ছবিসূত্র : রয়টার্স
ইসরায়েল যদি মধ্যপ্রাচ্যের বেশির ভাগ অংশ দখল করে নেয়, তাহলে তিনি আপত্তি করবেন না। ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি এ মন্তব্য করেন। তিনি দাবি করেন, এই ভূখণ্ডের ওপর ইহুদি জনগণের ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় অধিকার রয়েছে। তিনি যুক্তি দেন, এই সীমানা বাইবেলে নির্ধারিত রয়েছে।
আল-জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, টুকার কার্লসনের সঙ্গে শুক্রবার সম্প্রচারিত এক সাক্ষাৎকারে হাকাবিকে ইসরায়েলের ভৌগোলিক সীমানা নিয়ে প্রশ্ন করা হয়।
কার্লসন হাকাবিকে বলেন, ‘বাইবেলের আয়াতে ইব্রাহিমের বংশধরদের জন্য যে ভূমির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তা ইরাকের ফোরাত নদী থেকে মিসরের নীল নদের মধ্যবর্তী অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত। এ ধরনের ভূখণ্ডের পরিসর আধুনিক লেবানন, সিরিয়া, জর্দান এবং সৌদি আরবের কিছু অংশকেও অন্তর্ভুক্ত করবে।’
গত বছর রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিয়োগপ্রাপ্ত হাকাবি বলেন, ‘তারা যদি সবকিছু দখল করে নেয়, তবে সেটাই ভালো হবে।’ পরে কার্লসন বিস্ময় প্রকাশ করে জানতে চান, তিনি কি সত্যিই ইসরায়েলের পুরো অঞ্চল দখলকে সমর্থন করবেন? উত্তরে রাষ্ট্রদূত হাকাবি বলেন, ‘তারা দখল করতে চায় না। তারা এমন দাবিও করেনি।’
ইসরায়েলে নিযুক্ত এই মার্কিন রাষ্ট্রদূত নিজেকে খ্রিষ্টান জায়োনিস্ট ও ইসরায়েলের রক্ষক বলে দাবি করেন। যদিও হাকাবি পরে বলেন, মন্তব্যটি কিছুটা অতিরঞ্জিত ছিল।
তবুও, তিনি তার ধর্মীয় ব্যাখ্যার ভিত্তিতে ইসরায়েলি সম্প্রসারণবাদের দরজা খোলা রেখেছিলেন।
হাকাবি বলেন, যদি আশপাশের দেশগুলো ইসরায়েলের ওপর হামলা চালায় এবং যুদ্ধে ইসরায়েল জয়ী হয়ে সেই ভূখণ্ড দখল করে, তাহলে তা আলোচনার অন্য বিষয় হবে। ইসরায়েলের সম্প্রসারণের অধিকার সম্পর্কে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও হাকাবির মতামতের সঙ্গে একমত কি না, সে বিষয়ে আল জাজিরার মন্তব্যের অনুরোধের জবাব দেয়নি পররাষ্ট্র দপ্তর।
আঞ্চলিক অখণ্ডতার নীতি এবং বলপ্রয়োগের মাধ্যমে জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তি।
২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) রায় দেয়, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের দখল অবৈধ এবং অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।
কিন্তু ইসরায়েলি আইনে দেশের সীমানা স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয়নি। সিরিয়ার গোলান হাইটসও ইসরায়েল দখল করেছে, যা ১৯৮১ সালে অবৈধভাবে সংযুক্ত করে।
যুক্তরাষ্ট্রই একমাত্র দেশ যারা সিরিয়ার ভূখণ্ডের ওপর ইসরায়েলের দাবিকৃত সার্বভৌমত্বকে স্বীকৃতি দেয়। ২০২৪ সালে হিজবুল্লাহর সাথে যুদ্ধের পর, ইসরায়েল লেবাননের অভ্যন্তরে পাঁচটি স্থানে সামরিক ফাঁড়ি স্থাপন করে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ কিছু ইসরায়েলি রাজনীতিবিদ খোলাখুলিভাবে ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ ধারণাটি প্রচার করেছেন।
