আরোপিত ৫০ শতাংশের শুল্কের চাপের মুখে। উভয় দেশই তাদের অর্থনীতি টিকিয়ে রাখতে বিকল্প বাজার খুঁজছে। দুই দেশই একে অপরকে বৃহৎ বাজার হিসেবে দেখে এবং তাদের মাঝে বোঝাপড়াও আছে যে, বহু দশক ধরেই দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্ক প্রত্যাশামাফিক সামনে এগোয়নি।

বর্তমান দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ২০২০ সালের ৮.১ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৬৮.৭২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছালেও এর বড় অংশই এসেছে ভারতের ছাড়মূল্যের রুশ তেল কেনার মাধ্যমে। রাশিয়া চায় এটি অব্যাহত থাকুক। তাই পুতিন যখন বলেন মস্কো ‘নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ’ দিতে প্রস্তুত, সেটি মূলত দিল্লিকে এবং মোদিকে হোয়াইট হাউসের চাপের কাছে নত না হওয়ার এক নরম ইঙ্গিত।

ভারত ট্রাম্প প্রশাসনের চাপের মুখে আছে, দেশটিকে রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করতে বলা হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, মোদি কিভাবে এক অসম্ভব ভারসাম্য রক্ষা করেন। রাশিয়া থেকে তেল কেনা অব্যাহত রাখা এবং একই সঙ্গে ট্রাম্পের সঙ্গে একটি বাণিজ্য চুক্তি করা।

মোদিই প্রধানভাবে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন, যা ভারতের নতুন বাজার খোঁজার প্রচেষ্টা। তিনি আরো উল্লেখ করেছেন, ভারতের সম্ভাব্য ইউরেশিয়ান অর্থনৈতিক ইউনিয়নের সঙ্গে ফ্রি ট্রেড চুক্তি সম্পন্ন করার অগ্রগতি। যার মধ্যে রয়েছে রাশিয়া, আর্মেনিয়া, বেলারুস, কাজাখস্তান এবং কিরগিজস্তান। চুক্তি সম্পন্ন হলে, রাশিয়া, ভারত ও অন্যান্য সদস্য দেশ একে অপরের বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাবে।

দুই নেতা আলোচনা করেছেন পাঁচ বছরের একটি অর্থনৈতিক কাঠামো নিয়ে, যা দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ১০০ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করবে। এটি একটি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য, বিশেষ করে যদি ছাড়মূল্যের তেল হিসাব থেকে বাদ দেওয়া হয়। আর এ কারণেই বিভিন্ন খাতে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়ানোর ওপর এত বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

শেষে, বড় কোনো প্রতিরক্ষা চুক্তি না হলেও, তা ভারতের সামরিক বাহিনীতে রাশিয়ার ভূমিকাকে কম করবে না। মস্কো ভারতীয় প্রতিরক্ষা চাহিদার জন্য সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে থাকবে, যেমনটি গত দশকগুলো ধরে ছিল।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ভারত সু-৫৭ পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে প্রকাশ্যভাবে খুব কম বলেছে, যা তার বিমানবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ খালি স্থান পূরণে প্রয়োজন। ভারত সম্ভবত চেয়েছে তার প্রতিরক্ষা আদেশের সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিত করা হোক। বর্তমান এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা সিস্টেমের বাকি ইউনিটের সরবরাহ এখন দেরিতে হচ্ছে। কিন্তু রাশিয়ার পক্ষে এটি প্রতিশ্রুতি দেওয়া কঠিন হতে পারে, কারণ বর্তমানে তার প্রচুর প্রতিরক্ষাসম্পদ ইউক্রেনে ব্যয় হচ্ছে। তবে এর মানে এই নয় যে যুদ্ধবিমান বা অন্যান্য বড় প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে তাদের আলোচনা চলমান নেই। এ সফর মূলত বাণিজ্যের বিষয়েই কেন্দ্রীভূত বলে মনে হচ্ছে।

LEAVE A REPLY