২০২৩ সালে ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ আন্তর্জাতিক ক্ষোভের মুখে পড়েন। তখন তিনি একটি অনুষ্ঠানে এমন একটি মানচিত্র প্রদর্শন করে বক্তব্য দেন, যেখানে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের পাশাপাশি লেবানন, সিরিয়া ও জর্দানের কিছু অংশকে ইসরায়েলের অংশ হিসেবে দেখানো হয়। মানচিত্রটি ইসরায়েলের পতাকার রঙের পটভূমিতে উপস্থাপন করা হয়েছিল।
টাকার কার্লসন-এর সঙ্গে সাক্ষাৎকারে হাকাবি যুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করেন, ইসরায়েলের অস্তিত্বের অধিকার আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। তবে একই সঙ্গে তিনি ইসরায়েলের নির্যাতনের বিরোধিতায় ভূমিকা রাখা আন্তর্জাতিক আইন তদারককারী সংস্থাগুলোরও সমালোচনা করেন।
তিনি বলেন, ‘আমি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং সেক্রেটারি মার্কো রুবিও-এর প্রতি কৃতজ্ঞ, কারণ তারা এখন আইসিসি এবং আইসিজে থেকে বেরিয়ে আসার জন্য কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছেন। কারণ এই সংস্থাগুলো এখন দুর্বৃত্ত সংগঠনে পরিণত হয়েছে, যারা আর আইনের সমান প্রয়োগের কথা বলে না।’
ইসরায়েলের প্রতি তার ধর্মীয় আনুগত্যের বাইরে, রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে নিহত বা কারাবন্দী মার্কিন নাগরিকদের অধিকারের পক্ষে কথা বলতে ব্যর্থ হওয়ায় হাকাবি সমালোচনার মুখে পড়েছেন।
গত বছর তিনি দণ্ডিত গুপ্তচর জোনাথন পোলার্ড-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু রক্ষণশীল মহলে ক্ষোভের সৃষ্টি করেন। পোলার্ড ইসরায়েলি সরকারের কাছে মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করেছিলেন, যার কিছু তথ্য পরে স্নায়ুযুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছেও পৌঁছে যায়।
মার্কিন নৌবাহিনীর সাবেক বেসামরিক বিশ্লেষক পোলার্ড ৩০ বছর কারাভোগ করেন এবং মুক্তির পর ২০২০ সালে ইসরায়েলে চলে যান। তিনি কখনও তার অপরাধের জন্য অনুশোচনা প্রকাশ করেননি। ২০২১ সালে তিনি মার্কিন নিরাপত্তা সংস্থায় কর্মরত ইহুদি কর্মীদের ইসরায়েলের পক্ষে গুপ্তচরবৃত্তি করার আহ্বানও জানান।
হাকাবি বলেন, তিনি পোলার্ডের মতামতের সঙ্গে একমত নন। তবে তাকে আতিথ্য দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, তিনি কেবল জেরুজালেমে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসে তার সঙ্গে একটি বৈঠক করেছেন। রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাইলে কেউ দূতাবাসে প্রবেশ করতে পারেন কি না—এ প্রশ্নের জবাবে হাকাবি স্বীকার করেন, এ ধরনের বৈঠকের জন্য আগে থেকে অনুমোদিত অ্যাপয়েন্টমেন্ট প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘তার অনুরোধে তিনি মার্কিন দূতাবাসে একটি বৈঠকে আসতে পেরেছিলেন। আমি সেখানে গিয়েছিলাম এবং সত্যি বলতে এতে আমার কোনো অনুশোচনা নেই। আমি এখানে থাকাকালে অনেক মানুষের সঙ্গে দেখা করেছি এবং ভবিষ্যতেও আরো অনেকের সঙ্গে দেখা করব।’
সূত্র : আলজাজিরা।









































